অবস্কিউরা থেকে এআই ক্যামেরা

আজ ১৯ আগস্ট— বিশ্ব ফটোগ্রাফি দিবস। ছবির প্রধান অনুষঙ্গই হলো ক্যামেরা। সেই ক্যামেরার বিবর্তনের ইতিহাস কোনো রূপকথার চেয়ে কম নয়। এ যেন আলো-ছায়াকে বশ করার রোমাঞ্চকর গল্প। লিখেছেন আখলাকুজ্জামান অনিক
ফটোগ্রাফির আদিগল্প শুরু ‘ক্যামেরা অবস্কিউরা’ দিয়ে। লাতিন এ শব্দের অর্থ ‘অন্ধকার ঘর’। প্রাচীন যুগে মানুষ দেখত, অন্ধকার ঘরের ছিদ্র দিয়ে বাইরের আলো এসে কীভাবে উল্টো প্রতিবিম্ব তৈরি করে। তবে আলোকে স্থায়ী করার উপায় তখন ছিল না। ১৮২৬ সালে ফরাসি উদ্ভাবক জোসেফ নিসেফোর নিপস দেখালেন প্রথম জাদু। বিটুমিন মাখানো প্লেটে তিনি তৈরি করলেন প্রথম স্থায়ী আলোকচিত্র— ‘ভিউ ফ্রম দ্য উইন্ডো অ্যাট লে গ্রাস’। অবাক করা বিষয় হলো, এই ছবি তুলতে লাগত আট ঘণ্টা! ১৮৩৯ সালে লুই ডাগুয়ের আনলেন ‘ডাগুয়েরিওটাইপ’। এই বছরটিকেই ফটোগ্রাফির আনুষ্ঠানিক জন্মসাল ধরা হয়। তখন ছবি তোলা ছিল এক যুদ্ধ। ভারী যন্ত্রপাতি, বিষাক্ত রাসায়নিক আর দীর্ঘ সময় স্থির থাকার কষ্ট ছিল নিত্যসঙ্গী।
১৮৮৮ সালে জর্জ ইস্টম্যান আনলেন ‘কোডাক’ ক্যামেরা। তার স্লোগান ‘ইউ প্রেস দ্য বাটন, উই ডু দ্য রেস্ট’। কোম্পানিটি ফটোগ্রাফিকে সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয় নিয়ে এলো। কাচের প্লেটের জায়গা নিল রোল ফিল্ম। ১৯১৪ সালে অস্কার বারনাক প্রথম ৩৫ মিলিমিটার লাইকা ক্যামেরা তৈরি করলে জন্ম হয় আধুনিক ফটোসাংবাদিকতার।
২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ফটোগ্রাফি লেন্স বা সেন্সরে সীমাবদ্ধ নয়; প্রবেশ করেছে এআইর যুগে
ফিল্মের যুগ ছিল ধৈর্যের। ৩৬ এক্সপোজারের রিল শেষ করতে মাসের পর মাস লাগত। তারপর সেই রিল যেত ডার্করুমে। লাল আলো ঘেরা সেই ঘরে রাসায়নিক তরলে কাগজ ডোবাতেই ফুটে উঠত মানুষের মুখ, ফেলে আসা মুহূর্ত। ছবিটা কেমন হলো, তা দেখার জন্য দিনের পর দিন অপেক্ষার অদ্ভুত থ্রিল ছিল। প্রতিটি ক্লিকের মূল্য ছিল অনেক। ফিল্ম ছিল এমন ক্যানভাস, যেখানে ভুলের ক্ষমা ছিল না।
১৯৭৫ সালে কোডাকের ইঞ্জিনিয়ার স্টিভ স্যাসন তৈরি করলেন পৃথিবীর প্রথম ডিজিটাল ক্যামেরা। টোস্টারের মতো সেই যন্ত্রের ওজন ছিল চার কেজি! রেজল্যুশন ছিল মাত্র ০.০১ মেগাপিক্সেল আর একটি ছবি সেভ হতে লাগত ২৩ সেকেন্ড। কে জানত, এই যন্ত্রই একদিন ডার্করুমের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকবে!
আশির ও নব্বই দশকে ডিজিটাল সেন্সর প্রযুক্তির অবিশ্বাস্য বিকাশ ঘটল। ফিল্ম ও রাসায়নিকের জায়গা নিল পিক্সেল আর মেমোরি কার্ড। ডিজিটাল ক্যামেরার বড় বিপ্লব ছিল তৎক্ষণাৎ ছবি দেখার এবং ভুল হলে মুছে ফেলার স্বাধীনতা। ফটোগ্রাফি হলো নিখুঁত। ডিএসএলআর এবং পরে মিররলেস ক্যামেরার আগমন পেশাদার ফটোগ্রাফিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেল।
বিপ্লবের বড় চমক এলো মোবাইল ফোনের সঙ্গে ক্যামেরা যুক্ত হওয়ার পর। ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ফটোগ্রাফি লেন্স বা সেন্সরে সীমাবদ্ধ নয়; প্রবেশ করেছে এআইর যুগে। আজকের স্মার্টফোন ‘কম্পিউটেশনাল ফটোগ্রাফি’র সাহায্যে অভাবনীয় ছবি তোলে। যেখানে আলো নেই, সেখানে এআই আলোর জন্ম দিচ্ছে। পোর্ট্রেট মোড, রিয়েল টাইম ট্র্যাকিং এখন হাতের মুঠোয়। এখন মিনিটে যে ছবি তোলা হয়, একসময় শত বছরেও তা অসম্ভব ছিল।
অন্ধকার ঘরের আলো থেকে আজকের ন্যানো-সেন্সরের এআই ক্যামেরা— এই যাত্রাপথ মানুষের স্মৃতিকে চিরঞ্জীব করার সাধনা। প্রযুক্তি বদলেছে, বিশাল কাঠের বাক্স হয়েছে পকেটের ডিভাইস। রাসায়নিকের গন্ধ নিয়েছে সিলিকন চিপ; কিন্তু বদলায়নি ছবির পেছনের মানুষের চোখ আর আবেগ। মানুষ গল্প বলতে ভালোবাসে। কেউ ফিল্মে বা মিররলেস ক্যামেরায় তুলুক— ফটোগ্রাফি সেই একই জাদু। প্রযুক্তি শুধু তুলি দিয়েছে; কিন্তু আলো আর ছায়ার ক্যানভাসে আসল ছবিটি এঁকে যান ফটোগ্রাফার।






