কোথাও কিছু একটা আটকে গেছে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
: চলো, বের হতে হবে।
ফোনটা ভাইব্রেশনে ছিল। কোনো অনুষ্ঠানে গেলেই আগে সাইলেন্ট মুডে রাখতে। সারা দিনে আর কোনো খবর নেই। ফোনটা সাইলেন্ট করে রেখেছ— একদম ভুলে যাও।
নিরুপমা তার সঙ্গে অনুষ্ঠানগুলোতে আসবে, কিন্তু অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর আর থাকতে চাইবে না। একটু আড্ডা, কথা, চা-নাশতার পর্ব শান্তিমতো ওর জন্য শেষ করা হয় না। তার আগেই মেসেজ। সকালে উঠেই স্কুলে যেতে হবে। তার আগে রাতে বাচ্চাদের খাওয়ানো-পরানো, বিছানা গোছানো। রাজ্যের কাজ পড়ে আছে, দেরি করে গেলে কোনোটাই শেষ হবে না।
তোমার আজকের সেমিনার শুনতে শুনতে নিরুপমার বারবার আলিয়োশা কারামাজভের কথা হচ্ছিল। দ্য ব্রাদার্স কারামাজভ এই নিয়ে তিনবার হতে যাচ্ছে! ওর মা এই বইটার নাম দিয়েছিলেন নিরাময় পুস্তক। দ্বিতীয়বার পড়ার সময় নিরুপমার নিজেকে নারী-আলিয়োশা ভাবতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি। কিন্তু কতটা? তবে সে দিমিত্রি বা ইভান নয়— এটা নিশ্চিত ছিল। কিন্তু আজ অনেক দিন পর তোমার সেমিনার শুনতে শুনতে নিরুপমার এই প্রথম মনে হলো, সে অনেকটাই আলিয়োশা; কিন্তু বাকি দুজনের কিছু কিছু তার ভেতরে আছে।
তুমি ছোট্ট করে লিখলে, আর দুটা মিনিট। নামছি।
শিল্পকলা একাডেমিতে, নাটকে বা থিয়েটারে গল্প কীভাবে কাজ করে— এ নিয়ে কথা বলার জন্য তোমাকে ডেকেছিল। তুমি নিজে অনেক দিন ধরে এ গবেষণা করছ। নানা জায়গায় কত কিছু লিখছ। দেখা গেছে: মাত্র ১৩টা মৌলিক পদ্ধতি আছে গল্প বলার। এ ছাড়া বাকিগুলো মিলিয়ে-মিশিয়ে তৈরি। এক থেকে শূন্য— মাত্র ১০টি সংখ্যা দিয়ে যেমন সব সংখ্যা তৈরি, ১৩ রকমের কৌশল দিয়ে বাকি সব কৌশল তৈরি। তুমি ১৪তম কৌশলটি নিজের জন্য সন্ধান করছিলে। কথায় যেমন বলে, সাত সমুদ্র তেরো নদী। তুমি চৌদ্দতম নদী বা অষ্টম সমুদ্রটা পেতে চাইছিলে।
তুমি বলছিলে, ঘটনার ঢেউ তৈরি করলেই পরের ঘটনাগুলো তৈরি হতে থাকে। ঘটনার কাজই এমন। তোমার কথা শুনে একটা মেয়ে আবার এর সঙ্গে যোগ করল, অ্যাক্ট অব দ্য ফ্যাক্ট...। কী মানে হলো কথাটার? ঘটনার কাজ নতুন ঘটনা ঘটানো? একটা ঘটনা রেশমের গুটির মতো সুতা ছাড়তে থাকে? নাকি ‘ঘটনার কার্যকারিতা’ নাকি ‘ঘটনার বিধি’? দুরো। কথাটা মন থেকে সরিয়ে দিতে চাইলেও যাচ্ছে না। ওই যে ‘বানরের কথা ভাবব না, অন্তত আগামী তিন মিনিট’— এটা ভাবামাত্র রাশি রাশি বানর লাফিয়ে লাফিয়ে তোমার চিন্তা কোলে পড়ছে পড়ছেই। দুরো। বাদ। আচ্ছা কিছুক্ষণ ভাবা যাক: অ্যাক্ট অব দ্য ফ্যাক্ট। বেশ মজাই লাগছে কথাটা। তোমাকে ঘটনা তৈরি করতে হবে। জীবনে কিছু ঘটাতে চাইলে— ঘটনার পর ঘটনা ঘটিয়ে চলতে হবে— তবেই তোমার কাজের কাজ হবে।
সেমিনার শেষ হলে চা-নাশতা খাওয়ার সময় তিন-চারটা ছেলেমেয়ে এগিয়ে এলো। বলল, গল্প বলার কত রকম পদ্ধতি আছে— এ নিয়ে এমন সেমিনারে এই প্রথম তারা এলো। বলল, আপনি যে বললেন, যে ব্যক্তি, যে জনগোষ্ঠী সবার আগে গল্পটা বলে ফেলতে পারবে, তারই জিত। যেমন— মার্কেসের নিঃসঙ্গতার শতবর্ষ... এর চেয়ে ভালো কথা আর হয় না। কথাটা যে কোথায় শুনেছিলাম! আপনার নিজেরই কথা কি?
