চর হেয়ারের ডায়েরি

পটুয়াখালীর চর হেয়ারে বেড়াতে যাওয়া, মাছ ধরা আর ক্যাম্পিংয়ের গল্প শুনিয়েছেন মনিরুল ইসলাম
‘ভাইয়া, আজ চর মন্তাজের লঞ্চ নেই’— অফিসে ঢুকতেই শাওনের ফোন। হঠাৎ করে ব্রেক কষলে গাড়ি যেভাবে ঝাঁকুনি খায়, মনটাও সে রকম এক ধাক্কা খেল। মন্তাজ পর্যন্ত যদি সরাসরি যেতে পারতাম, ঝামেলাটা কিছুটা হলেও কমানো যেত। এখন কলাপাড়ার লঞ্চে উঠতে হবে, তারপর নামতে হবে রাঙ্গাবালীর কোড়ালিয়া ঘাটে। সেখান থেকে আবার নতুন পথ, নতুন হিসাব। এবারে আমাদের গন্তব্য চর হেয়ার। যদিও স্থানীয়দের কাছে পরিচিত চর কলাগাছিয়া নামে। স্থানীয় উচ্চারণে সেটি হয়ে যায় কলাগাইচ্ছা।
সারা রাত লঞ্চ চলার পরে সকালে যখন কেবিনের বাইরে এসে দাঁড়ালাম, তখন লঞ্চ আওলিয়াপুর ঘাটে ভিড়ছে। বিশাল রক্তিম সূর্য পানির ওপর ভেসে আছে। ছোট ছোট মাছ ধরা নৌকাগুলো না ঘুমানো ঢুলুঢুলু চোখ নিয়ে ঢেউয়ের তালে দুলতে দুলতে মহাজনের ঘাটের দিকে ফিরছে। মাস্টার ব্রিজের সামনে সূর্যোদয় দেখতে দেখতে আলাপ স্থানীয় বাসিন্দা শোয়েবের সঙ্গে।
আমাদের গন্তব্য ও উদ্দেশ্য শুনে পুরো পরিকল্পনা পাল্টে দিলেন শোয়েব। গঙ্গিপাড়ার নেতাগোছের একজনকে ফোন দিয়ে নৌকা ঠিক করে দিতে বললেন। আমাদের পরিকল্পনা ছিল কোড়ালিয়া ঘাট থেকে নৌকা নিয়ে সরাসরি কলাগাছিয়া চলে যাওয়া। কিন্তু এবার আমরা ব্যাটারির রিকশায় ছুটলাম গঙ্গিপাড়ার দিকে। বাহেরচর পেরিয়ে গঙ্গিপাড়া এসে কুদ্দুস ভাইকে খুঁজে বের করলাম। এর পরের দায়িত্ব তার।
তরতর করে ছুটে চলল আমাদের ইঞ্জিনচালিত নৌকা। ওটা যখন মূল নদীর উত্তাল ঢেউ ছেড়ে শান্ত চরের খালের মধ্যে এসে ঢুকল, তখন সূর্য মধ্যগগনে। মাথার ওপর রোদের তীব্র খরতাপ থাকলেও চরে পা রাখামাত্রই যেন এক মায়াময়, স্নিগ্ধ ছায়ার রাজ্যে প্রবেশ করলাম। আকাশ ছোঁয়ার প্রতিযোগিতায় মত্ত উঁচু উঁচু বাবলা আর ঝাউগাছের দল পুরো পথটাকে পরম মমতায় ছায়ার চাদরে জড়িয়ে রেখেছে।
একটু ভেতরে চোখ যেতেই জেলেদের কিছু অস্থায়ী কাঁচা স্থাপনা আর ঘরবাড়ি চোখে পড়ল। সেখান থেকে আর কিছুটা সামনে এগোতেই একটি দোকান। এখানকার দোকানগুলো স্থানীয় জেলেদের প্রাত্যহিক চা-নাশতার প্রয়োজন মেটানোর জন্য গড়ে উঠলেও এখন পর্যটকের তৃষ্ণা ও ক্লান্তি মেটাতেও দারুণ সাহায্য করছে। সেই দোকান ছাড়িয়ে আরেকটু সামনে যেতেই পেলাম তোফায়েল সাহেবের রেস্টুরেন্ট। শুধু খাবারদাবারই নয়, চরে রাত কাটানোর জন্য পর্যটকদের তাঁবু বা ক্যাম্পিংয়ের ব্যবস্থাও করে দেওয়া হয় এখান থেকে।
পেদার দোকানে
