প্রতিদিনের ৫ অভ্যাসে অজান্তেই দুর্বল হচ্ছে দাঁত

দাঁতের যত্নে নিয়মিত ব্রাশ করেন, মিষ্টি খাওয়া কমিয়ে দিয়েছেন, এমনকি হাসির সৌন্দর্য ধরে রাখতে ঘরোয়া উপায়েও দাঁত পরিষ্কার করেন। কিন্তু জানেন কি, আপনার প্রতিদিনের কিছু সাধারণ অভ্যাসই অজান্তে দাঁতের ক্ষতি করছে? দাঁতে শিরশির অনুভূতি, দাঁতের ওপরের সুরক্ষামূলক স্তর পাতলা হয়ে যাওয়া কিংবা দাঁতের কিনারা ভেঙে যাওয়ার মতো সমস্যা এখন অনেকের মধ্যেই দেখা যাচ্ছে। আগে এসব সমস্যাকে বয়স বাড়া বা দাঁতের যত্ন না নেওয়ার ফল বলে মনে করা হতো। কিন্তু দাঁতের চিকিৎসকেরা এখন ভিন্ন চিত্র দেখতে পাচ্ছেন।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ২৭ শতাংশ মানুষের দাঁতের এনামেল ক্ষয়ের প্রাথমিক লক্ষণ ইতোমধ্যেই প্রকাশ পেয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ক্ষতির পেছনে বড় কোনো দুর্ঘটনার চেয়ে আমাদের দৈনন্দিন কিছু অভ্যাস বেশি দায়ী, যেগুলোকে আমরা ভালো মনে করে দিনের পর দিন করছি। আমাদের দাঁতের ওপরের সুরক্ষামূলক স্তর বা এনামেল একবার নষ্ট হলে তা আর প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয় না। তাই দাঁতকে সুরক্ষিত রাখতে এই অভ্যাসগুলো সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি।
চলুন জেনে নেওয়া যাক, প্রতিদিনের কোন পাঁচটি অভ্যাস অজান্তেই দাঁত দুর্বল করে দিচ্ছে।
অতিরিক্ত জোরে ব্রাশ করা
অনেকেই মনে করেন, দাঁত খুব জোরে জোরে ব্রাশ করলে তা বেশি পরিষ্কার হয়। এটি একটি ভুল ধারণা। অতিরিক্ত জোরে এবং শক্ত ব্রাশ দিয়ে দাঁত মাজার অভ্যাস এনামেলকে ক্ষয়ে ফেলে। এনামেল হলো দাঁতের সেই সুরক্ষা স্তর, যা দাঁতকে ক্ষয়ের হাত থেকে বাঁচায়। দীর্ঘসময় ধরে এভাবে ব্রাশ করার ফলে দাঁতের এনামেল নীরবে পাতলা হয়ে যায়, যার ফলস্বরূপ দাঁত সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। তাই দাঁতের সুরক্ষায় সবসময় নরম ব্রাশ ব্যবহার করুন এবং মৃদু হাতে ব্রাশ করুন।
অতিরিক্ত অ্যাসিডিক ও মিষ্টি জাতীয় খাবার
আমাদের বর্তমান আধুনিক খাদ্যাভ্যাস দাঁতের এনামেল ক্ষয়ের প্রধান কারণগুলোর একটি। কোমল পানীয়, এনার্জি ড্রিংকস, লেবুর রস, চা, কফি এবং অতিরিক্ত মিষ্টি জাতীয় খাবার নিয়মিত সেবন করলে দাঁতের ওপর অ্যাসিডের আস্তরণ পড়ে। প্রতিটি চুমুক বা কামড় দাঁতকে অ্যাসিডের সংস্পর্শে নিয়ে আসে, যা এনামেলকে দুর্বল করে দেয়। আমরা যতই যত্ন করে ব্রাশ করি না কেন, সারাদিন অ্যাসিডিক খাবারের সংস্পর্শে থাকলে দাঁত রক্ষা করা কঠিন। এর প্রতিকার হিসেবে অ্যাসিডিক খাবার বা পানীয় খাওয়ার পর মুখ কুলি করে নেওয়া বা স্ট্র ব্যবহার করা যেতে পারে।
পর্যাপ্ত পানির অভাব
