এভারেস্ট বেস ক্যাম্প ডায়েরি: দ্বিতীয় দিন
ঝরনার গান শুনতে শুনতে নামচে বাজারের পথে

আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহর অশেষ মেহেরবানিতে আমাদের এভারেস্ট বেস ক্যাম্প অভিযাত্রার দ্বিতীয় দিনের যাত্রা চলছে। গতকাল লুকলা থেকে রওনা হয়ে আমরা পৌঁছেছিলাম পাহাড়ের কোলে অবস্থিত এক মনোরম টি-হাউজে, আমাদের প্রথম রাতের গন্তব্য ফারদিন বা ফাকডিংয়ে (Phakding)। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৬১০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এই ছোট ও সুন্দর জনপদটি ট্রেকারদের কাছে দারুণ জনপ্রিয়। রাতের ফাকডিংয়ে চারপাশের নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে আসছিল খরস্রোতা দুধকোশী নদীর গর্জন। টি-হাউজের উষ্ণ আড্ডায় কফি চুমুক দিতে দিতে সহযাত্রীদের গান আর গল্পে কেটেছিল চমৎকার একটি সন্ধ্যা।
পরদিন সকালেই আবার পথচলা শুরু। ফাকডিং থেকে নামচে বাজারের (Namche Bazaar) উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করলাম। পাহাড়ি এই ট্রেইলে হাঁটার নিজস্ব এক ছন্দ আছে, এখানকার ট্রাফিক মানেই হলো আপনার চলার পথে সামান্য বিরতি, পুলিশ চেকপোস্টে একটু তথ্য যাচাই, কিংবা ইচ্ছে হলে রাস্তার পাশের কোনো ছোট্ট ক্যাফেতে গরম কফি কাপে চুমুক দেওয়ার ফুরসত। পাহাড়ি উঁচু-নিচু পাথুরে পথে মালপত্র বহনের জন্য স্থানীয় মানুষের পাশাপাশি দেখা মিলছে ঘোড়ার পাল কিংবা মালবোঝাই ইয়াকের দীর্ঘ সারি।
পথিমধ্যে আমরা পার হয়ে এসেছি সুন্দর পাহাড়ি জনপদ মঞ্জু (Monjo)। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৮৩৫ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত মঞ্জু হলো সগরমাথা জাতীয় উদ্যানের প্রবেশদ্বার। এখান থেকেই মূলত পার্কের পারমিট চেকিং ও নিয়মের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। মঞ্জু পার হয়ে সামনে পড়ল বিখ্যাত জোসড়াইল (Jorsalle) এলাকা। এই জোসড়াইলের পাশেই পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্যের মাঝে দুপুরের খাবার বা লাঞ্চ সেরে নিলাম; এখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশে খোলা আকাশের নিচে সেই দুপুরের আহার সারাজীবন মনে রাখার মতো এক অভিজ্ঞতা হয়ে থাকবে।
মঞ্জু ও জোসড়াইল পার হওয়ার সময় অন্যতম রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা হলো একের পর এক সুউচ্চ সাসপেনশন ব্রিজ বা ঝুলন্ত সেতু পার হওয়া। শত শত ফুট উঁচুতে এই দোদুল্যমান সেতুগুলোর ওপর দিয়ে হাঁটার সময় নিচে দুধকোশী নদীর গর্জন আর চারপাশের পাইন বনের ঘেরা দৃশ্য এক রোমাঞ্চকর শিহরণ জাগায়। কখনো হালকা রোদের লুকোচুরি, কখনো বা হঠাৎ এক পসলা বৃষ্টি—সবমিলিয়ে প্রকৃতি যেন তার রূপের মোহময় জাল বিছিয়ে রেখেছে। ট্রেইলের ফাঁকে ফাঁকে হঠাৎ যখন বরফাবৃত হিমালয়ের বিশাল কোনো শৃঙ্গ মেঘের বুক চিরে উঁকি দেয়, তখন ক্লান্ত শরীর নিমেষেই জুড়িয়ে যায়।
সামনে আমাদের জন্য আরও কঠিন ও অ্যাডভেঞ্চারে ভরপুর পথ অপেক্ষা করছে। আজকের গন্তব্য বিশ্বের ট্রেকারদের রাজধানী খ্যাত ‘নামচে বাজার’ (৩,৪৪0 মিটার উচ্চতা)। আজকের ট্রেইলে চড়াইয়ের অংশ বেশি থাকায় শারীরিক পরিশ্রম একটু বেশিই হচ্ছে; তবে আল্লাহর মেহেরবানিতে আমাদের ১২ জনের দলের সবাই এখন পর্যন্ত সম্পূর্ণ সুস্থ ও চাঙ্গা আছি। আমাদের দলে দুই জন বাংলাদেশি ছাড়াও অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, চিলি ও ইউক্রেনের বন্ধুরা রয়েছেন। আমাদের ১২ জনের এই টিমের অগ্রবর্তী দলটি ইতিমধ্যে কিছুটা সামনে এগিয়ে গেলেও, আমরা বাকি সাতজন আজকেই রোমাঞ্চকর পথ পেরিয়ে নামচে বাজারে গিয়ে পৌঁছাচ্ছি।
আমাদের এই দুর্গম ও রোমাঞ্চকর পথচলার জন্য সকলের কাছে দোয়া প্রার্থনা করছি। ইনশাআল্লাহ, প্রতিদিনের নতুন সব আপডেট ও অভিজ্ঞতা আপনাদের সাথে এভাবেই ভাগ করে নেব।






