এক পায়ে অবিরাম ৪০ বছর

স্থানীয় শিশুদের বিনা বেতনে বা নামমাত্র বেতনে পড়ান মোক্তার হোসেন
শারীরিক অক্ষমতা কিংবা দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর কশাঘাত— কোনো কিছুই দমাতে পারেনি তার ইচ্ছাশক্তিকে। একটিমাত্র সচল পা, একটি পুরনো সাইকেল আর অসীম আত্মবিশ্বাসকে সম্বল করে চার দশক ধরে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাচ্ছেন পাবনার বেড়া পৌরসভার শাহপাড়ার বাসিন্দা মোক্তার হোসেন (৬৫)। নিজের জীবনের কষ্ট সামলে অন্যের সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়তে একটি লাঠি সম্বল করে, এক পায়ে সাইকেল চালিয়ে তিনি প্রতিদিন ছুটে চলেন এক মহল্লা থেকে আরেক মহল্লায়।
মোক্তারের বয়স যখন পাঁচ বছর, যখন আর দশটি শিশু দুরন্তপনায় মাতিয়ে রাখত চারপাশ, তখন পোলিও রোগে আক্রান্ত হয়ে চিরতরে অকেজো হয়ে যায় তার ডান পা, দুর্বল হয়ে পড়ে ডান হাতও। ক্র্যাচ কেনার সামর্থ্যও ছিল না তার পরিবারের। ফলে একটি কাঠের লাঠিই হয়ে ওঠে তার হাঁটার একমাত্র অবলম্বন। তবু পড়াশোনার অদম্য স্পৃহা কমেনি। সহপাঠীদের পেছনে ফেলে সবসময় ক্লাসের সেরা দশের তালিকায় জায়গা করে নিতেন মোক্তার।
বড় হয়ে সরকারি চাকরি করবেন, ঘোচাবেন পরিবারের দারিদ্র্য— এমন অনেক সুন্দর স্বপ্নে বুঁদ ছিলেন মোক্তার। কিন্তু দশম শ্রেণিতে পড়ার সময় তার বাবার দ্বিতীয় বিয়ে এবং পরিবার থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া নিমেষেই সব ওলটপালট করে দেয়। তিন ভাই ও আট বোনের বিশাল সংসার সামলানোর কঠিন দায়িত্ব এসে পড়ে কিশোর কাঁধে। থমকে যায় নিজের পড়াশোনা ও স্বপ্ন।
সংসার চালাতে ছোট্ট মুদি দোকান দিয়ে জীবনযুদ্ধ শুরু করেন। দোকানের পাশাপাশি স্থানীয় শিশুদের বিনা বেতনে বা নামমাত্র বেতনে পড়ানো শুরু করেন। একপর্যায়ে দোকান ছেড়ে তিনি পুরোদমে জড়িয়ে পড়েন শিক্ষাদানের কাজে। সংগ্রহ করেন একটি পুরনো সাইকেল। এক পায়ে ভর দিয়ে ভারসাম্য রক্ষা করে সাইকেল চালানো শেখাটা ছিল খুব ঝুঁকিপূর্ণ। বারবার পড়ে গিয়ে চোট পেয়েছেন, কিন্তু হাল ছাড়েননি। লাঠিটি সাইকেলের ফ্রেমের সঙ্গে বেঁধে এক পায়ে প্যাডেল ঘুরিয়ে সাইকেল চালানোর অত্যন্ত ব্যতিক্রমী এক কৌশল আয়ত্ত করেন, যা চার দশক ধরে বেড়ার অলিগলিতে এক পরিচিত দৃশ্য হয়ে উঠেছে।
টিউশনির কোনো নির্দিষ্ট ফি নেই তার। সামর্থ্য অনুযায়ী যে যা দেন তা নিয়েই খুশি। জীর্ণ টিনের ঘরে বসবাসকারী মোক্তার হোসেন বহু সীমাবদ্ধতার মধ্যেও নিজের মেয়েকে পড়াচ্ছেন, ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ছেলেকে পাঠিয়েছেন বিদেশে।
বেড়া ফাজিল মাদ্রাসার সহকারী অধ্যাপক মাহবুব হোসেন তার প্রাক্তন শিক্ষক মোক্তার হোসেনকে সমাজের ‘প্রকৃত মহানায়ক’ আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ‘শারীরিক সীমাবদ্ধতা ও আর্থিক অনটন সত্ত্বেও তিনি কখনো জ্ঞান বিতরণকে বাণিজ্যিক সমীকরণে মেলাতে চাননি। শিক্ষার্থীরা সাধ্যমতো যা দিয়েছে তিনি তা-ই গ্রহণ করেছেন, আর না দিতে পারলেও কখনো পড়াতে কার্পণ্য করেননি। এখনো তিনি নিজের আদর্শে অবিচল রয়েছেন।’
শারীরিক কষ্ট ও বয়সের ভারে মোক্তার আগের মতো দিনে আট-দশটি বাড়িতে যেতে না পারলেও পাঁচ-ছয়টি বাড়িতে এখনো নিয়ম করে ছুটে যান।
মোক্তার হোসেন বললেন, ‘কষ্টের সঙ্গে লড়াই করেই আমার বড় হওয়া। নিজের পড়াশোনা শেষ করতে পারিনি ঠিকই, তবে শরীরের শেষ রক্তবিন্দু থাকা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মধ্যে আলো ছড়িয়ে যেতে চাই। আমার সংগ্রাম যদি কাউকে জীবনে চলার শক্তি দেয়, তবেই আমার এ জীবন সার্থক।’




