এভারেস্টের চূড়ায় নিম্নি, ১৪ বছর পর বাংলাদেশি নারী সর্বোচ্চ শিখরে

এভারেস্টের চূড়ায় নিম্নি। ছবি: বাংলা মাউন্টেনিয়ারিং অ্যান্ড ট্র্যাকিং ক্লাব
রাত তখন প্রায় শেষের দিকে। হিমালয়ের ওপর জমে আছে কালচে নীল অন্ধকার। বাতাসে অক্সিজেন এত কম যে প্রতিটি শ্বাস যেন ফুসফুসের সঙ্গে যুদ্ধ। তাপমাত্রা হিমাঙ্কের বহু নিচে। বরফের ধারালো ঢাল বেয়ে ধীরে ধীরে ওপরে উঠছেন এক বাংলাদেশি নারী। মাথার ওপরে তারাভরা আকাশ, নিচে হাজার ফুট গভীর খাদ।
আট হাজার মিটারের ওপরে মানুষের শরীর আস্তে আস্তে নিভে যেতে থাকে। কেউ বেশিক্ষণ সেখানে টিকে থাকতে পারে না।
কিন্তু সেই মৃত্যুর অঞ্চল পেরিয়েই আজ ২৭ মে ভোর ৫টা ২৪ মিনিটে পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গে দাঁড়ালেন বাংলাদেশের নুরুন্নাহার নিম্নি।
বাংলাদেশের পতাকা তুলে ধরলেন পৃথিবীর ছাদে।
দীর্ঘ ১৪ বছর পর আবার কোনো বাংলাদেশি নারী উঠলেন মাউন্ট এভারেস্টের চূড়ায়। খবরটি নিশ্চিত করেছে বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাব। নেপালের অভিযান পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এইটকে এক্সপেডিশনের প্রতিনিধি অ্যাঙ তেম্বা শেরপাও আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। নিম্নির সঙ্গে ছিলেন দাওয়া নুপু শেরপা ও লাকপা থিনদুক শেরপা।
এই সাফল্যের শুরু আজ ভোরে হয়নি।
শুরুটা হয়েছিল বহু বছর আগে, চট্টগ্রামের চন্দ্রনাথ পাহাড়ে।
২০০৬ সাল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী নিম্নি ফিল্ডওয়ার্কে গিয়েছিলেন পাহাড়ে। সেই প্রথম পাহাড়কে কাছ থেকে দেখা। অদ্ভুত এক টান অনুভব করেছিলেন। তারপর পাহাড় তার কিংবা তিনি পাহাড়ের পিছু ছাড়েননি আর।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের বড় একটা সময় কেটেছে বান্দরবানের পাহাড়ে ঘুরে। পরে চাকরিতে ঢুকেছেন, ব্যাংকার হয়েছেন, নিয়মিত অফিস করেছেনকিন্তু পাহাড়ের ডাক থামেনি। ভুটান, সিকিম, নেপাল—একটার পর একটা ট্রেক তাঁকে ঠেলে দিয়েছে আরও উঁচুতে।
২০১৯ সালে নেপালের অস্ট্রেলিয়ান ক্যাম্পে গিয়ে প্রথম বড় স্বপ্নটা মাথায় আসে। একদিন এভারেস্টে উঠবেন। সেই স্বপ্ন পূরণের পথ মোটেও সহজ ছিল না।
২০২০ সালে করেন এভারেস্ট বেজক্যাম্প ট্রেক। এরপর শুরু হয় পেশাদার প্রস্তুতি। ২০২২ সালে ভারতের দার্জিলিংয়ের হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণ নেন। একই বছর যোগ দেন বাংলা মাউন্টেইনিয়ারিং অ্যান্ড ট্রেকিং ক্লাবে।
বাংলাদেশে পর্বতারোহণ এখনো বিলাসী কোনো খেলা নয়। এখানে নেই পর্যাপ্ত স্পনসর, নেই শক্তিশালী অবকাঠামো। একটা এভারেস্ট অভিযানের খরচই কোটি টাকার কাছাকাছি। তারপরও কিছু মানুষ পাহাড়ের জন্য জীবন পর্যন্ত বাজি রাখেন। নিম্নি তাদেরই একজন।
গত ১১ এপ্রিল ঢাকা ছাড়েন তিনি। নেপালের কাঠমান্ডু থেকে লুকলা, তারপর এভারেস্ট বেজক্যাম্প। কয়েক সপ্তাহ ধরে শরীরকে মানিয়ে নেন অতিউচ্চতার নির্মম পরিবেশের সঙ্গে।
