এভারেস্ট দিবস
এভারেস্ট: ম্যালরির হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন থেকে হিলারি-তেনজিংয়ের বিজয়

১৯৫৩ সালের ২৯ মে।
পৃথিবীর ছাদে তখন ভোরের আলো ফুটছে।
পূর্ব আকাশে সূর্যের প্রথম সোনালি রশ্মি হিমালয়ের অসংখ্য শৃঙ্গকে একে একে জাগিয়ে তুলছে। নিচে মেঘের সমুদ্র। তারও অনেক ওপরে, পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিন্দুর দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছেন দুজন মানুষ।
তাঁদের নিঃশ্বাস ভারী।
প্রতিটি পদক্ষেপ যেন যুদ্ধ।
শীত এতটাই তীব্র যে উন্মুক্ত ত্বক কয়েক মিনিটেই জমে যেতে পারে। বাতাসে সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় মাত্র এক-তৃতীয়াংশ অক্সিজেন। এই উচ্চতায় মানুষ বাঁচে না, কেবল টিকে থাকার চেষ্টা করে।
তবু তাঁরা এগিয়ে যাচ্ছেন।
একজন নিউজিল্যান্ডের মৌমাছি পালনকারী।
অন্যজন হিমালয়ের সন্তান, এক শেরপা।
আর কয়েক ঘণ্টা পর পৃথিবী তাঁদের নাম মনে রাখবে চিরকাল।
কিন্তু এই গল্প কেবল এডমন্ড হিলারি আর তেনজিং নোরগের নয়।
এটি আরও দুজন মানুষের গল্প।
দুজন মানুষ, যারা আরো প্রায় ত্রিশ বছর আগে একই পাহাড়ের গায়ে হারিয়ে গিয়েছিলেন।
যাঁদের নাম আজও এভারেস্টের বাতাসে ভেসে বেড়ায়।
জর্জ ম্যালরি।
অ্যান্ড্রু আরভিন।
কারণ ওটা ওখানে আছে
বিশ শতকের শুরুতে পৃথিবীর দুই মেরু জয় হয়ে গেছে।
মহাসাগরের মানচিত্র প্রায় সম্পূর্ণ।
মানুষের চোখ তখন আটকে আছে একটি জায়গায়। এভারেস্ট।
তখনও কেউ জানে না পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গের চূড়ায় পৌঁছানো আদৌ সম্ভব কি না।
১৯২১ সালে প্রথম ব্রিটিশ অনুসন্ধানী অভিযানে যোগ দেন জর্জ ম্যালরি।
তখন নেপাল বিদেশিদের জন্য বন্ধ। তাই তিব্বতের দিক থেকে এগোতে হয়েছিল অভিযাত্রীদের।
ম্যালরি ছিলেন শিক্ষক, সৈনিক এবং অসাধারণ পর্বতারোহী। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল অন্য কিছু।
তিনি ছিলেন স্বপ্নবাজ।
হিমালয়ের অজানা উপত্যকা, হিমবাহ আর শৈলশিরার মধ্যে ঘুরে ঘুরে তিনিই প্রথম কার্যকর একটি পথ চিহ্নিত করেন, যেটি ভবিষ্যতে এভারেস্ট জয়ের রাস্তা হয়ে উঠবে।
এক সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করেছিলেন,
'কেন এভারেস্টে উঠতে চান?'
ম্যালরির উত্তর ছিল মাত্র চারটি শব্দ।
'কারণ ওটা ওখানে আছে।'
পর্বতারোহণের ইতিহাসে এর চেয়ে বিখ্যাত উক্তি খুব কমই আছে।
মৃত্যুর পাহাড়
আজকের যুগের তুলনায় তখনকার পর্বতারোহণ সরঞ্জাম ছিল আদিম।
ডাউন স্যুট নেই।
আধুনিক ক্র্যাম্পন নেই।
আবহাওয়ার নির্ভুল পূর্বাভাস নেই।
হালকা অক্সিজেন সিলিন্ডার নেই।
স্যাটেলাইট যোগাযোগ নেই।
বরফঝড়ের মধ্যে একবার পথ হারালে প্রায় নিশ্চিত মৃত্যু।
১৯২২ সালে ম্যালরি দ্বিতীয়বার এভারেস্টে যান।
এই অভিযানে প্রথমবার অক্সিজেন ব্যবহৃত হয়।
তাঁরা ৮ হাজার ৩০০ মিটারেরও বেশি উচ্চতায় পৌঁছে নতুন রেকর্ড গড়েন।
কিন্তু ফেরার পথে ভয়াবহ তুষারধসে মারা যান সাতজন শেরপা।
এভারেস্ট প্রথমবার রক্ত দাবি করল।
ম্যালরি বেঁচে ফিরলেন।
কিন্তু পাহাড় যেন তাঁকে ছেড়ে দিল না।
শেষ অভিযান
১৯২৪।
ম্যালরির বয়স তখন ৩৭।
বাড়িতে স্ত্রী রুথ এবং তিন সন্তান।
তবু তিনি আবার ফিরলেন এভারেস্টে।
এবার তাঁর সঙ্গী তরুণ প্রকৌশলী অ্যান্ড্রু আরভিন।
মাত্র ২২ বছর বয়স।
অভিজ্ঞতা কম হলেও অক্সিজেন যন্ত্র মেরামতে অসাধারণ দক্ষ ছিলেন তিনি।
৮ জুন।
সকালে দুজন বের হলেন সর্বোচ্চ ক্যাম্প থেকে।
লক্ষ্য—চূড়া।
তারপর ইতিহাস।
অথবা মৃত্যু।
দুপুরের দিকে দলের সদস্য নোয়েল ওডেল দূর থেকে তাঁদের দেখতে পান।
মেঘের ফাঁকে দুই ক্ষুদ্র কালো বিন্দু।
চূড়ার খুব কাছে।
তারপর মেঘ নেমে এল।
আর কখনো দেখা গেল না তাঁদের।
তারা কি পেরেছিলেন?
