আদর্শ আর নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে খণ্ড-বিখণ্ড বাম

সংগৃহীত ছবি
আন্দোলন-সংগ্রাম ও ত্যাগের ইতিহাস রয়েছে বাংলাদেশের বাম রাজনীতির; আদর্শের প্রশ্নেও রয়েছে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক উত্তরাধিকার। তবে এই ইতিহাসের অন্য পিঠে রয়েছে বিভক্তি, ভাঙন ও সাংগঠনিক দুর্বলতার দীর্ঘ ছায়া। এক দল ভেঙে জন্ম নিয়েছে নতুন দল, সেই দলও ভেঙে তৈরি হয়েছে একাধিক উপদল। আবার অনেক দল কয়েক বছর সক্রিয় থাকার পর হারিয়ে গেছে রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে। একসময় তরুণদের বড় একটি অংশকে আকৃষ্ট করা এবং রাজপথের আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা বাম রাজনীতি সময়ের পরিক্রমায় হারিয়েছে সেই প্রভাব ও গণভিত্তি। বর্তমানে অনেক দলই সীমিত সাংগঠনিক পরিসরে নিজেদের কার্যক্রম ধরে রেখেছে। ফলে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে— দীর্ঘদিনের আদর্শিক বিরোধ, নেতৃত্বের সংকট ও রাজনৈতিক কৌশলের দুর্বলতা কাটিয়ে বাম দলগুলো কি মানুষের কাছে গিয়ে বাস্তব গণভিত্তি তৈরি করতে পারবে?
ষাটের দশকে চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের আদর্শিক বিরোধকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বাম রাজনীতিতে বড় বিভাজন তৈরি হয়। স্বাধীনতার পর ‘মস্কোপন্থী’ কমিউনিস্ট দলগুলোর একটি অংশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে বাকশালে যোগ দিলে তাদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অন্যদিকে, ‘চীনপন্থী’ দলগুলো অভ্যন্তরীণ বিরোধ ও ধারাবাহিক ভাঙনে দুর্বল হয়ে পড়ে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে বাম দলগুলো আবারও স্বতন্ত্র অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ পেলেও সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন বড় ধাক্কা দেয়। শীর্ষ নেতাদের অনেকে সরে যান, নেতাকর্মীদের একটি অংশ নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন এবং কেউ কেউ আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে যোগ দেন।
দেশের প্রাচীনতম রাজনৈতিক দলগুলোর একটি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। ১৯৪৮ সালের ৬ মার্চ ‘পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি’ নামে যাত্রা শুরু করে দলটি। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে নাম পরিবর্তন করে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি করা হয়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, টঙ্ক আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে দলটির নেতাকর্মীদের ভূমিকা ছিল। তবে বাকশালে যোগ দেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারের উদ্যোগে অংশগ্রহণ নিয়ে দলটি সমালোচিত হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ বড় একটি অংশ সরে গেলে দলটি সংকটে পড়ে। ২০২২ সালের দ্বাদশ কংগ্রেস ঘিরে ভাঙনের আশঙ্কা তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত বড় ভাঙন এড়ানো যায়। তবে অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং এর প্রভাব ছাত্র ইউনিয়ন, ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রসহ বিভিন্ন গণসংগঠনে রয়ে গেছে।
মোহাম্মদ তোয়াহাকে কেন্দ্র করে ১৯৭৬ সালে প্রকাশ্য রাজনীতিতে আসে বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল। তোয়াহার জীবদ্দশাতেই আসাদ্দর আলী, খন্দকার আলী আব্বাস ও দিলীপ বড়ুয়ার নেতৃত্বে পৃথক ধারা তৈরি হয়। পরে আরও কয়েকটি উপদলের জন্ম হয়। দিলীপ বড়ুয়ার নেতৃত্বাধীন অংশ পরে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে যুক্ত হয় এবং তিনি মন্ত্রীও হন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর তাকে প্রকাশ্যে খুব একটা দেখা যায়নি; দলটিরও দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই।
চীনপন্থী বিভিন্ন বাম সংগঠনের ঐক্যের প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি। অমল সেন, রাশেদ খান মেনন ও হায়দার আকবর খান রনো ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ নেতা। পরে কাজী জাফর আহমদ আলাদা হয়ে ইউনাইটেড পিপলস পার্টি গঠন করেন। ওয়ার্কার্স পার্টিতেও বিভাজন দেখা দেয়। মেনন ও রনোর রাজনৈতিক পথ আলাদা হয়ে যায়; রনো পরে সিপিবিতে যোগ দেন। দলটি থেকে বেরিয়ে আসে বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি। রাশেদ খান মেনন পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট করে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হন। বর্তমানে তিনি একাধিক মামলায় কারাগারে রয়েছেন।
সবচেয়ে বেশি ভাঙনের মুখে পড়া বামঘেঁষা দলগুলোর অন্যতম জাসদ। ১৯৭২ সালের ৩১ অক্টোবর ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের’ স্লোগান নিয়ে দলটির জন্ম। স্বাধীনতার পর ছাত্র-তরুণদের বড় অংশ জাসদের দিকে ঝুঁকে পড়ে এবং দলটি দ্রুত বড় রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক, সশস্ত্র রাজনীতি, নির্বাচনে অংশগ্রহণসহ বিভিন্ন প্রশ্নে মতভেদের পর ১৯৮০ সালে জাসদ থেকে বাসদ গঠিত হয়। পরে জাসদ আরও কয়েক দফা ভাঙে। আ স ম আবদুর রব, শাজাহান সিরাজ ও হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে পৃথক ধারা তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে জাসদের বিভিন্ন অংশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট ও সরকারের সঙ্গে যুক্ত হয়। সভাপতি হাসানুল হক ইনু কারাগারে রয়েছেন; সাধারণ সম্পাদক আত্মগোপনে রয়েছেন।
১৯৮০ সালে জাসদ থেকে বেরিয়ে গঠিত বাসদও অখণ্ড থাকেনি। আ ফ ম মাহবুবুল হকের নেতৃত্বে আলাদা অংশ তৈরি হয়। পরে আরও বিভাজন ঘটে। ২০১৩ সালে বাসদ থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল— মার্কসবাদী গঠিত হয়।
কমিউনিস্ট পার্টি না হলেও ন্যাপ ছিল বাম রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। ১৯৫৭ সালে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে দলটি গঠিত হয়। চীন-রাশিয়ার বিরোধের প্রভাবে ষাটের দশকে ন্যাপ ভাগ হয়ে ন্যাপ (ভাসানী) ও ন্যাপ (মোজাফফর) হয়। স্বাধীনতার পর ন্যাপ (মোজাফফর) একসময় বড় রাজনৈতিক শক্তি ছিল এবং ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে বহু আসনে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। পরে দলটির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রভাব কমে যায়।
বড় দলগুলোর বাইরে বাংলাদেশের মজদুর পার্টি, জনমুক্তি পার্টি, বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি, গণতান্ত্রিক কর্মী শিবির, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট কর্মী সংঘ, আদি সাম্যবাদী দলসহ বহু বাম সংগঠন ছিল। কেউ সীমিত এলাকায় সক্রিয় ছিল, কেউ কয়েকজন নেতাকর্মীকে ঘিরে টিকে ছিল। সময়ের সঙ্গে এসব দলের অধিকাংশই রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে হারিয়ে গেছে।
ভাঙনের কারণ কী?
