ঝিরি-ঝরনার কমলদহ ট্রেইল

রূপসী ঝরনার সামনে লেখক
মিরসরাইয়ের কমলদহ ট্রেইলে রোমাঞ্চকর এক ভ্রমণ শেষে লিখেছেন মিরাজ শাওন
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। গাড়ির জানালার বাইরে ধীরে ধীরে বদলে যেতে থাকে দৃশ্যপট। কংক্রিটের দেয়াল সরে গিয়ে তার জায়গা নিল সবুজ মাঠ, দূরের পাহাড়। ভোর সাড়ে ৫টায় বাস আমাদের পাঁচজনকে নামিয়ে দিল বড় দারোগার হাটে।
চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার পাহাড়ঘেরা এলাকায় লুকিয়ে আছে দারুণ সুন্দর এক ঝরনা। রূপসী ঝরনা। আমাদের প্রথম গন্তব্য। বাস থেকে নেমে একটু অপেক্ষা করে নাশতা সেরে হাঁটা ধরলাম। ট্রেইলের শুরুতেই আমাদের স্বাগত জানাল একটি ঝিরি। তার শীতল জল ধরে হাঁটতে লাগলাম। পানি কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও মসৃণ পাথরের গা বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে, কোথাও আবার বড় বড় পাথরের ফাঁক দিয়ে স্রোতের ছুটে চলা। ঝিরির পথ ছেড়ে পাহাড়ের গা ঘেঁষে ওপরে উঠতে থাকলে চোখে পড়ল ধাপে ধাপে নেমে আসা অনেকগুলো ধারা।
কমলদহ ট্রেইলের বড় আকর্ষণ একের পর এক ঝরনা। রূপসী ঝরনা খুব উঁচু না হলেও বেশ অনেকটা জায়গা নিয়ে পড়ছে স্বচ্ছ জলের ধারা। কিছুদূর এগোতেই সামনে হাজির ছাগলকান্দা ঝরনা। ৪০-৫০ ফুট ওপর থেকে সাদা ফিতের মতো পানি নেমে আসছে অবিরাম। ঝরনার নিচে দাঁড়ালে ঠান্ডা পানির ছিটায় মুহূর্তেই শরীরের ক্লান্তি উধাও।
নিস্তব্ধ বনের ভেতর শুধু শোনা যাচ্ছে ঝিরির কলকল ধ্বনি, পাখির ডাক আর নিজেদের পদচারণার শব্দ। পথে পড়ল দুধরাজ ঝরনা। নামের মতোই এর জলধারা দুধের রেখার মতো সাদা।
এরপর কমলদহ ট্রেইলের অন্যতম রোমাঞ্চকর অংশ মধু খাইয়া ঝরনা। ঝোপঝাড় আর ঘন জঙ্গলে ঘেরা এই ঝরনার কাছে পৌঁছে আমরা মুগ্ধ হলাম তার রূপে। বড় বড় পাথরের ফাঁক গলে বয়ে যাওয়া স্রোত, পিচ্ছিল শিলা আর সংকীর্ণ পথ ধরে এগোলাম সতর্ক পায়ে। ঝরনার দ্বিতীয় ধাপে ওঠা আরও কঠিন। তবে সেই কষ্টের প্রতিদান মিলল ওপরে উঠেই। চারদিকে পাহাড়, ঘন বন আর নিচে আঁকাবাঁকা ঝিরির চোখজুড়ানো দৃশ্য।
মধু খাইয়ার সৌন্দর্য উপভোগ করে উল্টো পথে কিছুক্ষণ ট্র্যাকিং করার পর দূর থেকে পানি পতনের শব্দ কানে এসে বাজল। এরও কিছুটা সময় পর চোখের সামনে ধরা দেয় পাথরভাঙা ঝরনা। ৭০-৮০ ফুট ওপর থেকে প্রচণ্ড বেগে পানি নেমে আসছে বিশাল পাথরের গায়ে।
ট্রেইলের সবচেয়ে মুগ্ধকর অংশ দীর্ঘ ঝিরিপথ, যার দুপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল পাথরগুলো সময়ের সাক্ষী হয়ে আছে শত শত বছর ধরে। আমরা পাঁচজনই ছিলাম অফিসের সহকর্মী। তবে এখন আমাদের পরিচয় হলো ‘বন্ধু’। মাঝেমধ্যে আমরা থেমেছি। বসেছি বড় পাথরের ওপর। ঝিরির ঠান্ডা পানিতে পা ডুবিয়ে শুধু তাকিয়ে থেকেছি পাহাড়ের দিকে। দেখেছি কমলদহের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য। পথে দেখা মিলেছে নানা রকম বুনো গাছপালা, পাহাড়ি ফুল আর অসংখ্য প্রজাপতির। দিনের আলো ধীরে ধীরে নরম হতে শুরু করলে ফেরার জন্য প্রস্তুত হই। পাহাড়ের ছায়া লম্বা হতে থাকে, ঝিরির পানি যেন আরও শান্ত হয়ে ওঠে। তবে আমাদের মন যেন থেকে যাচ্ছিল পাহাড়ের ভেতরেই।
যেভাবে যাবেন
ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী যেকোনো বাসে প্রথমে বড় দারোগার হাট বাজারে নামতে হবে। এ ছাড়া ট্রেনে ফেনী বা চট্টগ্রাম নেমে আসতে পারবেন। চট্টগ্রামের শুভপুর বা অলংকার থেকে বাসে সীতাকুণ্ড ও মিরসরাই যেতে পারবেন।
ভ্রমণ টিপস
কমলদহ ট্রেইল ঘুরতে চাইলে খুব সকালে যাত্রা শুরু করাই ভালো। পুরো ট্রেইল শেষ করতে সাধারণত সাত থেকে আট ঘণ্টা সময় লাগে। সঙ্গে ভালো গ্রিপের জুতা, প্রয়োজনীয় খাবার, পর্যাপ্ত পানি ও একটি মজবুত দড়ি রাখা চাই। বর্ষায় ঝরনায় নামার ক্ষেত্রে এবং চলার সময় সতর্ক থাকতে হবে।





