গরমে স্বস্তি নয়, ক্ষতির কারণ যেসব পানীয়

তীব্র দাবদাহে একজন পথচারী কোমল পানীয় পান করছে। ছবি: এআই
গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে জনজীবন যখন অতিষ্ঠ, তখন এক গ্লাস ঠান্ডা পানীয় শরীরে এনে দিতে পারে স্বস্তি। তীব্র গরমে ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে প্রচুর পানি ও খনিজ লবণ বের হয়ে যায়। এই ঘাটতি পূরণে আমরা অনেক সময় এমন কিছু পানীয় বেছে নিই, যা সাময়িক আরাম দিলেও দীর্ঘমেয়াদে শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিজ্ঞান ও পুষ্টিবিদদের মতে, সব তরলই শরীরের জন্য সমান উপকারী নয়। কিছু পানীয় শরীরকে হাইড্রেট করার পরিবর্তে উল্টো ডিহাইড্রেট বা পানিশূন্য করে ফেলে। গরমে সুস্থ থাকতে কোন পানীয়গুলো এড়িয়ে চলা উচিত, তার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা, বিশেষজ্ঞ মতামত এবং কিছু স্বাস্থ্যকর বিকল্প নিয়ে নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি
তীব্র গরমে তাৎক্ষণিক স্বস্তি পেতে বরফ-ঠান্ডা পানি পানের যে প্রবণতা দেখা যায়, তা সাময়িক আরামদায়ক হলেও শরীরের সার্বিক সুস্থতা ও দ্রুত পানি সরবরাহের জন্য খুব একটা কার্যকর নয়। অতিরিক্ত ঠান্ডা পানি পান করলে পাকস্থলীর রক্তনালি সংকুচিত হয়ে পড়ে, যা পানির শোষণ ও স্বাভাবিক হজম প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়। একই সঙ্গে শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা (৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস) বজায় রাখতে গিয়ে বাড়তি শক্তি অপচয় হয়, যা শরীরকে আরও ক্লান্ত করতে পারে এবং ভেগাস স্নায়ু উদ্দীপিত হয়ে হৃদস্পন্দন কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
কোমল পানীয় বা কার্বোনেটেড বেভারেজ
গ্রীষ্মের দুপুরে এক বোতল ঠান্ডা কোমল পানীয় বা সোডা খাওয়ার প্রবণতা অনেকের মধ্যে দেখা যায়। তবে বিজ্ঞান বলছে, কোমল পানীয়তে প্রচুর পরিমাণে চিনি এবং ক্যাফেইন থাকে যা পিপাসা মেটানোর জন্য সবচেয়ে ক্ষতিকর বিকল্পগুলোর একটি। পুষ্টিবিদদের মতে অতিরিক্ত চিনি রক্তে শোষিত হওয়ার জন্য শরীরের কোষ থেকে পানি টেনে নেয়। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘অসমোটিক ইফেক্ট’। এর ফলে কোষগুলো পানি হারিয়ে সংকুচিত হয়ে পড়ে এবং তৃষ্ণা আরও বেড়ে যায়। এ ছাড়া কার্বোনেটেড পানীয়তে থাকা ফসফরিক অ্যাসিড শরীরের ক্যালসিয়ামের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। চিকিৎসকদের মতামত অতিরিক্ত চিনিযুক্ত কোমল পানীয় সাময়িকভাবে রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, যা শরীরে তাৎক্ষণিক শক্তি জোগালেও দ্রুতই তা আবার কমে যায়। এর ফলে ক্লান্তি ও অবসাদ আরও বাড়ে।
এনার্জি ড্রিংকস