বাম রাজনীতির দীর্ঘ বিভক্তির পেছনে মতাদর্শগত বিরোধের পাশাপাশি নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক কৌশলের দুর্বলতাকেও দায়ী করেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল— বাসদের উপদেষ্টা খালেকুজ্জামান।
তার মতে, ষাটের দশকে কমিউনিস্ট আন্দোলনের অভ্যন্তরীণ বিরোধ যখন বাড়তে থাকে, তখন আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী ধারা সামনে চলে আসে। বামপন্থীদের বিভক্তি তাদের অগ্রগামী রাজনৈতিক ভূমিকা দুর্বল করে দেয়।
খালেকুজ্জামান বললেন, বাম দলগুলোর বিভক্তি নিজে কোনো সমস্যা নয়। মতাদর্শগত বিতর্কের মধ্য দিয়ে সঠিক রাজনৈতিক অবস্থান তৈরি হলে বিভক্তি আন্দোলনের বিকাশেও ভূমিকা রাখতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে সেই বিতর্ক অনেক ক্ষেত্রে সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। এর সঙ্গে বাম নেতাদের একাংশের বুর্জোয়া রাজনীতির সঙ্গে আপস এবং সময়োপযোগী কর্মসূচির ঘাটতিও আন্দোলনকে দুর্বল করেছে।
সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বললেন, সেখানে ছাত্র-যুবসমাজের বড় অংশের অংশগ্রহণ থাকলেও অভ্যুত্থানের পর তাদের একটি অংশ ক্ষমতা ও পদ-পদবির রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছে। শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাদের প্রত্যাশিত সংযোগ তৈরি হয়নি। বামপন্থীদের দুর্বলতাও এক্ষেত্রে একটি কারণ।
বাম রাজনীতির বর্তমান সংকটের পেছনে ভুল রাজনৈতিক কৌশলকেও দায়ী করেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির প্রবীণ নেতা ও কেন্দ্রীয় কমিটির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নুরুল আহমেদ বকুল।
তার মতে, বামপন্থা মূলত সাধারণ মানুষের অধিকার ও মুক্তির রাজনীতি। বাংলাদেশের ইতিহাসেও বিভিন্ন গণআন্দোলনে বামপন্থীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। কিন্তু ষাট ও সত্তরের দশকের মতাদর্শগত বিভক্তি, নকশাল আন্দোলনের প্রভাব এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে ভিন্ন অবস্থান বাম রাজনীতিকে দুর্বল করেছে।
তিনি বললেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় বাম দলগুলোর একটি অংশ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকলেও কেউ পাকিস্তানের অবস্থান নেয়, আবার কেউ দুপক্ষকেই প্রত্যাখ্যান করে। নেতাকর্মীদের ত্যাগ বা আদর্শিক নিষ্ঠা নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণে ভুল ছিল। স্বাধীনতার পরও একই ধরনের ভুল দেখা যায়। তবে এরশাদবিরোধী আন্দোলনকে বাম রাজনীতির বড় সাফল্য হিসেবে দেখেন নুরুল আহমেদ বকুল। তার মতে, দীর্ঘ ওই আন্দোলনে শ্রমিক-কর্মচারী, ছাত্র, আইনজীবী, নারীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের একাধিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে উঠেছিল। এসব উদ্যোগে বামপন্থীদের নেতৃত্ব ছিল এবং ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু আন্দোলনের সেই রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে পরবর্তী সময়ে সংগঠিত শক্তিতে রূপ দিতে পারেনি বাম দলগুলো।
বকুলের মতে, বাম রাজনীতির সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় ও জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন করা। বড় দলের সঙ্গে জোট করে ক্ষমতার অংশীদার হওয়ার পর যদি তাদের রাজনৈতিক আচরণেও সেই দলের প্রতিফলন দেখা যায়, তাহলে সাধারণ মানুষের কাছে বামপন্থীদের আলাদা কোনো অবস্থান থাকে না। তাই অতীতের ভুল ও বিভাজনের রাজনীতি থেকে শিক্ষা নিয়ে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।



