হারবার বিলে
- আমাদের হাওর-বাঁওড়ের অভাব নেই। আর এগুলোতে বেড়ানোর সেরা সময় বর্ষা। শ্রাবণের মাঝামাঝিতে এখন বৃষ্টির রাজত্ব দেশ জুড়ে। এ সময় পাঠকদের তাই ঘুরিয়ে আনছি যশোর আর ময়মনসিংহের জলে টইটম্বুর দুই জলাধার থেকে

আকাশে একদিকে ঘনীভূত কালো মেঘের তোড়জোড়, অন্যপ্রান্তে আচমকা কড়া রোদ। অটোরিকশা চলছে। গন্তব্য— হারবা। আরও স্পষ্ট করে বললে, হারবার বিল। খোয়া বিছানো ভাঙা রাস্তার ঝাঁকুনিতে আমাদের চারজনের ঝালমুড়ির দশা! যেতে যেতে চোখে পড়ল অনেকের হাতেই কবুতর। বোঝা গেল এলাকায় শৌখিন পাখাল বেশ ভালো সংখ্যায় আছেন। যেদিন যাচ্ছি, কাশিগঞ্জ বাজারে হাটবার; যারা হাটে যাচ্ছেন, সবকিছুর সঙ্গে এই কবুতরও তাদের অন্যতম আগ্রহের বিষয়।
খানিক বাদে আমরা এসে পড়লাম বিল এলাকায়। থইথই পানি! গলা অবধি ডুবন্ত গাছগুলো কোনোমতে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দিচ্ছে। দূরে ছোট ছোট ডিঙিতে আর কলাগাছের ভেলায় ভেসে অনেকে মাছ ধরছেন। কচুরিপানার দৌরাত্ম্য কম হওয়ায় আশপাশটা বেশ পরিষ্কার।
বিলে এসেছি অথচ নৌকায় চড়ব না, তা তো হতেই পারে না! কিন্তু অনেকটা খোঁজার পরেও কোনো নৌকার দেখা পেলাম না। যা-ও পাই, হয় মাঝি নেই, না হয় মাঝি নিজেই কাজে ব্যস্ত। এদিকে আকাশে কালোর ঘনত্ব ক্রমে বেড়ে চলেছে। মনে হচ্ছে, এখনই বৃষ্টি ভেঙে পড়বে। সঙ্গে ব্যাগ ও ফোন আছে, অথচ ছাতার সংকট; আশপাশে তেমন কোনো দোকানপাটও দেখছি না।
এমন সময় বিলের ভেতর দিয়ে সোজা চলে যাওয়া একটি মেঠো রাস্তা চোখে পড়ল। যেই না পা বাড়িয়েছি, অমনি টুপটাপ বৃষ্টি শুরু, খানিকপরেই ঝুম বৃষ্টি। এই বৃষ্টি আর মাতাল বাতাসে মন বলছিল একটু ভিজি, কিন্তু কাছে থাকা ব্যাগ আর ফোনের চিন্তায় দ্বিধায় পড়ে গেলাম। দুটি ছাতায় চারজন কোনোমতে দাঁড়িয়ে যখন এসব ভাবছি, তখনই যেন ‘ত্রাণকর্তা’ হয়ে এলেন জাকির ভাই— এখানকার মাঝি।
আমাদের অবস্থা আঁচ করতে পেরে নিজেই বললেন, ভাই, আপনারা ভিজতে চাইলে ভিজুন। আমার নৌকায় ব্যাগ রাখতে পারেন, চিন্তার কিছু নেই, হারাবে না।
খানিকটা সংশয় নিয়েই ব্যাগটা উনার কাছে রেখে আমরা বৃষ্টিতে ভিজতে শুরু করলাম। আমাদের সংশয় একবারে কেটে গেল তখন, যখন উনার ছোট ছোট ছেলেমেয়েও হেসে আমাদের সঙ্গে যোগ দিল! আনন্দের মাত্রা ওদেরও কোনো অংশে কম না। এই কাদায় ঝাঁপ দিচ্ছে তো এই ভিজে নৌকার পানি সেচার কাজে হাত লাগাচ্ছে, কথা আর হাসিতে রিমঝিম তুলছে চারপাশে। ঝুম বৃষ্টি আর বাতাসের ঝাপটায় নৌকায় বসে চারপাশের রূপ দেখে আমরা মুগ্ধ। কিছু সময়ের জন্য সব চিন্তা ভুলে প্রকৃতির এই আশীর্বাদে নিজেদের হারিয়ে ফেললাম।
