সাঁওতাল গ্রামে

নর্ত নদীতে মাছ শিকার করছেন সাঁওতালরা। ছবি: লেখক
বাংলাদেশের উত্তর অঞ্চলে সাঁওতাল আদিবাসীর বসবাসের কথা ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন বইপত্র ও নানা মাধ্যম থেকে জেনেছি। তবে সরাসরি তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ বা গ্রামে যাওয়ার সুযোগ হয় ২০২৫ সালে। জুন মাসের এক সকালে রংপুর থেকে রওনা হই সিংড়া জাতীয় উদ্যানের উদ্দেশে। দিনাজপুরের বীরগঞ্জ উপজেলার ভোগনগর ইউনিয়নে অবস্থিত সিংড়া শালবনে ঘোরাঘুরি শেষে যাই সিংড়া ও চাউলিয়া গ্রামের দিকে। বরেন্দ্রর মতো লাল না হলেও ধূসর লাল মেঠোপথ ধরে শালবনের মধ্য দিয়ে পথ ধরলাম সিংড়ার আদিবাসী পাড়ার দিকে। শুনেছিলাম, সিংড়া জাতীয় উদ্যানসংলগ্ন এ দুই গ্রামে সাঁওতাল আদিবাসীদের বসবাস।
সিংড়া গ্রামের এদিকটায় এখনো কিছু কিছু মাটির ঘরের দেখা মেলে। তবে বেশিরভাগই টিন অথবা সরকারি প্রকল্পের বা নিজ উদ্যোগের ইটের দেয়াল।
সাঁওতাল গ্রাম ঘুরে লোকজনের দেখা পেলাম কমই। খোঁজ নিয়ে জানলাম, গ্রামের প্রায় শতভাগ সাঁওতাল কৃষিনির্ভর দিনমজুর। ফলে নারী-পুরুষ সবাই গেছেন জীবিকার সন্ধানে। ফিরতে ফিরতে দুপুর গড়িয়ে বিকাল।
অল্প যে কজন ছিলেন, তাদের সঙ্গে বসলাম গ্রামের এক চায়ের দোকানে। আড্ডা শুরু হলো নাম-পরিচয় থেকে সিংড়া শালবন নিয়ে। তারা বলেন, সিংড়া বাগান বা বাগান। আগে নাকি এই বনে শালগাছের পাশাপাশি অন্যান্য বুনো ও দেশি ফলের গাছ ছিল। সময়ের সঙ্গে পুরনো দিনের সেই গাছপালা এখন নেই। বাগানে পশুপাখির সংখ্যাও খুব কম। আগে শীত এলেই দলবেঁধে বেরিয়ে পড়ত সাঁওতালরা শিকারে। তীর-ধনুক, লাঠি, বাঁটুলসহ নিজেদের ঐতিহ্যগত শিকারের সরঞ্জাম, এমনকি সঙ্গে যেত পোষমানা শিকারি কুকুর। বেশ আয়োজন করে সেই শিকার ভাগাভাগি বা খাবারের ব্যবস্থা হতো। তবে বর্তমানে বন্যপ্রাণীর সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় এবং আইনের জন্য কেউ আর আগের মতো শিকারে যান না।
তবে সামাজিক উৎসব, বিয়ে, পূজা-পার্বণের আয়োজন রয়েছে। যদিও প্রায় সবাই মিশনারির হাত ধরে খ্রিস্টান হয়ে গেছেন বহু আগেই। ফলে সাঁওতাল আদিবাসীদের নামেও বেশ পাশ্চাত্যের প্রভাব দেখা যায়। তবে পদবিতে হাসদা, কিসকু, টুডু, মাডরি, মুর্মু, হেমরম, বাসকের ব্যবহার আছে। শিক্ষা-দীক্ষা বা আধুনিকতায় সাঁওতাল অন্যান্য জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাল মেলাতে না পারলেও একেবারে যে অপরিবর্তিত আছে, তা বলা যায় না, বিশেষ করে মেয়েরা খেলাধুলায় বেশ এগিয়ে।
যেভাবে যাবেন: ঢাকা থেকে বাস বা ট্রেনে দিনাজপুর বা বীরগঞ্জে যাওয়া যায়। বীরগঞ্জ বা ‘২৫ মাইল’ মোড় থেকে অটোরিকশা বা রিকশায় সিংড়ায় পৌঁছাতে পারবেন।




