এভারেস্ট দিবস
মৃতের অভিনয় করে বেঁচে ফেরা আফগান মেয়েটি এভারেস্টের চূড়ায়

বাসের ভেতর তখন শুধু চিৎকার আর গুলির শব্দ।
আফগানিস্তানের ধুলোমাখা পাহাড়ি পথ ধরে ছুটে চলা বাসটিতে যেন নরক নেমে এসেছে। বন্দুকধারী তালেবান যোদ্ধারা যাত্রীদের পরিচয় যাচাই করছিল। হাজারা হলেই মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত। একে একে গুলি করা হচ্ছিল একজনের পর একজন মানুষকে। রক্ত ছড়িয়ে পড়ছিল বাসের মেঝেতে।
সেই রক্তের মধ্যেই পড়ে ছিল এক কিশোরী।
নিঃশ্বাস আটকে, চোখ বন্ধ করে, মৃত মানুষের মতো নিথর হয়ে।
নাম জাকিয়া আহমাদ। এখন অবশ্য পৃথিবী তাকে চেনে— রিভার নামে।
সেদিন যদি তার চোখের পাতা একবারও নড়ত, তাহলে হয়তো গল্পটা এখানেই শেষ হয়ে যেত। কিন্তু তিনি বেঁচে যান। বারোটি মরদেহের পাশে নিজের শরীর মিশিয়ে রেখে মৃত্যুকে ফাঁকি দেন। পরে বহু সাক্ষাৎকারে বলেছেন, সেই মুহূর্তে তিনি বুঝেছিলেন— বেঁচে থাকাটাই এক ধরনের যুদ্ধ।
আফগানিস্তানের মধ্যাঞ্চলের দুর্গম হাজারাজাত অঞ্চল। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বৈষম্য আর নিপীড়নের ইতিহাস বয়ে চলেছে হাজারা জনগোষ্ঠীর জীবনে। মঙ্গোল বংশোদ্ভূত এই জনগোষ্ঠীর চেহারা অন্য আফগানদের চেয়ে আলাদা, ধর্মীয় পরিচয়ও ভিন্ন। শিয়া হওয়ায় সুন্নি উগ্রবাদীদের হামলার শিকার হয়েছে তারা বারবার। তালেবান শাসন ফিরে আসার পর সেই ভয় আরও তীব্র হয়ে ওঠে। পাহাড়ঘেরা জনপদগুলোতে শিক্ষা, স্বাধীনতা কিংবা স্বপ্ন সবই ধীরে ধীরে বিলীন হতে থাকে।
জাকিয়ার বয়স তখন আঠারো।
কিন্তু মৃত্যুর সেই বাসযাত্রার পর তার জীবন আর আগের মতো থাকেনি।
প্রথমে তিনি পালিয়ে আশ্রয় নেন ভারতে। তারপর উদ্বাস্তু হিসেবে পৌঁছান অস্ট্রেলিয়ায়। নতুন দেশ, নতুন ভাষা, নতুন মানুষ। অথচ ভেতরে জমে ছিল পুরনো আতঙ্ক। রাতে ঘুম ভেঙে যেত গুলির শব্দ কানে বাজতে বাজতে। অনেক উদ্বাস্তু যেমন অতীত ভুলে যেতে চায়, জাকিয়া ঠিক উল্টোটা করলেন। তিনি নিজের বেঁচে থাকার গল্পটাকেই শক্তিতে রূপ দিলেন।
তখনো তিনি জানতেন না, এক দিন পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পাহাড় তার জন্য অপেক্ষা করছে।
পাহাড়ের সঙ্গে জাকিয়ার সম্পর্ক শুরু হয় খুব নীরবে। আফগানিস্তানের পাথুরে পাহাড় দেখে বড় হওয়া মেয়েটি অস্ট্রেলিয়ায় এসে প্রথম বুঝলেন, পাহাড় শুধু ভয় নয়, মুক্তিও হতে পারে। মানুষের শরীর যেমন চূড়ার দিকে ওঠে, তেমনি মনও ধীরে ধীরে অন্ধকার থেকে আলোয় উঠতে থাকে।
তিনি নিজের নামের সঙ্গে যোগ করলেন আরেকটি পরিচয়— রিভার বা নদী।
নদীর মতোই তার জীবনও থেমে থাকেনি। এক দেশ থেকে আরেক দেশে, এক যন্ত্রণা থেকে আরেক স্বপ্নে প্রবাহিত হয়েছে। পাহাড়ে হাঁটতে হাঁটতে তিনি যেন নিজের ভেতরের ভাঙাচোরা অংশগুলোকে আবার জোড়া লাগাতে শুরু করেন।
মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই জাকিয়া আরোহণ করেন আফগানিস্তানের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ নওশাখ। তারপর ইউরোপের সর্বোচ্চ পর্বত মন্ট ব্ল্যাঙ্ক। কিন্তু তার চোখ তখন আরও উঁচু কোথাও স্থির। মাউন্ট এভারেস্ট।