: না। আমার নিজের কথা না। নিজের মতো করে হয়তো কথাটা বলেছি।
: কিন্তু দারুণ লেগেছে।— একটি ছেলে বলল।
: সহজ কিন্তু গভীর।— মেয়েটি আবার বলল।
: ব্যাখ্যা করলে অনেক কথা পাওয়া যাবে।— আরেকটি মেয়ে বলল।
: দেখুন, আমাদের দেশে দুটো জিনিসের অভাব। একটি হলো দর্শন, আরেকটি হলো বিজ্ঞান। আর শিল্প বা আর্টের এত প্রাচুর্য আছে বলে মনে করি, আসলে আর্ট সম্পর্কে আমাদের ধারণা দর্শন-বিজ্ঞানের মতোই। ফলে দর্শন-বিজ্ঞান-আর্ট— এই তিন ক্ষেত্রেই প্রচুর কাজ করার আছে। গুটি কয়েক লোক এসবে মেতে উঠলে চলবে না। সবার এতে মেতে ওঠা কাজের কথাও নয়। কিন্তু উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের— এ তিন বাদে না মিলবে নিজেদের মুক্তি, না আমাদের। এই যে ছেলেটা, অল্প বয়সী ছেলে মাত্র তিনটি কথা বলল: আগে আমি মানুষ। আগে সবার অধিকার। তারপর আমার ধর্ম। এই কথা উন্নত বিকশিত দেশে বললে এর কোনো অর্থই হতো না, হতো কি? অত্যন্ত মামুলি কথা। মাতামাতি করার প্রশ্নই উঠত না। কিন্তু দেখুন কী রকম সাড়া পড়ে গেল? অথচ কত সহজ ঘটনাগুলোই না কত বড় হয়ে ওঠে! মেয়েটাই তখন কথাটা তুলল, অ্যাক্ট অব দ্য ফ্যাক্ট ইজ কন্টিনিউয়াস লিভিং। বেঁচে থাকাটা চালিয়ে যাওয়াই হলো সব ঘটনার একমাত্র কার্যকারিতা।
: জি, গল্প বলাটা বেঁচে থাকার অনেকগুলো কৌশলের একটা কৌশল। আরব্য রজনীর শেহেরজাদি বা নাগরিকা, সেই কৌশলেই তো বেঁচে ছিল। এসব আপনি ফুকোতেও পেয়ে যাবেন।
তুমি দুনিয়াজাদির নাম দিয়েছিল জীবনিকা। যেমনটা তুমি নিরুপমা হাসানকে বলো। নিরুপমা নির্লিপ্ত নিরাসক্তি তোমাকে বরাবরই মুগ্ধ করেছিল। নিরুপমা শুধু বড় লোকের মেয়েই নয়, রীতিমতো শিল্পপতির মেয়ে। কিন্তু নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াবে। মানুষের জন্য এমন কোনো কাজ করবে, যাতে তার বেঁচে থাকাটাও হয়, আবার সেবাও হয়। এ জন্যই শিক্ষকতা। প্রথমে ইংলিশ মিডিয়ামে শুরু করেছিল, এখন বাংলা মাধ্যমের স্কুলে কাজ করছে। বাবা তাকে প্রাইভেটে ভর্তি করে দিয়েছিল। তখন তার নিজের ইচ্ছা ছিল, বিদেশেই পাকাপাকিভাবে চলে যাবে। বড় আপু আর মেজো ভাই যেভাবে গেছে। কিন্তু বড় ভাইয়ের মতো সে দেশেই থেকে গেল।
তুমি নিরুপমার অনেক কিছুই জানো, আবার কিছুই জানো না। আসলে কথাগুলো সেও কাউকে বলতে পারেনি। তার মনে হয়েছিল, অন্তত স্কুলে পড়ার সময়, তার কানেও এসেছিল, তার জীবনে ওই বয়সে যা ঘটেছিল, তা অনেক মেয়ের জীবনেই ‘কমন’ ঘটনা। নিরুপমা তোমাকে বলতে পারেনি যে, গল্প বলার জন্যই সে হয়তো পরে সেসব স্বাভাবিকভাবে নিতে পেরেছিল। আমাদের যার যার জীবনের অনেক কিছুই আমরা গোপন সুড়ঙ্গ দিয়ে অতল অন্ধকারের দিকে সারা জীবনের জন্য ঢেলে দিয়েছি, আর কোনোদিন