এটাই পর্বতারোহণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রহস্য।
ম্যালরি ও আরভিন কি সত্যিই এভারেস্টের চূড়ায় উঠেছিলেন?
নাকি চূড়ার কয়েকশ মিটার নিচে মৃত্যুর মুখে পড়েছিলেন?
১৯৯৯ সালে প্রায় ৭৫ বছর পর ম্যালরির দেহ পাওয়া যায়।
বরফের মধ্যে অবিশ্বাস্যভাবে সংরক্ষিত।
শরীরে ভয়ংকর আঘাতের চিহ্ন।
কোমরে দড়ির ক্ষত।
মনে হয় দুজন একসঙ্গে বাঁধা ছিলেন এবং কোথাও পড়ে গিয়েছিলেন।
কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু জিনিস পাওয়া যায়নি।
স্ত্রী রুথের ছবি।
যেটি তিনি চূড়ায় রেখে আসার কথা বলেছিলেন।
আর পাওয়া যায়নি তাঁদের ক্যামেরা।
যদি সেই ক্যামেরা কোনো দিন উদ্ধার হয় এবং ফিল্মে চূড়ার ছবি থাকে?
তাহলে এভারেস্টের ইতিহাস নতুন করে লিখতে হতে পারে।
আজও বহু অভিযাত্রী আরভিনের দেহ খুঁজে বেড়ান।
আশা করেন, হয়তো তাঁর কাছেই লুকিয়ে আছে সেই ক্যামেরা।
আর তার ভেতরে পৃথিবীর সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত একটি ছবি।
যুদ্ধের পর নতুন লড়াই
ম্যালরি হারিয়ে যাওয়ার পরও এভারেস্টের ডাক থামেনি।
বছরের পর বছর নতুন নতুন অভিযান এসেছে।
অনেকে মারা গেছেন।
অনেকে ফিরে গেছেন।
কেউ সফল হননি।
এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পৃথিবীকে বদলে দিল।
যুদ্ধ শেষে আবার শুরু হলো এভারেস্ট জয়ের প্রতিযোগিতা।
এদিকে তিব্বত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উত্তর দিকের পথও বন্ধ।
তখন নজর ঘুরল নেপালের দিকে।
দক্ষিণ দিক দিয়ে নতুন পথ খোঁজা শুরু হলো।
আর সেই পথেই দাঁড়িয়ে ছিল এক ভয়ংকর বাধা।
খুম্বু আইসফল।
বরফের বিশাল গোলকধাঁধা।
প্রতিনিয়ত নড়ছে।
ফাটছে।
ভেঙে পড়ছে।
মৃত্যুর ফাঁদ পেতে বসে আছে।
দুই মানুষের সাক্ষাৎ
এই অভিযানে একসঙ্গে এলেন দুই ভিন্ন জগতের মানুষ।
এডমন্ড হিলারি।
নিউজিল্যান্ডের একজন মৌমাছি চাষি।
লম্বা, শক্তিশালী, অদম্য।
আর তেনজিং নোরগে।
হিমালয়ের সন্তান।
শেরপাদের মধ্যে কিংবদন্তি।
এর আগে একাধিকবার এভারেস্টের খুব কাছে পৌঁছেছেন।
ফিরে এসেছেন।
আবার গেছেন।
আবার ফিরেছেন।
চূড়া যেন তাঁর নাগালের মধ্যেও ছিল না।
দূরেও ছিল না।
খুম্বুর মৃত্যু ফাঁদ
১৯৫৩ সালের অভিযানে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন জন হান্ট।
দলটি ধীরে ধীরে ক্যাম্প তৈরি করতে করতে ওপরে উঠছিল।
খুম্বু আইসফলে প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল ভাগ্যের পরীক্ষা।
একদিন বরফের বিশাল ফাটল পার হতে গিয়ে প্রায় মারা যাচ্ছিলেন হিলারি।
বরফের সেতু ভেঙে নিচে পড়ে যান।
মুহূর্তের মধ্যে অতল গহ্বরে হারিয়ে যেতে পারতেন।
কিন্তু তেনজিং দ্রুত বরফকুঠার গেঁথে দড়ি আটকে দেন।
হিলারির পতন থেমে যায়।
অনেক পরে হিলারি স্বীকার করেছিলেন, ওই দিন তেনজিং না থাকলে তাঁর জীবন শেষ হয়ে যেত।