এভারেস্ট শুধু একটি পাহাড় নয়। এটি মানুষের সীমার পরীক্ষা।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮ হাজার ৮৪৯ মিটার উঁচু সেই মৃত্যুঘেরা অঞ্চলকে পর্বতারোহীরা বলে ‘ডেথ জোন’। সেখানে বাতাসে অক্সিজেন এত কম যে শরীর ধীরে ধীরে নিজের ভেতর থেকেই নিঃশেষ হতে শুরু করে। একেকটি পদক্ষেপ নিতে লাগে কয়েকবার শ্বাস। সামান্য ভুল মানেই হাজার ফুট নিচে পতন, কিংবা বরফের নিচে চিরঘুম।
এই পথেই হাঁটছিলেন জাকিয়া।
হিমালয়ের বরফঢাকা ঢালে তখন বাতাস ছুরি হয়ে আঘাত করছিল মুখে। জমাট ঠান্ডায় হাত-পায়ের অনুভূতি হারিয়ে যাচ্ছিল। খুম্বু আইসফলের বিশাল বরফখণ্ডগুলো যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে। রাতের অন্ধকারে হেডল্যাম্পের ক্ষীণ আলোয় সামনে শুধু সাদা মৃত্যু।
তবু তিনি এগিয়ে যাচ্ছিলেন।
কারণ তার এই আরোহণ শুধু ব্যক্তিগত স্বপ্ন ছিল না। এটি ছিল প্রতিবাদ। আফগানিস্তানের মেয়েদের হয়ে পৃথিবীর সর্বোচ্চ চূড়ায় দাঁড়ানোর এক প্রতীকী যুদ্ধ।
এভারেস্ট অভিযানের আগে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, যখন পাহাড়ে হাঁপিয়ে ওঠেন, তখন আফগান মেয়েদের কথা ভাবেন। ভাবেন সেসব কিশোরীর কথা, যাদের স্কুলে যাওয়ার অধিকার নেই, কথা বলার স্বাধীনতা নেই, স্বপ্ন দেখার সুযোগ নেই। সেই চিন্তাই তাকে আবার সামনে এগিয়ে নেয়।
তারপর এলো সেই সকাল।
২০২৬ সালের ২১ মে।
ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি হিমালয়ের আকাশে। পৃথিবীর মাথার ওপর দাঁড়িয়ে ছিলেন জাকিয়া। চারপাশে শুধু বরফ, মেঘ আর অসীম নীল শূন্যতা।
একসময় যে মেয়ে বাসের ভেতরে মৃতের অভিনয় করে বেঁচে ছিল, সেই মেয়েই এখন পৃথিবীর সর্বোচ্চ বিন্দুতে দাঁড়িয়ে।
তিনি কাঁদছিলেন।
হয়তো মনে পড়ছিল রক্তমাখা সেই বাসের কথা। হয়তো মনে পড়ছিল উদ্বাস্তু শিবিরের রাতগুলো। কিংবা আফগানিস্তানের সেসব মেয়ের কথা, যারা এখনো বন্দি অন্ধকারে।
সেই মুহূর্তে জাকিয়া শুধু একজন পর্বতারোহী ছিলেন না। তিনি হয়ে উঠেছিলেন প্রতীক। সাহসের, বেঁচে থাকার, অসম্ভবকে ছুঁয়ে ফেলার প্রতীক।
ইতিহাস বলছে, তিনিই প্রথম আফগান নারী যিনি মাউন্ট এভারেস্ট জয় করেছেন।
পৃথিবীর ইতিহাসে অনেক মানুষ এভারেস্টে উঠেছেন। কেউ গৌরবের জন্য, কেউ রেকর্ডের জন্য, কেউ ব্যক্তিগত স্বপ্ন পূরণের জন্য। কিন্তু জাকিয়ার এই আরোহণের ভেতরে ছিল এক জাতির দীর্ঘ বেদনা, উদ্বাস্তু জীবনের ক্ষত আর নারীর স্বাধীনতার আকুতি।
হয়তো এ কারণেই তার গল্প মানুষকে এত গভীরভাবে ছুঁয়ে যায়।
কারণ মানুষ পাহাড়ের সঙ্গে জয় করে নিজের ভয়কে।
আর জাকিয়া সেই ভয়কে পরাজিত করেছেন বহু আগেই— সেদিন, রক্তাক্ত বাসের ভেতরে মৃতের অভিনয় করে বেঁচে ওঠার মুহূর্তে।
এভারেস্ট ছিল শুধু তার পরের অধ্যায়।
সূত্র: বিবিসি, ইউরোনিউজ, আনাদোলু এজেন্সি, টিআরটি ওয়ার্ল্ড, হেরাল্ড সান










