জাঙ্ক ফুডে বাড়ছে নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি

সংগৃহীত ছবি
আজ জাতীয় জাঙ্ক ফুড দিবস। দিনটি প্রিয় বার্গার, পিজ্জা, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, চিপস, কোমল পানীয় ও মিষ্টিজাতীয় খাবার উপভোগের একটি উপলক্ষ। তবে নিয়মিত জাঙ্ক ফুড খাওয়ার প্রভাব বাড়াতে পারে নানান স্বাস্থ্যঝঁকি।
জাঙ্ক ফুডের ক্ষতি শুধু ওজন বাড়ায়, এমন ধারণা ঠিক নয়। নিয়মিত বার্গার, পিজ্জা বা কোমল পানীয় খেলে হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, ফ্যাটি লিভার, হজমের সমস্যা ও ঘুমের ব্যাঘাতসহ বাড়তে পারে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি।
এটি দীর্ঘমেয়াদে শরীরের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও সামগ্রিক সুস্থতার ওপর ফেলতে পারে নেতিবাচক প্রভাব।তাই সুস্থ থাকতে জাঙ্ক ফুড নয়, প্রয়োজন পরিমিত ও সুষম খাদ্যাভ্যাসের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনি, অস্বাস্থ্যকর চর্বি ও উচ্চমাত্রার সোডিয়ামসমৃদ্ধ খাদ্যাভ্যাস হৃদ্স্বাস্থ্য, হজমপ্রক্রিয়া, বিপাকক্রিয়া, ঘুম এবং বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। তাই জাঙ্ক ফুড পুরোপুরি বাদ দেওয়ার পরিবর্তে পরিমিতি বজায় রেখে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
ভারতের মুম্বাইয়ের পুষ্টিবিদ ডা. জয় ভানুশালি বলেছেন, অনেকেই মনে করেন জাঙ্ক ফুডের একমাত্র ক্ষতি হলো ওজন বাড়া। কিন্তু বাস্তবে এর প্রভাব আরও গভীর। দীর্ঘদিন অতিমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত খাবার, অতিরিক্ত চিনি, অস্বাস্থ্যকর চর্বি ও সোডিয়াম গ্রহণ করলে হৃদ্রোগ, ফ্যাটি লিভার, টাইপ-২ ডায়াবেটিস এবং অন্ত্রের নানা সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।’
তার মতে, ‘সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার বদলে পরিমিতি বজায় রাখাই সবচেয়ে কার্যকর। মাঝেমধ্যে প্রিয় খাবার খাওয়া যেতে পারে। তবে দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় পুষ্টিকর খাবার, নিয়মিত শরীরচর্চা এবং পর্যাপ্ত পানি পানকে গুরুত্ব দিতে হবে।’
জাঙ্ক ফুডের কারণে যেসব স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—
হৃদ্রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি
ভাজাপোড়া খাবার, প্রক্রিয়াজাত স্ন্যাকস ও চিনিযুক্ত পানীয় বেশি খেলে শরীরে স্যাচুরেটেড ফ্যাট, ট্রান্স ফ্যাট ও পরিমাণ বেড়ে যায় সোডিয়ামের। এতে কোলেস্টেরল, উচ্চ রক্তচাপ ও প্রদাহের ঝুঁকি বাড়ে, যা হৃদ্রোগের অন্যতম কারণ। এ ঝুঁকি কমাতে ফল, শাকসবজি, পূর্ণ শস্য ও স্বাস্থ্যকর প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
মস্তিষ্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব
অতিরিক্ত চিনি ও পরিশোধিত শর্করাযুক্ত খাবার রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে আবার কমিয়ে দেয়। ফলে ক্লান্তি, মনোযোগের ঘাটতি ও কমে যেতে পারে কর্মক্ষমতা। কিছু গবেষণায় অতিমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত খাবারের সঙ্গে সম্পর্কও পাওয়া গেছে মানসিক স্বাস্থ্যের সমস্যার। যদিও এ ক্ষেত্রে জীবনযাপন, মানসিক চাপ ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বংশগত কারণও।
অন্ত্রের স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া
সুস্থ অন্ত্রের জন্য আঁশসমৃদ্ধ খাবার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অধিকাংশ জাঙ্ক ফুডে আঁশের পরিমাণ কম এবং চিনি, কৃত্রিম উপাদান ও বেশি থাকে অস্বাস্থ্যকর চর্বি। দীর্ঘদিন এমন খাবার খেলে নষ্ট হতে পারে অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য। ফলে কোষ্ঠকাঠিন্য, পেট ফাঁপা ও দেখা দিতে পারে হজমের নানা সমস্যা।
ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি
চিনিযুক্ত পানীয় ও অতিমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি খেলে চর্বি জমতে পারে লিভারে। এতে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার রোগের ঝুঁকি বাড়ে, যা বর্তমানে বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়ছে।
ত্বকের সমস্যা বৃদ্ধি
শুধু খাদ্যাভ্যাসই ত্বকের অবস্থা নির্ধারণ করে না। তবে অতিরিক্ত চিনি ও পরিশোধিত শর্করাযুক্ত খাবার অনেকের ক্ষেত্রে ব্রণ ও ত্বকের প্রদাহ বাড়াতে পারে। অন্যদিকে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, ভিটামিন ও খনিজসমৃদ্ধ সুষম খাদ্য ত্বক সুস্থ রাখতে সহায়ক।
ঘুমের ব্যাঘাত
রাতে ভারী, তেলযুক্ত বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার খেলে হজমে সমস্যা হয় এবং নষ্ট হতে পারে ঘুমের মান। আবার পর্যাপ্ত ঘুম না হলে উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণও বাড়ে, যা একটি চক্র তৈরি করে অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের।
টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি
নিয়মিত কোমল পানীয়, মিষ্টিজাতীয় খাবার ও পরিশোধিত শর্করা গ্রহণ করলে ধীরে ধীরে তৈরি হতে পারে ইনসুলিন প্রতিরোধ ক্ষমতা। শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার সঙ্গে এটি যুক্ত হলে টাইপ-২ ডায়াবেটিসসহ আরও বেড়ে যায় বিভিন্ন বিপাকজনিত রোগের ঝুঁকি।
তাহলে কি জাঙ্ক ফুড একেবারেই খাওয়া যাবে না?
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস মানে প্রিয় খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়া নয়। বরং কতবার, কতটুকু এবং কী ধরনের খাবার খাওয়া হচ্ছে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ছোট পরিমাণে জাঙ্ক ফুড খাওয়া, চিনিযুক্ত পানীয় কমানো, ঘরে তৈরি খাবার বেশি খাওয়া এবং খাদ্যতালিকায় ফল, শাকসবজি, প্রোটিন ও পূর্ণ শস্য রাখা দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ থাকতে সহায়ক।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, জাঙ্ক ফুড ক্ষণিকের তৃপ্তি দিলেও এর প্রভাব শুধু ওজনের কাঁটায় সীমাবদ্ধ থাকে না। হৃদ্স্বাস্থ্য, অন্ত্রের কার্যকারিতা, ঘুম, বিপাকক্রিয়াসহ শরীরের বিভিন্ন দিক এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই জাতীয় জাঙ্ক ফুড দিবসের বার্তা একটাই, মাঝে মাঝে খাওয়া যেতে পারে প্রিয় খাবার। তবে সুস্থ জীবনের জন্য প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্র: নিউজ১৮