শেষ আক্রমণ
২৮ মে।
দুজন একটি ছোট তাঁবুতে রাত কাটালেন প্রায় ৮ হাজার ৫০০ মিটার উচ্চতায়।
পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু ক্যাম্পগুলোর একটি।
সারারাত ঝড় বয়ে গেল।
৭৩ বছর আগের ঠিক এই দিনে, ২৯ মে ভোরে তাঁবুর বাইরে এসে তাঁরা দেখলেন আকাশ পরিষ্কার।
সুযোগ এসেছে।
এটাই হয়তো একমাত্র সুযোগ।
হিলারি স্টেপ
চূড়ার নিচে পৌঁছে তাঁদের সামনে দাঁড়াল একটি প্রায় খাড়া পাথুরে বাধা।
উচ্চতা প্রায় চল্লিশ ফুট।
আজ যেটি “হিলারি স্টেপ” নামে পরিচিত।
তখন কেউ জানত না এর ওপরে ওঠা সম্ভব কি না।
হিলারি বরফ আর পাথরের মাঝের সরু ফাঁক ব্যবহার করে ওপরে উঠলেন।
তারপর দড়ি নামালেন।
তেনজিংও উঠে এলেন।
সবচেয়ে বড় বাধা পেরিয়ে গেলেন তাঁরা।
পৃথিবীর ছাদে
সকাল ১১টা ৩০ মিনিট।
২৯ মে ১৯৫৩।
হঠাৎ ঢাল শেষ হয়ে গেল।
আর ওপরে ওঠার কিছু নেই।
তাঁরা দাঁড়িয়ে আছেন পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিন্দুতে।
এভারেস্টের চূড়ায়।
দুজন পরস্পরকে জড়িয়ে ধরলেন।
তেনজিং বরফের নিচে চকলেট ও বিস্কুট রেখে দিলেন দেবতাদের উদ্দেশে।
হিলারি ছবি তুললেন।
চারপাশে কেবল আকাশ।
নিচে পৃথিবী।
মাত্র পনেরো মিনিট ছিলেন সেখানে।
কিন্তু সেই পনেরো মিনিটই তাঁদের অমর করে দিল।
রহস্যের শেষ নেই
আজ ৭৩ বছর পেরিয়ে গেছে।
হিলারি ও তেনজিংয়ের কীর্তি নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
তাঁরাই প্রথম নিশ্চিতভাবে নথিভুক্ত মানুষ, যারা এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছেছিলেন।
কিন্তু ম্যালরি ও আরভিনের গল্প এখনো শেষ হয়নি।
কারণ একটি ক্যামেরা এখনো নিখোঁজ।
একটি ছবির খোঁজ এখনো মেলেনি।
একটি প্রশ্ন এখনো বাতাসে ভাসে।
১৯২৪ সালের সেই জুন দুপুরে, মেঘ নামার আগে, দুই কালো ছায়ামূর্তি কি সত্যিই পৃথিবীর ছাদে পৌঁছে গিয়েছিল?
নাকি চূড়া থেকে কয়েকশ মিটার দূরেই থেমে গিয়েছিল তাদের স্বপ্ন?
সম্ভবত উত্তরটি এখনো বরফের নিচে ঘুমিয়ে আছে।
এভারেস্টের কোথাও।
আর সেই কারণেই ম্যালরি, আরভিন, হিলারি ও তেনজিং—চারজনই আসলে একই গল্পের অংশ।
একটি পাহাড়ের গল্প।
একটি স্বপ্নের গল্প।
আর মানুষের সেই চিরন্তন আকাঙ্ক্ষার গল্প, যা তাকে বারবার অসম্ভবের দিকে হাঁটতে বাধ্য করে।
সূত্র: রয়্যাল জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি, হিমালয়ান জার্নাল, দ্য আলপাইন জার্নাল, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, ব্রিটিশ মাউন্ট এভারেস্ট এক্সপিডিশন আর্কাইভ, তেনজিং নোরগের আত্মজীবনী টাইগার অব দ্য স্নোজ, স্যার এডমন্ড হিলারির স্মৃতিকথা হাই অ্যাডভেঞ্চার, কনরাড অ্যাঙ্কার ও জো রবার্টসের গবেষণা এবং এভারেস্ট ইতিহাসবিষয়ক বিভিন্ন প্রামাণ্য নথি।