বৃষ্টিতে নৌকা চালানোর ইচ্ছা ছিল অনেক দিনের, তাই বৈঠাটা নিজেই হাতে তুলে নিয়ে নৌকা দিলাম ভাসিয়ে। এরই মধ্যে জাকির ভাই গল্পের ঝাঁপি খুলে বসেছেন— ছোটবেলায় বিলটি কেমন ছিল, মাছ ধরার গল্প থেকে শুরু করে নিজের ছোট বাচ্চাদের পড়াশোনার স্বপ্ন। ঘণ্টাখানিক বাওয়ার পর বিদায়বেলা এলে দাওয়াত দিলেন তার বাসায় খাওয়ার জন্য। ততক্ষণে বিকেল গড়িয়ে এসেছে, ক্যাম্পাসে ফিরতে হবে। আবার দেখা করার আশ্বাস দিয়ে আমরা কাশিগঞ্জে ফেরত আসলাম।
হারবায় আসার সময়ই কাশিগঞ্জের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুতিয়া নদীটি নজর কেড়েছিল। বর্ষায় পানি বেড়ে নদীটা এখন টইটম্বুর। তবে সবচেয়ে বেশি টানছিল যাতায়াতে ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের নৌকা। সময় তখন প্রায় সন্ধ্যা। না পেরে বন্ধুদের প্রস্তাব দিলাম— একটি নৌকায় উঠব, কোথাও নামব না; যে ঘাটে নামাবে, সেখান থেকেই ফিরতি নৌকা ধরে চলে আসব। সবাই রাজি!
ঠিক ওই সময়ই ঘাটে থাকা একটি বড় নৌকা ছেড়ে যাবে, আমরা উঠে পড়লাম। নদীর বুক চিরে নৌকা এগিয়ে যাচ্ছে গোধূলিবেলায়; নদীর ধারের গাছগুলোতে পাখিরা নীড়ে ফিরছে। পানি বেড়ে মাঠ আর নদী এক হয়ে এক মোহনীয় পরিবেশ তৈরি করেছে। ছোটবেলায় শোনা কোনো মেছোভূতের গল্পের আবহের সঙ্গে মিল খুঁজে পেলে দোষের কিছু নেই।
হঠাৎ সবাই চিৎকার করে উঠল, ‘মাথা নামান সবাই, লাগবে, লাগবে!’ প্রথমে বুঝতে না পারলেও একটু পরেই দেখলাম নৌকাটি একটি নিচু পুলের নিচ দিয়ে যাচ্ছে। মাথা না নামালে সংঘর্ষ নিশ্চিত! পুল পার হওয়ার পর সবার মুখে চওড়া হাসি— হারবায় বসেই ভেনিসের আমেজ! একটু পর একটি মেঠো রাস্তার ধারে নৌকা থামলে যাত্রীরা নেমে গেলেন নিজ নিজ গন্তব্যে। ইচ্ছা করছিল আমরাও নামি। কিন্তু সময় নেই, ফিরতে হবে। ফিরতি নৌকায় শুধু আমরা চারজন আর দুজন মাঝি। সন্ধ্যাটা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকল। বিভূতিবাবুর মতো মনে একটা অদ্ভুত শখ জাগল, এখানে একটা বাড়ি থাকলে কেমন হতো?
রাত ৯টায় চমৎকার সব স্মৃতি নিয়ে আমরা ক্যাম্পাসে পৌঁছালাম। সাধারণ মানুষের নিখাদ আন্তরিকতা পুরো সফরটিকে দারুণ এক অভিজ্ঞতা এনে দিয়েছে। টঙের দোকানে গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে তৃপ্তি নিয়ে আমরা চারজন উদ্যাপন করলাম সুন্দর একটি দিনের সমাপ্তি।
যেভাবে যাবেন
ঢাকার মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে ময়মনসিংহগামী বাসে চেপে ত্রিশালের ‘সাইনবোর্ড বাজার’ নামতে হবে। সেখান থেকে অটোতে সরাসরি হারবা। জায়গাটির নিবিড় অভিজ্ঞতা পেতে বর্ষার মৌসুমে যথার্থ সময় এবং ছুটির দিন ছাড়া গেলে আরও নিবিড়ভাবে উপভোগের সুযোগ পাওয়া যায়।








