মামলায় আটকা ৮৩ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব
- আদালতের বাইরে নিষ্পত্তির উদ্যোগ; কোম্পানির মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করবেন অর্থমন্ত্রী
- রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি কর মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো কঠিন হবে— ড. জাহিদ হোসেন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজস্ব বকেয়া পড়েছে প্রায় ৮৩ হাজার কোটি টাকা। এ নিয়ে বেশ চিন্তিত সরকার। নানা পদক্ষেপের পরও বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও আসছে না কোনো ইতিবাচক ফল। আবার দ্রুত কিছু করারও উপায় নেই। কারণ পুরো বিষয়টি গড়িয়েছে আদালতে। সমাধানের কোনো লক্ষণ নেই। এ দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে এবার বিকল্প পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে আদালতের বাইরে গিয়ে মামলা নিষ্পত্তির। আগামী সপ্তাহ থেকেই বৈঠক শুরু করবেন অর্থমন্ত্রী। ডাকা হবে বকেয়া থাকা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মালিকদের। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।
জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন আদালতে মামলার কারণে বকেয়া রাজস্ব দাঁড়িয়েছে ৮২ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে আয়কর খাতে ৩৬ হাজার ৭০০ কোটি, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) খাতে ৩৬ হাজার ২০০ কোটি এবং শুল্ককর খাতে ৯ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা। এই বিশাল বকেয়া রাজস্ব চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ১৪ শতাংশ এবং বিদায়ী অর্থবছরের আদায়ের প্রায় ২০ শতাংশ। এ বছরের জন্য রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। বিদায়ী বছরে আদায় হয়েছে ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। এ অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না হওয়ায় সরকার ভুগছে অর্থসংকটে। ধরনা দিতে হচ্ছে বিদেশি সংস্থার কাছে। ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে কঠিন শর্তে উচ্চ সুদে। তাই বকেয়া কর আদায়ে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। হাতে নেওয়া হয়েছে মাসভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো— কর মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআরের আশ্রয় নেওয়া, সরকারি প্রতিষ্ঠানের বকেয়া কর আদায়ে বুক অ্যাডজাস্টমেন্ট করা, প্রয়োজনে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ এবং সার্টিফিকেট মামলায় যাওয়া। পাশাপাশি আইনি জটিলতা থাকলে অর্থ আইনে সংশোধনী আনা।
এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে চলতি অর্থবছরে অন্তত ৩০-৪০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় হতে পারে। এতে দেশের অর্থনীতিতে গতি আসবে। পাশাপাশি রাজস্ব ঘাটতি কমাতে ভূমিকা রাখবে— এমনটি মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের ভাষ্য, বকেয়া রাজস্ব আদায়ে সম্প্রতি এনবিআরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন অর্থমন্ত্রী। ওই বৈঠকে এনবিআরের পক্ষ থেকে প্রায় ৫০টি মামলার তালিকা দেওয়া হয়েছে। এসব মামলার সঙ্গে রাজস্ব জড়িত প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।
এনবিআরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মোট ৫ হাজার ৫০০টি আয়কর-সংক্রান্ত মামলা চলমান। এর সঙ্গে জড়িত রাজস্ব ৩৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট)-সংক্রান্ত ১১ হাজার ৬৮৪টি মামলা বিভিন্ন অাদালতে চলমান, যেখানে রাজস্ব বকেয়া ৩৬ হাজার ২০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া ১২ হাজার ৩৩৫টি শুল্ককর-সংক্রান্ত মামলা চলমান। এখানে বকেয়া রাজস্ব ৯ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা।
এনবিআর সূত্র জানাচ্ছে, বিচারাধীন আয়কর-সংক্রান্ত মামলায় সর্বোচ্চ বকেয়া রাজস্বের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। যার অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৯৭৫ কোটি ৭ লাখ টাকা। দ্বিতীয় অবস্থানে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেড, রাজস্ব ১ হাজার ১৯৫ কোটি টাকা। তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন মো. আলমাস আলী, বকেয়া রাজস্ব ১ হাজার ১৮ কোটি ৯ লাখ টাকা। এরপর রয়েছে ইউনাইটেড ময়মনসিংহ পাওয়ার লিমিটেড ৯৩৭ দশমিক ৮৮ কোটি টাকা এবং মো. মিজানুর রহমান ৪২৭ দশমিক ৭১ কোটি টাকা। এ তালিকায় আরও আছে জনতা ব্যাংক পিএলসির দুটি মামলায় মোট ৬৬৮ দশমিক ৪৪ কোটি টাকা, সোনালী ব্যাংক পিএলসির দুটি মামলায় ৫৭৮ দশমিক ৭১ কোটি, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের আরেকটি মামলায় ২৯১ দশমিক ১২ কোটি, ইউনাইটেড এনার্জি লিমিটেড (৩২২ দশমিক ২৬ কোটি), সিলেট গ্যাস ফিল্ড লিমিটেড (৩২০ দশমিক ৮১ কোটি), তমা কনস্ট্রাকশনস লিমিটেড (২৭৪ দশমিক ৬৫ কোটি) এবং এক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ পিএলসি ২৬৩ কোটি টাকা।
ভ্যাটসংক্রান্ত একাধিক মামলায় ব্রিটিশ-আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ লিমিটেডের (বিএটিবি) কাছে আটকা আছে ২ হাজার ৪৫৩ কোটি টাকা। গ্রামীণফোন লিমিটেডের বিরুদ্ধে চারটি মামলায় দাবি করা হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকা। এ ছাড়া নিটল মোটরস লিমিটেডের বিরুদ্ধে তিনটি মামলায় দাবি প্রায় ২ হাজার ১০ কোটি টাকা। একইভাবে রবি আজিয়াটা লিমিটেডের বিরুদ্ধে তিনটি মামলায় দাবি প্রায় ১ হাজার ৬৭ কোটি টাকা। এ ছাড়া প্রিমিয়ার ব্যাংক লিমিটেডের বিরুদ্ধে একটি মামলায় ৮২২ কোটি ৫৩ লাখ টাকা, ঢাকা টোব্যাকো ইন্ডাস্ট্রিজের বিরুদ্ধে ৫৩৬ কোটি ৮৮ লাখ, বাংলালিংক ডিজিটাল কমিউনিকেশন লিমিটেডের বিরুদ্ধে ৫৩২ কোটি ৪১ লাখ এবং মেঘনা পেট্রোলিয়ামের বিরুদ্ধে ২৬৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা।
এ বিষয়ে এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব আগামীর সময়কে বললেন, এসব মামলায় সরকারের পক্ষে শক্তিশালী আইনি ভিত্তি রয়েছে। তাই হাইকোর্টের কার্যতালিকায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মামলাগুলো অন্তর্ভুক্ত করে দ্রুত শুনানি ও নিষ্পত্তির ব্যবস্থা গ্রহণে অ্যাটর্নি জেনারেলের বিশেষ সহযোগিতা প্রয়োজন। আয়কর-সংক্রান্ত মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি হলে সরকারের রাজস্ব আহরণ কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে এবং চলতি অর্থবছরের প্রত্যক্ষ কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিশ্বব্যাংক ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেছেন, ‘কর আদায়ে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকাও কোনো সমাধান নয়। দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি, প্রযুক্তিনির্ভর কর প্রশাসন এবং করদাতাদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে প্রকৃত বকেয়া আদায় করা গেলে সরকারের রাজস্ব সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।’
তিনি আরও বললেন, রাজস্ব প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি কর মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি না হলে রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো কঠিন হবে। আদালতে দীর্ঘসূত্রতা কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করারও পরামর্শ দেন তিনি।