পিঠে ভারী ব্যাগ চাপিয়ে তাঁবু খাটানোর উপযুক্ত একটা জায়গার সন্ধানে পা বাড়ালাম। সৈকত ছাড়িয়ে আমরা একটু ভেতরের দিকে, ছায়াঘেরা জঙ্গলের কোলে সুনসান এক জায়গায় আশ্রয় নিলাম। তাঁবু খাটানো শেষ করে ভেতরের সব মালসামান রেখে দ্বীপটা ঘুরে বেড়াতে বের হলাম। আমাদের অভিযাত্রা থামল গিয়ে সুলতান পেদার দোকানে। কাঠের নড়বড়ে বেঞ্চিতে বসে ধোঁয়া ওঠা গরম চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতেই শুরু হলো আড্ডা। পেদার দোকানে সামিয়া নামের ছোট্ট মেয়েটির কোলে চুপচাপ বসে আছে পুকু নামের শান্ত এক বিড়াল। সুলতান কাকার ছেলে আমাদের কৌতূহলী চাহনি দেখে একগাল হেসে বলল, ‘পুকুর বাপ-মা দোনডাই আমি। রাস্তা থেকে টোহাই আনছিলাম। আইজতক আমার লগেই থাকে, আমার কম্বলের তলেই ঘুমায়।’ তারপর আমাদের অবাক করে দিয়ে যোগ করল, ‘দুই দিন আগেও ভাত খাইছে। কিন্তু এখন তো পর্যটক আসা শুরু হইছে, তাদের দেওয়া বিস্কুট, চানাচুর খায়।’
সামিয়া অবশ্য ওই দোকানের স্থায়ী বাসিন্দা নয়, সে এসেছে চর মন্তাজ থেকে বেড়াতে। আমাদের চোখ ততক্ষণে স্থির চর হেয়ারের মোহনায় ডুবন্ত সূর্যে। সেখানে তেঁতুলিয়া নদী মিশেছে সমুদ্রের সঙ্গে। এমন দৃশ্য আগে বহুবার দেখেছি— পাহাড়ে, সমুদ্রে। তবু এই মুহূর্তটির সামনে দাঁড়িয়ে মনে হলো, যেন স্মৃতিতে থাকা সব সূর্যাস্তকে মুছে, নতুন করে এই ছবিটাই জায়গা করে নেবে। বিশাল রক্তগোলকের মতো সূর্যটা, ধীরে ধীরে ডুব দিচ্ছে নদীর বুকে। মুহূর্তে মুহূর্তে রঙ বদলাচ্ছে— প্রথমে পাতলা হলুদ, তারপর গাঢ় কমলা, পরে লালচে কমলার গভীর দাহ, শেষমেশ ডুব দেওয়ার আগে এক অদ্ভুত রক্তিম লাল।
সকালে উঠে সৈকত ধরে দ্বীপের প্রায় পুরোটাই চক্কর কেটে এলাম। ওপারে সোনার চরের মাথার ওপর সূর্য উঠে আসতেই তাঁবুতে ফিরে এলাম। দুপুরে নদীতে নাইতে এসে দেখি, সৈকতের ঠিক পাশেই মাছধরা ট্রলার নোঙর করা। শাওন-শান্তা, জুয়েল বাচ্চাদের মতো ঝুলে ঝুলে উঠে পড়ল বোটে। আমি ও কানিজ অবশ্য ততটা ক্ষিপ্র নই, বয়সটাও দেখতে হবে। ওদের টেনে ধরা হাতের ভরসায় কোনোমতে উঠতে পারলাম। বোটের ডেকে দাঁড়িয়ে ঢেউ গুনছি আর চান্দু চাচার সঙ্গে গল্প চলছে মাছের খবর, নদীর স্রোত, গত বছরের ঝড় নিয়ে।
এর মধ্যে হাজির এক ‘ক্যারিয়ার’ নৌকা। এরা নিজেরা জাল ফেলতে যায় না; নদী-সমুদ্রে ছড়িয়ে থাকা, মহাজনের দাদন দেওয়া নৌকাগুলো থেকে ইলিশ সংগ্রহ করে। ক্যারিয়ার নৌকার মাঝি সজীব ও তার সহযোগী লালচানও আলোচনায় যোগ দিল। এর মধ্যে ট্রলারের মালিক দুই ভাই হেলাল, নেছারসহ অন্যরাও হাজির। আমরা আবদার করলাম, আমাদের মাছ ধরতে নিয়ে যেতে হবে। ‘যদি সাড়ে ৩টার মধ্যে আইতে পারেন, তাইলে লগে নেতে পারমু’— উত্তর মিলল।