এভারেস্টে ওঠা শুধু শক্তির খেলা নয়, ধৈর্যেরও পরীক্ষা। শরীরকে ধাপে ধাপে মানিয়ে নিতে হয়। না হলে উচ্চতাজনিত অসুস্থতায় মানুষ হঠাৎ করেই মারা যেতে পারে।
১৭ মে শুরু করেন চূড়ান্ত অভিযান। ধীরে ধীরে পৌঁছে যান ক্যাম্প–৪-এ। সেখান থেকেই শিখরের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন। কিন্তু হিমালয়ের আবহাওয়া মানুষের পরিকল্পনা মানে না। ভয়ংকর প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ফিরে আসতে হয় তাঁকে।
অনেকের স্বপ্ন সেখানেই শেষ হয়ে যেত। কিন্তু নিম্নি আবার ফিরে দাঁড়ালেন।
কয়েক দিন ক্যাম্প–২-এ অপেক্ষা করলেন আবহাওয়া স্বাভাবিক হওয়ার জন্য। তারপর ২৫ মে আবার শুরু হয় আরোহণ। ক্যাম্প–২ থেকে ক্যাম্প–৩। সেখান থেকে ক্যাম্প–৪।
তারপর শুরু হয় সবচেয়ে ভয়ংকর অংশ।
সন্ধ্যার পর হেডল্যাম্পের ক্ষীণ আলোয় তাঁরা এগোতে থাকেন বরফের দেয়াল বেয়ে। চারদিকে শুধু বাতাসের গর্জন। কোথাও কোথাও পথ এত সরু যে এক পাশে পা ফসকালেই শেষ।
এভারেস্টের শেষ অংশে আছে হিলারি স্টেপ, বরফঢাকা খাড়া অংশ, জমাট দড়ির পথ। সেখানে ক্লান্ত শরীর আর কাজ করতে চায় না। কিন্তু থামলে বিপদ আরও বাড়ে।
সারারাত সেই মৃত্যুর পথ পেরিয়ে অবশেষে আজ ভোরে পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিন্দুতে পৌঁছান নুরুন্নাহার নিম্নি।
বাংলাদেশের জন্য এটি একটি অপেক্ষার অবসানও। ২০১২ সালের ১৯ মে প্রথম বাংলাদেশি নারী হিসেবে এভারেস্ট জয় করেছিলেন নিশাত মজুমদার। তাঁর মাত্র এক সপ্তাহ পর শিখরে ওঠেন ওয়াসফিয়া নাজরীন। তারপর কেটে গেছে দীর্ঘ ১৪ বছর। আর কোনো বাংলাদেশি নারীকে দেখা যায়নি এভারেস্টের মাথায়।
অবশেষে সেই শূন্যতা ভাঙলেন নিম্নি। বাংলাদেশের এভারেস্ট ইতিহাসের দিকে একটু চোখ বুলানো যাক।
২০১০ সালের ২৩ মে এভারেস্ট জয় করেন মুসা ইব্রাহীম। এরপর এম এ মুহিত দুবার এভারেস্ট জয় করেন।
২০১৩ সালে এভারেস্ট শিখরে উঠেছিলেন সজল খালেদ। কিন্তু নামার পথে হিমালয় তাঁকে কেড়ে নেয়। বরফের ভেতর হারিয়ে যান বাংলাদেশের এক স্বপ্নবাজ পর্বতারোহী।
তারপর দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষা। ২০২৪ সালে আবার আলোচনায় আসেন বাবর আলী। এভারেস্ট জয় করার পর থেমে থাকেননি তিনি। একে একে জয় করেছেন বিশ্বের পাঁচটি আট হাজার মিটার উচ্চতার পর্বত। বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই প্রথম। ভয়ংকর কঠিন মাকালু জয় করেও ইতিহাস গড়েছেন তিনি।
তারপর ২০২৫ সালে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত থেকে হেঁটে এভারেস্ট চূড়ায় ওঠেন ইকরামুল হাসান শাকিল।
আর এবার বাংলাদেশ থেকে একমাত্র অভিযাত্রী হিসেবে এভারেস্ট জয় করলেন নুরুন্নাহার নিম্নি।
নিম্নির সাফল্যের খবর শুনে বাবর আলী বলেন, '১৪ বছর পর আবার কোনো বাংলাদেশি নারী এভারেস্টের চূড়ায় পৌঁছালেন। নিঃসন্দেহে এটা এ দেশের নারী পর্বতারোহীদের উৎসাহ অনেক বাড়িয়ে দেবে।'
সত্যিই তাই।
নিম্নির জন্য শুভকামনা।










