পাহাড়ের ভরসা বাবুল ভাই

ছবি: লেখক
অফিসে আসার পথে রিকশায় বসে হঠাৎ মনে পড়ল বাবুল ভাইয়ের কথা। ফোন দিতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো পরিচিত সেই কণ্ঠ, ‘কেওক্রাডং থেকে নামছি স্যার।’
কুশল বিনিময়ের পর একটু মন খারাপ করেই জানালেন, এখন আর আগের মতো ট্রেকিং হয় না। চান্দের গাড়ি সোজা কেওক্রাডং পর্যন্ত চলে যায়। এতে পর্যটকদের সুবিধা হয়েছে ঠিকই; কিন্তু আমার মতো পাহাড়-জঙ্গলপ্রেমী মানুষ আর বাবুল ভাইয়ের মতো পরিশ্রমী গাইডদের কাছে যেন হারিয়ে গেছে পথের সেই রোমাঞ্চ।
বাবুল ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয় পাঁচ-ছয় বছর আগের এক নভেম্বরে। কেওক্রাডং যাচ্ছি। দলে ৫০ ছুঁইছুঁই বয়সী নারী থেকে শুরু করে ছয় বছরের শিশু— সবাই আছে। পুরুষ সদস্য বলতে শুধু আমি আর মহিউদ্দীন। একজন অভিজ্ঞ গাইডের খোঁজে প্রথমে পরিচিত একজনকে বললাম। দলে নারী ও শিশুর কথা শুনে এমন ভাব করলেন, যেন পাহাড় শুধু শক্তসমর্থ যুবকদের জন্য! আরেকজনও একই কারণে বিনয়ের সঙ্গে না করে দিলেন।
ঠিক তখনই কয়েকজনের মুখে শুনলাম বাবুল ভাইয়ের নাম। ফোনে সব খুলে বলতেই হেসে বললেন, ‘আপনার মেয়ের টেনশন আমার। মা-মণিরে কাঁধে করে নিমু।’
রুমায় পৌঁছে বুঝলাম, সত্যি অসাধারণ মানুষ তিনি। বগা লেক থেকে কেওক্রাডংয়ের পথ মুনা খালামণি, রুথি আর রাফার জন্য ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। সেই পুরো পথটায় বাবুল ভাই একাই ছিলেন সবার ভরসা। পিছল পাথুরে পথ, নড়বড়ে সেতু, চিংড়ি ঝরনায় ওঠানামা— সবখানেই তিনি হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। খাড়া চড়াইয়ে হাঁসফাঁস করতে থাকা তিনজনের ব্যাগও টেনে নিয়েছেন নিজের কাঁধে।
একসময় অবস্থা এমন হলো, সামান্য ঢাল দেখলেই রুথি চিৎকার করে উঠত, ‘বাবুল ভাই, হেল্প!’ আর ওয়াফিকা ক্লান্ত হয়ে বলত, ‘গাইড আংকেল, পারছি না।’
দার্জিলিং পাড়া, কেওক্রাডং, বগা লেক সব জায়গাতেই আমাদের নিরাপত্তার দিকেই ছিল তার বেশি নজর। রাতের বেলায় কেউ ঘর থেকে বেরোলেই পাশের কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করতেন, কিছু লাগবে কি না, কিংবা দূরের টয়লেটে একা যেতে পারবেন তো? এমনকি এক রাতে ঘুমের মধ্যেই ওয়াফিকা চিৎকার করে উঠেছিল, ‘আংকেল, বাঁচাও!’
আজ কেওক্রাডং পর্যন্ত পাকা রাস্তা পৌঁছে গেছে, তবু গাইড নেওয়া এখনো বাধ্যতামূলক। পরিবার নিয়ে গেলে আমার কথা— সঙ্গে যদি থাকেন বাবুল ভাই, তবে দুর্গম পথও হয়ে যায় সহজ।




