মহাকাশ বিজ্ঞান
পথ দেখাচ্ছে সেক্সট্যান্ট

আন্তঃগ্রহীয় প্রাণীতে পরিণত হতে চায় মানুষ। যেখানে অন্য গ্রহেও হবে তার ঠিকানা। হাই-টেক এই স্বপ্নের মধ্যেও প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে তিনশ বছর আগের প্রাচীন প্রযুক্তি। লিখেছেন সিরাজাম মুনিরা
একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক যুগের এই চরম উৎকর্ষের সময়েও মানুষের গভীর মহাকাশ অভিযান ও ভবিষ্যৎ মঙ্গল গ্রহের দুরূহ যাত্রায় নিরাপত্তার শেষ ভরসা হয়ে উঠছে তিনশ বছর আগের এক প্রাচীন সামুদ্রিক যন্ত্র— সেক্সট্যান্ট। আধুনিক ইলেকট্রনিক নেভিগেশন ও স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থা কোনো কারণে পুরোপুরি ব্যর্থ হলে মহাকাশচারীদের নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনার কাজে এই সনাতন তারকামাপা যন্ত্রটি কার্যকর এক বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ওরিয়ন স্পেসক্রাফটের নেভিগেশন সিস্টেম ম্যানেজার গ্রেগ হোল্টের মতে, পৃথিবী থেকে যতদূরে মহাকাশযান এগিয়ে যায়, আর্থ-বেসড বা স্যাটেলাইট প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা তত কমতে থাকে। সে সময় মহাকাশচারীদের পুরোপুরি নির্ভর করতে হয় ষোড়শ, সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর ক্ল্যাসিকাল বা ধ্রুপদি নেভিগেশন কৌশলের ওপর। মহাকাশের সেই বিশাল শূন্যতায় নিজস্ব অবস্থান নির্ণয় এবং নির্দিষ্ট নক্ষত্রমণ্ডলীর সাপেক্ষে নিজেদের অবস্থান ও ওরিয়েন্টেশন বুঝে নেওয়ার মতো প্রাচীন তারকাশিক্ষাগুলো জীবন বাঁচাতে পারে। বিশেষ করে পৃথিবী থেকে যদি কোনো কারণে সমস্ত রেডিও যোগাযোগ ও নেভিগেশন লিংক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন মহাকাশচারীরা সম্পূর্ণ একা হয়ে পড়েন এবং এই কৌশলই তাদের একমাত্র পথপ্রদর্শক হয়ে ওঠে।
মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে এই প্রাচীন পদ্ধতির সফল ব্যবহারের বহু উদাহরণ রয়েছে। ১৯৬০-এর দশকে অ্যাপোলো মিশনের সময় নীল আর্মস্ট্রংয়ের মতো কিংবদন্তি ভেবেছিলেন, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলে তারা নিজেরা সেক্সট্যান্ট ব্যবহার করে পথ চলতে পারবেন কি না। পরে নীল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিন সফলভাবে তা প্রমাণ করেন। ১৯৬৬ সালেও জেমিনাই টুয়েলভ ফ্লাইটে রাডারে সমস্যা দেখা দিলে বাজ অলড্রিন হ্যান্ডহেল্ড সেক্সট্যান্ট ও চার্ট ব্যবহার করেছিলেন। এ ছাড়া ১৯৭১ সালে অ্যাপোলো ১৩ মিশনের বিপজ্জনক ও রোমাঞ্চকর শেষ পর্যায়ে জিম লাভেল পৃথিবীর দৃশ্য ও তারকার অবস্থানের সাহায্য নিয়ে নিরাপদে ঘরে ফিরেছিলেন।
আধুনিক সময়েও এই যন্ত্রের গুরুত্ব ফুরিয়ে যায়নি। ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে মহাকাশচারী সেরেনা আউয়ন-চ্যান্সেলর এবং আলেকজান্ডার গার্স্ট একটি হ্যান্ডহেল্ড সেক্সট্যান্ট নিয়ে পরীক্ষা চালান। মাইক্রোগ্র্যাভিটিতে এটি নিখুঁত ফলাফল দেয় এবং নভোচারীরা জানান যে এটি পৃথিবীর চেয়েও মহাকাশে ব্যবহার করা বেশ সহজ ও আরামদায়ক।
বর্তমান ওরিয়ন স্পেসক্রাফটে একটি হাই-টেক অপটিক্যাল নেভিগেশন সিস্টেম বা ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তারার কোণ ও গ্রহের ব্যাস পরিমাপ করে। তবে যান্ত্রিক বা সফটওয়্যার ত্রুটির কারণে সেই ক্যামেরা সিস্টেমও যদি কখনো কাজ করা বন্ধ করে দেয়, তবেই এই হ্যান্ডহেল্ড বা খালি চোখের ব্যাকআপ পদ্ধতির আসল প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।
প্রযুক্তির চরম বিকাশ ঘটলেও প্রাচীন সেক্সট্যান্ট এবং সর্বাধুনিক অপটিক্যাল ক্যামেরা— উভয়ের মূল দর্শন কিন্তু একই সূত্রে গাঁথা। তা হলো নক্ষত্র ও মহাজাগতিক বস্তুর সাপেক্ষে জ্যামিতিক সম্পর্কের সঠিক হিসাব কষা। সে হাতে ধরা প্রাচীন লাঠি বা সেক্সট্যান্ট হোক আর মহাকাশযানের হাই-টেক ক্যামেরা হোক না কেন; সুদূর মহাশূন্যে সঠিক দিক নির্ণয়ের মূল বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ও গণিত যুগ যুগ ধরে একই রয়েছে।



