ইঁদুরের মাথায় মানুষের মস্তিষ্ক

আলেকজান্ডার বেলায়েভের গল্পে হাতির দেহে আটকা পড়েছিল মানুষের মস্তিষ্ক। আর এখন বাস্তবে! গবেষণাগারের ইঁদুরের মাথায় ঠাঁই হয়েছে মানব মস্তিষ্কের কোষ। লিখেছেন স্বর্ণা রায়
মানবজাতির রোগ নিরাময়ে গিনিপিগ হিসেবে ইঁদুরের ব্যবহার নতুন কিছু নয়। তবে মানুষের মস্তিষ্কের রহস্যভেদ করতে এবার গবেষণাগারে তৈরি হয়েছে এক অভিনব ‘জীবন্ত মডেল’। বিজ্ঞানীরা এমন ইঁদুর তৈরি করেছেন, যার মস্তিষ্কের প্রায় অর্ধেক অংশ জুড়ে বেড়ে উঠেছে মানুষের মস্তিষ্কের কোষ। দেখতে সাধারণ ইঁদুরের মতো হলেও ভেতরের এই পরিবর্তন বিজ্ঞানীদের সামনে উন্মোচন করেছে মস্তিষ্কের নানা রোগ নিয়ে গবেষণার নতুন দরজা। সিজোফ্রেনিয়া থেকে সেরিব্রাল পালসি, এমনকি বিরল ধরনের ডিমেনশিয়াসহ মানব মস্তিষ্কে এসব রোগ কীভাবে তৈরি হয়, তা বোঝার পাশাপাশি সম্ভাব্য চিকিৎসা খুঁজতেও কাজে লাগতে পারে এই ইঁদুর।
দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকরা পরীক্ষাগারে তৈরি মানুষের মস্তিষ্কের কোষ নবজাতক ইঁদুরের মস্তিষ্কে প্রতিস্থাপন করেন। এর আগে ইঁদুরগুলোর মস্তিষ্কের দুটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কর্টেক্স ও হিপোক্যাম্পাস স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। ফলে সেখানে মানুষের মস্তিষ্কের কোষ বেড়ে ওঠার জন্য জায়গা তৈরি হয়।
মানুষের
ত্বকের কোষকে বিশেষ পদ্ধতিতে পরিবর্তন করে এসব মস্তিষ্কের
কোষ তৈরি করা হয়।
পরে নবজাতক ইঁদুরের মস্তিষ্কে কয়েক দফায় প্রায়
এক লাখ করে মানব
কোষ দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে
ইঁদুরগুলোর মস্তিষ্কে প্রায় ১ কোটি ৪০
লাখ ইঁদুরের কোষের ঘাটতি ছিল।
বিপরীতে সেখানে প্রায় ৪০ লাখ মানব
কোষ বেড়ে ওঠে। ফলে
মস্তিষ্কের আয়তনের প্রায় অর্ধেক জুড়ে মানব টিস্যু
তৈরি হয়।
মানুষের ত্বকের কোষকে বিশেষ পদ্ধতিতে পরিবর্তন করে মস্তিষ্কের কোষ তৈরি করা হয়। পরে নবজাতক ইঁদুরের মস্তিষ্কে কয়েক দফায় প্রায় এক লাখ কোষ স্থাপন করা হয়
তিন মাস পর দেখা যায়, মানব টিস্যু ইঁদুরের রক্ত সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এবং মস্তিষ্কের ফাঁকা জায়গার প্রায় পুরোটা পূরণ করেছে। মানুষের কিছু স্নায়ুকোষ ইঁদুরের মস্তিষ্কের কোষ ও মেরুদণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগও তৈরি করেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ইঁদুরের মস্তিষ্ক মানুষের মতো হয়ে গেছে। মানব কোষগুলো মানুষের মস্তিষ্কে যেভাবে সাজানো ও সংযুক্ত থাকে, এখানে সেভাবে তৈরি হয়নি। টিস্যুগুলোও ছিল অপরিণত, যা মানুষের গর্ভাবস্থার মাঝামাঝি সময়ের মস্তিষ্কের বিকাশের কাছাকাছি।
গবেষকরা দেখতে পান, মানব কোষ বসানোর ফলে ইঁদুরগুলোর বুদ্ধি বা অন্য কোনো বিশেষ ক্ষমতা বাড়েনি। তবে হাঁটাচলার সমস্যা ও কিছু স্মৃতিগত দুর্বলতা সামান্য উন্নত হয়েছে।
এই ইঁদুরের মাধ্যমে রোগ নিয়ে গবেষণার সম্ভাবনাও পরীক্ষা করেছেন বিজ্ঞানীরা। কিছু ইঁদুরকে পাঁচ ঘণ্টা কম অক্সিজেনের পরিবেশে রাখা হয়। এতে দেখা যায়, মানুষের স্নায়ুকোষ অক্সিজেনের ঘাটতিতে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জন্মের আগে বা জন্মের সময় শিশুর মস্তিষ্কে অক্সিজেনের ঘাটতি হলে সেরিব্রাল পালসি হতে পারে। তাই এই পদ্ধতি এ রোগ বোঝার ক্ষেত্রে কাজে লাগতে পারে।
মানব টিস্যুর মধ্যে ভন ইকোনোমো নিউরন নামের বিরল কিছু স্নায়ুকোষও পাওয়া গেছে। ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত মানুষের মস্তিষ্কে এসব কোষ দ্রুত মারা যেতে পারে। তাই এই ইঁদুর ব্যবহার করে ভবিষ্যতে ওই রোগ নিয়েও গবেষণা করতে চান বিজ্ঞানীরা।
তবে গবেষণাটি নিয়ে নৈতিক প্রশ্নও রয়েছে। মানব মস্তিষ্কের টিস্যু প্রাণীর শরীরে বসানোর ফলে প্রাণীর ওপর কী প্রভাব পড়ে, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে অনেক গবেষক পরীক্ষাগারের পাত্রেই মস্তিষ্কের টিস্যু তৈরি করে প্রাণীর ব্যবহার কমানোর চেষ্টা করছেন।
গবেষকদের আশা, নতুন এই পদ্ধতি মানুষের মস্তিষ্কের কিছু রোগ কীভাবে তৈরি হয় এবং সম্ভাব্য চিকিৎসা কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি গবেষণার সুযোগ তৈরি করবে।



