হাত থেকে হাত ঘুরে বাড়ে পণ্যমূল্য

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিভিন্ন পণ্যের দাম কেন অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে, সেটি জানতে গবেষণা করেছে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি)। সংস্থাটির গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, দেশে খাদ্যপণ্যের অস্বাভাবিক দাম বাড়ার নেপথ্যে রয়েছে দীর্ঘ সরবরাহ শৃঙ্খল, অতিরিক্ত মধ্যস্বত্বভোগী এবং উচ্চ উৎপাদন খরচ। বিশেষ করে, নগর এলাকার আড়তদারদের ওপর খুচরা বিক্রেতাদের অতিনির্ভরশীলতা বাড়িয়ে দেয় বাজারে দামের অস্থিরতা।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর ব্র্যাক মিলনায়তনে আয়োজিত সংলাপে ‘বাংলাদেশে খাদ্যপণ্যের শৃঙ্খল: বাজার, মুনাফা ও মধ্যস্বত্বভোগী’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সিপিডি। গবেষণাটি করেন সংস্থার জ্যেষ্ঠ গবেষণা সহযোগী ফখরুদ্দীন আল কবির। ১০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য নিয়ে কাজ করেন তিনি। সেগুলো হলো চাল, ডাল, পেঁয়াজ, আলু, কাঁচা মরিচ, বেগুন, ডিম, গরুর মাংস, মাছ (রুই) এবং ব্রয়লার মুরগি।
ঊর্ধ্বমুখী চালের দর নিয়ে সিপিডির গবেষণা বলছে, কৃষক পর্যায়ে প্রতি কেজি পাইজাম চাল গড়ে ৩০ টাকা ৬৫ পয়সায় বিক্রি হয়। ওই চাল ব্যাপারী, মিলার, আড়তদার ঘুরে খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হয় ৫৯ টাকা ৬৯ পয়সা। তবে চালের দাম বেশি বাড়ে মিলারদের হাতে। একজন মিলার গড়ে ৩৩ দশমিক ৩৪ টাকায় ধান কিনে তা প্রক্রিয়াজাত শেষে বিক্রি করেন ৫২ দশমিক ৪৫ টাকায়। অর্থাৎ, এই একটি ধাপেই চালের দাম বেড়ে যায় প্রায় ১৯ টাকা।
অন্যদিকে কাঁচা মরিচের সরবরাহ ব্যবস্থা সবচেয়ে লম্বা। উৎপাদক থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত দাম বাড়ে প্রায় ১১৬ শতাংশ। রুই মাছের দাম বাড়ে ৭২ শতাংশ। তবে খুচরা পর্যায়ে মাছের দামের ওঠানামা বেশি। গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, ৮৭ শতাংশ পেঁয়াজের দাম বাড়ার ক্ষেত্রে কৃষক ও খুচরা বিক্রেতার প্রভাব বেশি। মসুর ডাল ৭৮ শতাংশ বাড়ার পেছনে পাইকার পর্যায়ে দাম নির্ধারণে বড় প্রভাব থাকে। পচনশীল পণ্য হিসেবে বেগুনের দাম বেশি থাকে কৃষক পর্যায়ে। আলুর দাম বাড়ার পেছনে হিমাগার ব্যবস্থার অদক্ষতা অন্যতম কারণ। ব্রয়লার মুরগির দাম বাড়ার ক্ষেত্রে পাইকারদের প্রভাব বেশি। ডিমের ২৫ শতাংশ দাম বাড়ার পেছনে উৎপাদন (ফিড ও ভ্যাকসিন) খরচই বেশি। আর গরুর মাংসের মূল্যবৃদ্ধির হার ১৩ শতাংশ। এই আমিষের উৎপাদন খরচ অত্যন্ত বেশি, অনেক সময় প্রান্তিক খামারিরা লোকসানে থাকেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে গবেষষণা প্রতিবেদনে।
সিপিডি বলেছে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যসংগ্রহ পদ্ধতি মেনে সংগ্রহ করা হয়েছে এসব তথ্য। রাজধানীর ১০টি খুচরা বাজার থেকে এবং ধারাবাহিকভাবে মোট ৮২০ বাজার প্রতিনিধির (কৃষক, ব্যাপারী, আড়তদার ও মিলার) সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।
গবেষক ফখরুদ্দীনের ভাষ্য, খাদ্য উৎপাদকের কাছ থেকে ভোক্তাপর্যায় পর্যন্ত যেভাবে পণ্যের দাম বাড়ছে, তা সামঞ্জস্যের নয়। এতে চাপ বাড়ছে ভোক্তাদের ওপর। কারণ, কোন পণ্যের দাম কত বাড়বে, তা কতজন মধ্যস্বত্বভোগী আছেন বা কতবার হাতবদল হয়, তার ওপর নির্ভরশীল। এটি বাজার ব্যবস্থাপনা ও খাদ্য শৃঙ্খলের জন্য ভীষণ হুমকি।
উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে মানুষের নাভিশ্বাস: গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে কয়েক বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলছে। দরিদ্র পরিবারগুলো তাদের আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশই ব্যয় করছে শুধু খাবারের পেছনে। অথচ নামমাত্র মজুরি বাড়লেও মুদ্রাস্ফীতির চাপে বাড়েনি সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয়। ফলে আয়ের অধিকাংশ খাদ্যে ব্যয় করতে গিয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক চাহিদাগুলো আজ চরম সংকটের মুখে।
দেশের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ খাদ্য নিরাপত্তার ঝুঁকিতে রয়েছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পণ্যের দাম বাড়লেও সমানভাবে লাভবান হচ্ছেন না সব কৃষক। বিশেষ করে, পোলট্রি ও গরুর মাংসের ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ (খাদ্য ও ওষুধ) এতই বেশি যে, অনেক সময় লোকসানে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন প্রান্তিক খামারিরা।
সংলাপে প্রধান অতিথি ছিলেন বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। বাংলাদেশে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির একটি অন্যতম প্রধান কারণ পণ্য পরিবহন ও ব্যবস্থাপনা ব্যয় উল্লেখ করে তিনি বললেন, সারা বিশ্বে গড়ে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১০ শতাংশ লজিস্টিক ব্যয় হিসেবে ধরা হয়, যা আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড। কিন্তু বাংলাদেশে এই ব্যয় গিয়ে ঠেকেছে প্রায় ১৬ শতাংশে। অবকাঠামোগত জটিলতা, তথ্যের সুনির্দিষ্ট আদান-প্রদান না থাকা এবং রাস্তায় জায়গায় জায়গায় হিসাববহির্ভূত খরচের কারণেই ভোক্তাপর্যায়ে অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যায় পণ্যের দাম।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এম এ সাত্তার মণ্ডল, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা ফেলো এম আসাদুজ্জামান, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ, সাবেক অর্থ সচিব সিদ্দিকুর রহমান, কৃষিবিদ জাহাঙ্গীর আলম, গার্মেন্টস শ্রমিক সংহতির সভাপতি তাসলিমা আখতার প্রমুখ।