তা ফিরিয়ে আনা যাবে না; সে নিজেও আনতে চাইবে না। মনে পড়ে, রাঙামাটির সেই দ্বীপের মতো জায়গাটা। কাপ্তাই লেকের ভেতরে বাবা-মা আর ছোট ভাইয়ের সঙ্গে বেড়াতে যাওয়া। সঙ্গে সাইহাম আর ওর বাবা-মা ছিল। নিরুপমা দ্বীপে নামার পর নিজের মতো হাঁটতে হাঁটতে কোন জঙ্গলের দিকে চলে গিয়েছিল, খেয়ালও করেনি। হঠাৎ তার মনে হয়েছিল, সে হারিয়ে গেছে। ভয়ে সারা শরীর হিম হয়ে গিয়েছিল। এখন সে কি চিৎকার করবে? এতক্ষণে সে কোথায় গেল, এ নিয়ে কি বাবা-মায়ের পাগল হওয়ার দশা? ঠিক তখন দেবদূতের মতো সাইহামের বাবা তাইবুল আঙ্কেল। আর পেয়েই সে আঙ্কেলের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। আরেকটু হলে হয়তো হাউমাউ করে কেঁদেই ফেলত। কিন্তু আঙ্কেল তাকে প্রথমে স্বাভাবিকভাবে জড়িয়ে ধরলেও পরে সে টের পায়, অনেকগুলো অস্বস্তি কিলবিল করা সাপের মতো তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে। টের পাওয়া মাত্র সেই প্রথমে আস্তে, পরে জোরে চিৎকার করে উঠেছিল। তাতে মনে হয়, তাইবুল আঙ্কেলেরও হুঁশ ফিরে এসেছিল। অদ্ভুত ব্যাপার হলো, নিরুপমাকে ছেড়ে দিয়ে তিনি হঠাৎ হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়লেন, ইংরেজিতে বলে উঠলেন: এ আমি কী করলাম! সরি আঙ্কেল, আমাকে মাফ করে দাও আঙ্কেল! বারবার নিরুপমাকে এই কথা বলছিলেন তিনি। নিরুপমার জীবনে সবচেয়ে গোপন ঘটনাটার সেদিনই জন্ম হয়েছিল, আর সেইদিন কি মৃত্যু হয়েছিল? ঘটনাটা সে কাউকে বলতে পারেনি। পরে কখনো কখনো মনে হয়েছে, ঘটনা বলে না ফেললেই বরং ঘটনাগুলো জ্যান্ত থাকে। বলে ফেলার ভেতর দিয়েই আমরা ঘটনাগুলোকে খুন করি, মেরে ফেলি; আর মেরে ফেলে নিজেদের বাঁচাটাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাই।
এই না-বলা ঘটনাটা প্রথম দিকে তোমাকে অনেকবার বলতে চেয়েও আর বলতে পারেনি। নিরুপমার মনে হয়েছে, এতদিন যখন না বলে থাকতে পেরেছি, তো সেটি গোপনেই থাকুক। আজকে সেমিনারে তোমার কথা শুনতে শুনতে অন্যদের অনেক কিছুই মনে হয়েছিল। কিন্তু নিরুপমার মনে হয়েছিল একটা কথাই, ঘটনা ওই দিন তাইবুল আঙ্কেলের কান্নাটাই আটকে দিয়েছিল। তার মনে হয়েছিল পরে, পুরুষ মানুষ সম্পর্কে সতর্কতা ও মায়া দুটো একসঙ্গে তার মনে তৈরি হয়েছিল। নইলে তোমার কাছে বহুবার শোনা, আরব্য রজনীর বিপরীতে, পারস্য রজনীর রাজকন্যার যেমন পুরুষের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে গিয়েছিল, তেমনটা নিরুপমার বেলায়ও হতে পারত কি না? সারা জীবনের জন্য সে আর পুরুষদের বিশ্বাস করতে পারত কি না? হয়তো এর ভেতর দিয়ে গোপন কোনো মানসিক রোগ প্রথমে ধীরে, পরে একটু একটু করে বাড়তে বাড়তে তাকে কুরে কুরে