আমরা ঠিক সাড়ে ৩টায় নৌকায় উঠে গেলাম। ভটভট শব্দ করে ছুটে চলল নৌকা। এখন ইলিশের মৌসুম না। তার ওপর পূর্ণিমার জো শুরু হয়েছে। এই সময়ে নদীতে মাছ পাওয়া যায় না। তাই অনেকেই বাড়িতে ফিরে গিয়েছে। দু-একটি নৌকা যে রয়েছে, সেগুলোও আগামীকাল চলে যাবে।
হাতের তালুতে জ্যান্ত ইলিশ
সমুদ্রের বুকে জেলেদের জাল ফেলা বা জাল ওঠানো যে কী ভীষণ এক নিখুঁত শিল্প, তা নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। জাল গোটানোর কাজটা যতটা ধীর আর সময়সাপেক্ষ, ঠিকঠাক গোছানো থাকলে ফেলার কাজটা যেন চোখের এক পলকেই শেষ হয়ে যায়। বাতাসে ডানা মেলার মতো করে জালটা যখন পানিতে ছড়িয়ে পড়ে, সেই দৃশ্য এক অদ্ভুত সুন্দর অনুভূতি তৈরি করে।
তবে বেশি অভিভূত হতে হয় যখন জলজ্যান্ত মাছগুলো ছটফট করতে করতে ওপরে উঠে আসে। এবার অবশ্য জালে মাছের সংখ্যা কিছুটা কম আর সাইজও বেশ ছোট। রুপালি ইলিশ, চকচকে তপসে আর সঙ্গে আরও কিছু অচেনা সামুদ্রিক মাছের মেলা বসেছিল জালের ভেতরে। ঠিক তখনই রিয়াদ একটা জ্যান্ত ইলিশ এনে হাতে দিল। জীবনের প্রথমবার একটা জ্যান্ত ইলিশ সরাসরি নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে দেখা! হাতের তালুর ওপর জীবন্ত রুপালি ইলিশ মাছটা যখন তীব্র শক্তিতে লাফাচ্ছিল, তখন আমি বিহ্বল!
দিনের আলো নিভে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে জেলেরা জাল গোটানো শুরু করেছিল। কিন্তু সেই জাল গুছিয়ে আবার সাগরের বুকে ফেলে আসতে আসতে চারপাশ একদম ঘুটঘুটে অন্ধকার, রাত নেমে এলো নদীতে, দ্বীপে। মাছ না খাইয়ে ওরা কিছুতেই আমাদের ছাড়তে চাইল না। তাদের এককথা— টাটকা ইলিশ না খেয়ে ফেরা যাবেই না! এই অমায়িক আবদার ফেলে কার সাধ্যি!
নদীর বুকে ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে কুপি আর টর্চের মৃদু আলোয় তৈরি হয় এক অপার্থিব পরিবেশ। দুলতে থাকা কাঠের পাটাতনে গোল হয়ে বসে, তরঙ্গের হালকা দুলুনি গায়ে মেখে চলল আমাদের খাওয়া-দাওয়া।
ক্যাম্প সাইটে ফিরে মিনি স্টোভে চায়ের কেটলি চড়িয়ে দেওয়া হলো। গরম চায়ের কাপে চুমুক দিতেই চরের রাতের স্নিগ্ধ বাতাসে আবার জমে উঠল আড্ডা। এরই মধ্যে দুটো স্থানীয় কুকুর লেজ নাড়তে নাড়তে তাঁবুর সামনে এসে হাজির হলো। পরম মায়ায় ওদের রাতের খাবার দিয়ে আমরাও এক অদ্ভুত প্রশান্তি আর ভালোলাগা নিয়ে স্লিপিং ব্যাগের ওমে নিজেদের সঁপে দিলাম।






