‘ছদ্মবেশী’ এক অচেনা গাছ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গত বছরের ঈদুল আজহার ছুটির শুরুতেই যেন জীবনের ব্যস্ত ঘড়িটা একটু থমকে দাঁড়িয়েছিল। দীর্ঘ কর্মজীবনের ফাঁকে অবসরের এমন সুযোগ খুব বেশি আসে না। ঈদের কেনাকাটা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ— সবকিছুর মধ্যেও আমার সবচেয়ে প্রিয় সময় ছিল ছোট ছেলেটিকে নিয়ে রংপুর শহরের পথে হুডখোলা রিকশায় ঘুরে বেড়ানো।
একসময় এই শহরের প্যাডেলচালিত রিকশাগুলো ধীরস্থির ভঙ্গিতে চলত। যেন সময়ের কোনো তাড়া নেই। এখন সেই জায়গা দখল করেছে চার্জার রিকশা। মুহূর্তেই পথ গিলে ফেলে। তবু রিকশায় বসে শহর দেখার আনন্দে কোনো ভাটা পড়েনি। বরং বাতাসের সঙ্গে শহরের গন্ধটাও যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়।
ঈদের চাঁদরাতের আগের রাতে আমরা ফিরছিলাম ডাক্তার পল্লিখ্যাত জেল রোড-ধাপের দীর্ঘ সড়ক ধরে। হঠাৎ মনে হলো, বাংলাদেশ বেতার রংপুর কেন্দ্রের আলো ঝলমলে টাওয়ারটি একবার দেখে যাই। দূর থেকে টাওয়ারটি আমার কাছে সবসময় সেন্টমার্টিন দ্বীপের বাতিঘরের কথা মনে করিয়ে দেয়। শহরের বুকেও যেন সমুদ্রের একটুখানি স্মৃতি দাঁড়িয়ে আছে।
রিকশা এগিয়ে চলেছে। মেজবান রেস্তোরাঁ পেরিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক রংপুর শাখার কাছাকাছি এসে চোখ আটকে গেল বাঁ পাশের একটি ফিলিং স্টেশনে। অন্ধকার রাতের পটভূমিতে সাদা সাদা কিছু ঝাঁকড়া গুচ্ছ দুলছে। প্রথম দেখায় মনে হলো— অসময়ে বুঝি কাশফুল ফুটেছে! শহরের মাঝখানে এমন দৃশ্য দেখে বিস্মিত না হয়ে উপায় ছিল না।
কৌতূহল আমাকে থামিয়ে দিল। মোবাইলে ছবি তুলে পাঠালাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার, উদ্ভিদবিশারদ ও প্রকৃতিবিদ মো. আব্দুর রহিমের কাছে। কিছুক্ষণ পর তার উত্তর এলো। আমার বিস্ময়েরও যেন নতুন দরজা খুলে গেল।
ওটি কাশফুল নয়, নলিনা পাম। অনেকেই একে পনিটেইল পাম (Ponytail Palm) বা হাতির পা (Elephant’s Foot) নামে চেনেন।
নামের শেষে ‘পাম’ থাকলেও এটি প্রকৃত অর্থে পাম বা খেজুর পরিবারের সদস্য নয়। এর বৈজ্ঞানিক নাম Beaucarnea recurvata। এটি Asparagaceae পরিবারের একটি সাকুলেন্ট উদ্ভিদ, যার জন্ম মেক্সিকোর শুষ্ক অঞ্চলে। পানি ধরে রাখার অসাধারণ ক্ষমতার কারণে মরুভূমির প্রতিকূল পরিবেশেও দিব্যি বেঁচে থাকে। তবে এখন এটি বাংলাদেশের শহুরে বাগান, অফিস, বাসাবাড়ি এমনকি সড়ক বিভাজকের সৌন্দর্যবর্ধনেও বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছে।
গাছটির সবচেয়ে বিস্ময়কর অংশ হলো এর গোড়া। গোলাকার, মোটা আর স্ফীত— ঠিক যেন হাতির পা। সেই অংশেই জমা থাকে প্রয়োজনীয় পানি। কাণ্ডটি সাধারণত একাই বেড়ে ওঠে। তার মাথা থেকে অসংখ্য লম্বা, সরু, সবুজ পাতা চারদিকে ঝরে পড়ে। দূর থেকে দেখতে যেন ঘোড়ার লেজ, আবার কখনো মনে হয় ঝরনার ধারা। সম্ভবত সেই পাতার শুভ্র আলোছায়াই আমার চোখে কাশফুলের বিভ্রম তৈরি করেছিল।
পনিটেইল পাম বহুবর্ষজীবী এবং ধীরগতিতে বেড়ে ওঠা উদ্ভিদ। জ্যৈষ্ঠ থেকে ভাদ্র মাসের মধ্যে এতে ফুল ও ফল আসে। গাছের স্ফীত গোড়া থেকে নতুন বাড বা কুঁড়ি বের হয়। সেই বাড আলাদা করে সহজেই নতুন চারা তৈরি করা যায়।
এই গাছটির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় অবশ্য সেদিন নয়। এর আগে ঢাকার বাংলা একাডেমির ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ভবনের সামনেও দেখেছিলাম। কিন্তু তখন শুধু চোখে পড়েছিল, মনে দাগ কাটেনি। রংপুরের সেই রাতেই যেন সত্যিকারের পরিচয় হলো— একটি গাছের সঙ্গে, আর প্রকৃতির এক মায়াবী বিভ্রমের সঙ্গে।
প্রকৃতি প্রায়ই মানুষকে ভুল দেখতে শেখায়, তারপর সেই ভুলের মধ্য দিয়েই নতুন সত্যের দরজা খুলে দেয়। আমরা কাশফুল খুঁজতে গিয়ে কখনো পেয়ে যাই নলিনা পাম, আবার অচেনা কোনো পাতার ভাঁজে আবিষ্কার করি পৃথিবীর অন্য প্রান্ত থেকে আসা এক বিস্ময়কর উদ্ভিদকে।
হয়তো এ কারণেই পথের ধারের প্রতিটি গাছ, প্রতিটি ফুল কিংবা প্রতিটি পাতার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে একটি গল্প। সেই গল্প শুধু তারাই শুনতে পায়, যারা পথ চলতে চলতে একবার থেমে তাকাতে জানে।
লেখক: কৃষিবিদ ও গবেষক