খেয়ে ফেলতে শুরু করত। সেটা ঘটেনি অনেকগুলো কারণেই; ভালো সঙ্গ, ভালো বই আর ভালো সিনেমার জন্যই। মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখার এই সুযোগটা সে পেয়েছিল। কিন্তু ভাইরাল হওয়া ঘটনাটা রাজীব শাহের মসজিদ নিয়ে ওই যে ছেলেটা, সে কোথা থেকে পেল এই কথাটা, জগতের সবচেয়ে মূল্যবান উপলব্ধিটা? গত দুদিন ধরে গাড়িতে ফিরতে ফিরতে বারবারই সে তোমাকে বলছিল। তুমি তখনো বিষয়টা দেখনি। সেমিনার পেপার তৈরি আগে, ঘটনার সূত্রে ঘটনা তৈরির ব্যাপারটা এলে, হঠাৎ তুমি ইউটিউবে গিয়ে সেটা দেখে নাও। ছেলেটার নাম কি বলেছিল কেউ? একটা অজানা-অচেনা ছেলে, জগতের সবচেয়ে মূল্যবান কথাটা বলে ফেলল? কোন গল্প দিয়ে এটা বলা যেতে পারত না? সেই গল্পটা কেমন গল্প হতো? তুমি তো ট্রিপল ই-য়ের মাস্টার। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াও। কাজ করো গল্প বলার কৌশল নিয়ে। গত তিনটা দিন তোমাকে ঘিরে আছে এই ছেলেটার কথা। বিউটি পালের ‘শ্রাবণের মেঘগুলো জড়ো হলো আকাশে’— ভিডিওটা মানুষের স্বাভাবিক আনন্দপ্রবণতার একটা অভিব্যক্তিমাত্র। এটাও এত স্বাভাবিক; কিন্তু আমাদের দেশে সেটাও এমন ভাইরাল হলো কেন? কোথাও কোনো একটা কিছু আটকে গেছে! আর তুমি নিশ্চিত জানো, কোথাও কোনো একটা কিছু আটকে গেলে, সেটা ছোটানোর জন্য সবচেয়ে বড় টেনে তোলার ক্রেন, তার নামই হলো গল্প। জগতে সবচেয়ে বড় ‘ভেকু’। তবে গল্পের প্রধান সমস্যা একটাই— গল্প কখনোই শেষ হয় না, কেবলই একটা খেলা মুখ তৈরি করে। নিরুপমার সঙ্গে জঙ্গলে তাইবুল আঙ্কেলের ঘটনারও খোলা মুখ আছে। সেই কথাগুলো গল্প বলার কলাকৌশলের সন্ধানবিষয়ক সেমিনারে নিরুপমা পেয়েছিল।
নিরুপমা বিস্ময়করভাবে দেখেছিল, তাইবুল আঙ্কেল, মানে তাইবুল হাসান, তার বাপির ঘনিষ্ঠতম বন্ধু, তাদের বাসায় আসা তো বন্ধ করে দিয়েছিলেনই, হঠাৎ করে সবকিছু বেচাবিক্রি করে তিনি সেই তখন কানাডায় চলে গিয়েছিলেন। কানাডায়ও বলে তার ব্যবসায় ফুলেফেঁপে উঠেছিল। বাপি বলত, তাইবুল হলো বিজনেসওয়ার্ল্ডের ম্যাজিশিয়ান। কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই কীভাবে কী থেকে কী করে ফেলে, বিস্ময়কর। তাইবুল হাসান সেদিন কাঁদতে কাঁদতে ইংরেজিতে বলেছিলেন, তোমার মা-বাবা আমাকে এত বিশ্বাস করতেন, আর তারই এমন অমর্যাদা করলাম! নিরুপমার ইচ্ছা হচ্ছিল, এবার সে-ই জড়িয়ে ধরে তাইবুলকে, কিন্তু কেন যেন পারেনি। নিরুপমা আজ নতুন করে বুঝল, এই না-পারা থেকেই আসলে গল্প তৈরি হয়। নিরুপমা তোমাকে কথাটা বলেছিল। গাড়িতে ফিরতে ফিরতে তুমি তাকে বলেছিলে, আর মানুষ কেবল একটা জিনিস নিশ্চিতভাবে পারত, সেটা হলো মানুষ হতে, যা সে হতে চায় না বলেই এত ঝামেলা লেগে আছে।