লালা বা স্যালাইভা হলো আমাদের মুখের প্রাকৃতিক সুরক্ষা কবচ। এটি মুখের অ্যাসিডকে প্রশমিত করে এবং দাঁতের খনিজ উপাদানগুলোকে পুনরায় পূরণ করে এনামেলকে শক্তিশালী রাখে। কিন্তু ক্যাফেইন বা চা কফির অতিরিক্ত অভ্যাসের ফলে আমাদের শরীর পানিশূন্য হয়ে পড়ে। ফলে মুখে লালার উৎপাদন কমে যায় এবং এনামেল সরাসরি অ্যাসিডের আক্রমণের শিকার হয়। সারাদিন পর্যাপ্ত পানি পান করা দাঁতের সুরক্ষার সবচেয়ে সহজ অথচ কার্যকর একটি উপায়।
ঘরে বসে দাঁত সাদা করার প্রবণতা
সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে এখন ঘরে বসে দাঁত সাদা করার নানা ঘরোয়া পদ্ধতি জনপ্রিয় হয়েছে। লেবুর রস, বেকিং সোডা কিংবা চারকোল দিয়ে দাঁত ঘষলে সাময়িক উজ্জ্বলতা মিললেও, এগুলো অত্যন্ত ক্ষতিকর। এই উপাদানগুলো অত্যন্ত খসখসে বা অ্যাসিডিক হওয়ায় এগুলো এনামেলকে দ্রুত ক্ষয়ে ফেলে। এর ফলে দাঁত আরও বেশি হলদে ও সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। সৌন্দর্য বাড়াতে গিয়ে নিজের দাঁতকে চিরস্থায়ী ক্ষতির মুখে ঠেলে দেবেন না। বরং ডেন্টিস্টের পরামর্শ নিয়ে নিরাপদ হোয়াইটেনিং ট্রিটমেন্ট নিন।
ভুল টুথপেস্ট নির্বাচন
আমরা প্রায়ই টুথপেস্ট কেনার সময় শুধু ক্যাভিটি প্রোটেকশন দেখে কিনি। কিন্তু প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় থাকা অ্যাসিডের হাত থেকে রক্ষা পেতে কেবল সাধারণ টুথপেস্ট যথেষ্ট নয়। সাধারণ টুথপেস্ট মূলত দাঁত পরিষ্কার ও সতেজ রাখে, কিন্তু এনামেলকে সুরক্ষা দেওয়ার সক্ষমতা থাকে না। আমাদের উচিত এমন টুথপেস্ট বেছে নেওয়া যা বিশেষভাবে এনামেলের সুরক্ষার জন্য তৈরি। এই ধরণের টুথপেস্ট এনামেলের খনিজ উপাদান ফিরিয়ে আনে এবং একে শক্ত করে তোলে।
এনামেলকে ভালো রাখার উপায়
দাঁতের এনামেল ক্ষয় একটি নীরব প্রক্রিয়া। এতে কোনো সংকেত বা সংকেত পাওয়া যায় না। এটি শুরু হয় ছোট ছোট কিছু অভ্যাস থেকে, যা আমরা অনিচ্ছায় করে যাচ্ছি। একবার এনামেল চলে গেলে তা আর ফিরে আসে না, তাই প্রতিকারের চেয়ে সচেতনতাই শ্রেয়।
দাঁতকে দীর্ঘস্থায়ী সুস্থতা দিতে কিছু নিয়ম মেনে চলুন:
* সবসময় নরম ব্রাশ দিয়ে আলতোভাবে দাঁত ব্রাশ করুন।
* অ্যাসিডিক পানীয় বা খাবার খাওয়ার পর মুখ পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।
* শরীরকে হাইড্রেটেড রাখতে প্রচুর পানি পান করুন।
* দাঁত সাদা করার নামে অদ্ভুত কোনো ঘরোয়া পদ্ধতি অনুসরণ করবেন না।
* সবশেষে, আপনার নিয়মিত টুথপেস্টটি বদলে এমন কোনো টুথপেস্ট ব্যবহার করুন যা এনামেল মজবুত ও সুরক্ষিত করতে সক্ষম।
সুন্দর হাসি শুধু সাদা দাঁতের ওপর নির্ভর করে না। দাঁতের প্রকৃত সৌন্দর্য ও সুস্থতা নির্ভর করে এর শক্তি এবং সুরক্ষার ওপর। তাই প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাসে পরিবর্তন আনাই হতে পারে দীর্ঘদিন দাঁত ভালো রাখার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।