ক্লান্তি দূর করতে অনেকেই গরমে এনার্জি ড্রিংকস বেছে নেন। কিন্তু অতিরিক্ত গরমে এই পানীয়গুলো হৃদযন্ত্র এবং কিডনির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। এর বৈজ্ঞানিক কারণ হচ্ছে এনার্জি ড্রিংকসে উচ্চ মাত্রায় ক্যাফেইন এবং টারিন নামক উপাদান থাকে। ক্যাফেইন একটি প্রাকৃতিক ‘ডাইইউরেটিক’ , যা প্রস্রাবের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। ফলে শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি বের হয়ে যায় এবং পানিশূন্যতার ঝুঁকি বহু গুণ বেড়ে যায়। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচণ্ড গরমে এনার্জি ড্রিংকস পানের ফলে রক্তচাপ ও হৃদস্পন্দন হঠাৎ বেড়ে যেতে পারে, যা হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
প্যাকেটজাত বা প্রক্রিয়াজাত ফলের রস
বাজারের বোতলজাত বা কাগজের প্যাকেটে বিক্রি হওয়া ফলের রসকে স্বাস্থ্যকর মনে করা হলেও, গরমে এগুলো এড়িয়ে চলাই শ্রেয়। বৈজ্ঞানিক কারণ হচ্ছে এসব জুসে ফলের প্রাকৃতিক উপাদানের চেয়ে কৃত্রিম স্বাদ, রং, প্রিজারভেটিভ এবং অতিরিক্ত চিনি বেশি থাকে। প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় ফলের প্রধান উপকারী অংশ অর্থাৎ ‘ফাইবার’ বা আঁশ সম্পূর্ণ বাদ পড়ে যায়। ফাইবার না থাকায় এই জুসের চিনি খুব দ্রুত রক্তে মিশে যায়, যা বিপাক প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটায়। চিকিৎসকদের মতে, বোতলজাত জুসে ব্যবহৃত ‘হাই ফ্রুক্টোজ কর্ন সিরাপ’ লিভারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে ওবেসিটি বা স্থূলতার কারণ হতে পারে।
অতিরিক্ত চা এবং কফি
বাঙালিদের দৈনন্দিন জীবনে চা বা কফি একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে গ্রীষ্মকালে অতিরিক্ত চা-কফি পানের অভ্যাস ক্ষতিকর হতে পারে। বৈজ্ঞানিক কারণ হচ্ছে চা ও কফিতে থাকা ক্যাফেইন কিডনিকে অতিরিক্ত সক্রিয় করে তোলে, যার ফলে শরীর থেকে পানি ও খনিজ লবণ দ্রুত নিষ্কাশিত হয়ে যায়। গরমে এমনিতেই ঘামের মাধ্যমে শরীর পানি হারায়, তার ওপর ক্যাফেইনের প্রভাব পানিশূন্যতাকে তীব্রতর করে তোলে। পুষ্টিবিদদের পরামর্শ অনুযায়ী, গরমে দিনে ১-২ কাপের বেশি চা বা কফি খাওয়া উচিত নয়। বিশেষ করে কড়া কফি বা ব্ল্যাক কফি এড়িয়ে চলা ভালো।
অতিরিক্ত মিষ্টি শরবত
অনেক সময় ঘরে তৈরি শরবতকেও আমরা স্বাস্থ্যকর মনে করি। কিন্তু শরবতে যদি অতিরিক্ত চিনি, সিরাপ বা মিষ্টি উপাদান ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটিও স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অতিরিক্ত চিনি রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়ায় এবং তৃষ্ণা কমানোর বদলে আরও বেশি পানি পানের প্রয়োজন তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ডায়াবেটিস বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সে ভোগা ব্যক্তিদের এ বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
রাস্তার রঙিন পানীয় ও অস্বাস্থ্যকর শরবত
গরমে রাস্তার পাশে বিক্রি হওয়া বিভিন্ন রঙিন পানীয় ও শরবত অনেকের কাছেই আকর্ষণীয়। কিন্তু এসব পানীয় তৈরিতে ব্যবহৃত পানি, বরফ বা পাত্র সব সময় স্বাস্থ্যসম্মত নাও হতে পারে। দূষিত পানি বা অপরিষ্কার পরিবেশে তৈরি পানীয় খেলে ডায়রিয়া, টাইফয়েড, হেপাটাইটিস এ এবং অন্যান্য খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই এসব পানীয় কেনার আগে স্বাস্থ্যবিধির বিষয়টি বিবেচনায় রাখা জরুরি।
তাহলে কী পান করবেন?
