চট্টগ্রাম ওয়াসার ৮৬ কোটি গেল কোথায়

চট্টগ্রাম ওয়াসা
কাগজে-কলমে বিপুল অঙ্কের টাকা। কিন্তু বাস্তবে সেই টাকার কোনো হদিস নেই। এই টাকা হিসাবের খাতায় আছে, তবে বাস্তবে অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছেন না নিরীক্ষকরা। সাত বছর ধরে এমন চিত্র স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন সরকারি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম ওয়াসায়। সংস্থাটির তহবিল থেকে ‘নিখোঁজ’ ৮৬ কোটি টাকা। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত হয়েছে টানা সাতটি অডিট। প্রতিবারই বেরিয়ে এসেছে একই অনিয়ম। কিন্তু প্রতিবারই নীরব থেকেছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ।
বিপুল এই টাকা কোথায় আছে, কোথায় ব্যয় হয়েছে কিংবা আদৌ এর অস্তিত্ব আছে কি না— এর কোনো নথিপত্রও নেই ওয়াসার কাছে। সাত বছরের অডিট প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে সংস্থাটির আর্থিক এই অনিয়মের চিত্র পাওয়া গেছে। খোদ ওয়াসার কর্মকর্তারাও এই টাকার হদিস দিতে পারেননি। আর্থিক খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আর্থিক কোনো অনিয়মকে আড়াল করতে গায়েব করা হয়েছে নথিপত্র। কারা এর সঙ্গে জড়িত, তা তদন্ত করে বের করা উচিত।
অডিট প্রতিবেদনগুলো বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত সাত বছরের চূড়ান্ত হিসাব নিরীক্ষার দায়িত্ব পেয়েছিল তিনটি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট প্রতিষ্ঠান। এর মধ্যে ২০১৭-১৮ ও ২০১৮-১৯ অর্থবছরের হিসাব নিরীক্ষা করে খান ওয়াহাব শফিক রহমান অ্যান্ড কোম্পানি। তাদের প্রতিবেদন দুটি জমা পড়ে যথাক্রমে ২০২১ সালের ২৪ জুন ও ২০২২ সালের ৬ জুলাই। এই দুই অর্থবছরের প্রতিবেদনেই নিরীক্ষকরা আর্থিক ওই গরমিলের তথ্য তুলে ধরেন। তাদের কোয়ালিফাইড ওপিনিয়ন বা শর্তযুক্ত মতামত অনুযায়ী,
অন্যদিকে ২০১৯-২০, ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরের নিরীক্ষা করে রহমান মোস্তফা আলম অ্যান্ড কোম্পানি। তাদের বার্ষিক চূড়ান্ত হিসাবে প্রতিবেদন জমা পড়ে ২০২৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর এবং ২০২৫ সালের ২৩ জুন। এই তিন বছরের অডিটেও একই অঙ্কের ইকুইটি দেখানো হয়, কিন্তু নিরীক্ষকদের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য কোনো উপযুক্ত কাগজপত্র বা সোর্স ডকুমেন্ট সরবরাহ করতে পারেনি ওয়াসা। প্রয়োজনীয় নথি না পাওয়ায় অডিট দল এই অর্থের
সবশেষ ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরের অডিট করে এমআরএইচ দে অ্যান্ড কোম্পানি। যাদের প্রতিবেদন জমা পড়ে ২০২৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ও ৯ জুন। গত ২২ জুন ওয়াসার কর্মসম্পাদন সহায়তা কমিটির সভায় ২০২৩-২৪ অর্থবছরের অডিট প্রতিবেদনটি গৃহীতও হয়। এই দুই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, দীর্ঘদিন ৮৬ কোটি ৬ লাখ ৬২ হাজার ৩২৯ টাকার এই ইকুইটি দেখানো হলেও তা যাচাইয়ের মতো পর্যাপ্ত ও উপযুক্ত সহায়ক নথি ওয়াসা কর্তৃপক্ষ দিতে
সাত বছর ধরে প্রতিটি অডিট প্রতিবেদনেই একই ধরনের গুরুতর আর্থিক অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হচ্ছে। নিরীক্ষকরা বারবার ব্যাংক রসিদ বা সরকারি আদেশের মতো সোর্স ডকুমেন্ট চাইলেও তা সরবরাহে প্রতিবারই ব্যর্থ হয়েছে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ।
নিরীক্ষকদের ভাষ্য, ইকুইটি বলতে বোঝায় প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব মূলধন। অতীতে কোনো এক সময় কোনো একটি উৎস থেকে এই অর্থ ওয়াসার তহবিলে যুক্ত হয়েছিল বলে হিসাবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে তা নগদ অর্থ হিসেবে ব্যাংকে জমা আছে, নাকি কোনো সম্পদ কেনায় খরচ হয়ে গেছে। তার কোনো হদিস মিলছে না।
এই টাকার উৎস এবং সাত বছরেও কেন প্রয়োজনীয় নথি সরবরাহ করা যায়নি, জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ওয়াসার নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী সেলিম মোহাম্মদ জানে আলম বললেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’ যদিও গত ৯ জুন সর্বশেষ অডিট প্রতিবেদনে তিনি যে স্বাক্ষর করেছেন, সেখানে এই অনিয়মের বিস্তারিত উল্লেখ রয়েছে।
আবার সংস্থাটির উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (অর্থ) শারমিন আক্তার স্বীকার করে বলেছেন, ‘এই টাকা মূলধন তহবিলে দেখালেও এর সমর্থনে কোনো নথিপত্র নেই। এটি সরকার কোনো এক সময় মূলধন হিসেবে দিয়েছিল। কিন্তু নথিপত্র না থাকায় কোথায় খরচ হয়েছে, তা বলা সম্ভব হচ্ছে না। এই অডিট আপত্তি সমাধানের জন্য বিষয়টি বোর্ডসভায় তোলা হবে।’
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চট্টগ্রাম ওয়াসার এই আর্থিক অস্বচ্ছতা ও নথিপত্র গায়েবের ঘটনা শুধু অডিট আপত্তি নয়; বরং প্রচলিত একাধিক সরকারি আইন ও হিসাবমানের স্পষ্ট লঙ্ঘন। আর্থিক বিবরণীতে নথিপত্র না দেখিয়ে হিসাব প্রস্তুত করা ‘ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং আইন, ২০১৫’ অনুযায়ী আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। উপযুক্ত চালান বা সোর্স ডকুমেন্ট ছাড়া ক্যাপিটাল ফান্ডের কোটি কোটি টাকা দেখানো ‘সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৯’-এর বড় ব্যত্যয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা মানদণ্ডের
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বললেন, ‘টাকার হিসাব যদি থাকে, তাহলে এই টাকা কোথা থেকে এসেছে, কোথায় ব্যয় হয়েছে তার নথি অবশ্যই থাকতে হবে। যদি না থাকে, তাহলে বুঝতে হবে কোনো আর্থিক অনিয়ম আড়াল করতে এই নথি গায়েব করা হয়েছে।’