গরমে শরীরকে সুস্থ রাখতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পর্যাপ্ত পানি পান করা। তবে পানির পাশাপাশি কিছু স্বাস্থ্যকর পানীয়ও শরীরকে সতেজ রাখতে সাহায্য করতে পারে। ক্ষতিকর পানীয়গুলো বর্জন করার পর শরীরকে সতেজ ও সজল রাখতে প্রাকৃতিক ও পুষ্টিকর কিছু বিকল্প বেছে নেওয়া প্রয়োজন। নিচে বিজ্ঞানসম্মত কয়েকটি বিকল্প তুলে ধরা হলো:
বিশুদ্ধ পানি ও মাটির কলসির পানি
পানিই হচ্ছে তৃষ্ণা মেটানোর সেরা মাধ্যম। গরমে শরীরকে সুস্থ ও দ্রুত সজল রাখতে বরফ-ঠান্ডা পানির পরিবর্তে ১৬ থেকে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার মৃদু ঠান্ডা বা মাটির কলসির পানি পান করাই শারীরবৃত্তীয়ভাবে বেশি কার্যকর ও স্বাস্থ্যসম্মত। মাটির পাত্রের পানি প্রাকৃতিক উপায়ে ঠান্ডা থাকে এবং পানির ক্ষারীয় ভাব বজায় রাখতে সাহায্য করে, যা হজম প্রক্রিয়ার জন্য উপকারী।
ডাবের পানি
ডাবের পানিকে প্রকৃতির সেরা ওরাল রিহাইড্রেশন স্যালাইন বলা চলে। এতে রয়েছে পটাশিয়াম, সোডিয়াম এবং ম্যাগনেসিয়ামের মতো প্রাকৃতিক ইলেকট্রোলাইট। তীব্র গরমে ঘামের মাধ্যমে যে খনিজ লবণ বের হয়ে যায়, তা দ্রুত পূরণ করতে ডাবের পানি অনন্য।
ঘরোয়া লেবুর শরবত (চিনি ছাড়া বা কম চিনিতে)
এক গ্লাস পানিতে সামান্য লেবুর রস, বিট লবণ এবং পুদিনা পাতা মিশিয়ে চমৎকার পানীয় তৈরি করা যায়। লেবুতে থাকা ভিটামিন সি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং বিট লবণ শরীরের সোডিয়ামের ঘাটতি পূরণ করে।
ঘোল বা মাঠা
টক দই দিয়ে তৈরি ঘোল বা মাঠা গরমে পেটের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এতে থাকা প্রোবায়োটিকস (উপকারী ব্যাকটেরিয়া) গরমে হজমশক্তি ঠিক রাখে এবং শরীরকে ভেতর থেকে ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করে।
তরমুজ বা শসার রস
তরমুজ ও শসায় প্রায় ৯০-৯৬ শতাংশ পানি থাকে। চিনি ছাড়া এগুলোর রস বা স্মুদি বানিয়ে খেলে তা দীর্ঘ সময় শরীরকে আর্দ্র রাখতে সাহায্য করে এবং প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট সরবরাহ করে।
গ্রীষ্মের উত্তাপ থেকে রক্ষা পেতে তাৎক্ষণিক স্বস্তির চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি সুস্থতার কথা ভাবা জরুরি। কৃত্রিম চিনি, অতিরিক্ত ক্যাফেইন এবং রাসায়নিকযুক্ত পানীয় সাময়িক তৃপ্তি দিলেও তা শরীরের অভ্যন্তরীণ কার্যকলাপে বিঘ্ন ঘটায়। তাই সুস্থ ও সতেজ থাকতে প্রাকৃতিক উপাদান এবং পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানির ওপর ভরসা রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ।






