এআই ইফেক্টস

মানবজাতির অস্তিত্বকে সংকটে ফেলবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা— এমন আশঙ্কায় অ্যানথ্রোপিক, ওপেনএআইর মতো কোম্পানিগুলোও চাইছে এই প্রযুক্তির উন্নতির গতি কমিয়ে আনতে। কিন্তু বাদ সেধেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কোনোভাবেই এআইর অগ্রযাত্রাকে থামাতে চান না তিনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার লাগামহীন অগ্রযাত্রা এবং আধুনিক প্রযুক্তির অভূতপূর্ব বিস্ফোরণ মানবজাতিকে এমন এক ঐতিহাসিক ও সংকটময় সন্ধিক্ষণে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুটি সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর চরম সম্ভাবনার ছবি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এর একটি দিক যেমন গভীর শঙ্কা ও সম্ভাব্য সর্বনাশ মানবসভ্যতার ভিত্তিমূলকে কাঁপিয়ে তুলছে, তেমনি অন্যদিকটি মানবজীবনের তাবৎ দুঃখ-কষ্ট ও বঞ্চনা ঘুচিয়ে এক নতুন সোনালি যুগের স্বপ্ন দেখাচ্ছে। লিখেছেন জেমাম আহমেদ
মানবসভ্যতা বিলুপ্তির শঙ্কা
আগামী ১০ বছরের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অতিবুদ্ধিমত্তা বা সুপারইন্টেলিজেন্স মানবসভ্যতার জন্য পূর্ণাঙ্গ ও অনিবার্য ধ্বংস ডেকে আনতে পারে— এই আশঙ্কা এখন আর কোনো কাল্পনিক বিজ্ঞানভিত্তিক চলচ্চিত্রের মনগড়া চিত্রনাট্য নয়; বরং আধুনিক বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গবেষক, দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের মুখে উচ্চারিত এক অত্যন্ত বাস্তবসম্মত ও কড়া সতর্কবাণী। বর্তমান অগ্রগতির চেয়ে বহু গুণ দ্রুতগতিতে এআই যখন মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে সব দিক থেকে ছাড়িয়ে যাবে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজেদের বুদ্ধিমত্তা ও কোড রিপ্রোগ্রাম করতে শুরু করবে, তখন মানবজাতি তাদের ওপর থেকে নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলবে, বিশেষ করে সামরিক ক্ষেত্রে মারণাস্ত্র তৈরি, স্বয়ংক্রিয় ড্রোন নেটওয়ার্ক এবং সাইবার যুদ্ধের কৌশলগত কমান্ড যদি সম্পূর্ণভাবে অ্যালগরিদমের হাতে চলে যায়, তবে যেকোনো মুহূর্তে একটি ক্ষুদ্র কোডিং ত্রুটি, ভুল সিদ্ধান্ত বা অপপ্রয়োগ পুরো পৃথিবীতে এমন এক পারমাণবিক ও জৈবিক মহাপ্রলয় ঘটিয়ে দিতে পারে, যা থেকে উত্তরণের কোনো পথ থাকবে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন বিশ্ব অর্থনীতি, স্টক মার্কেট, জ্বালানি গ্রিড এবং বৈশ্বিক যোগাযোগব্যবস্থার মতো মানবজীবনের অত্যন্ত কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণগুলো নিজের হাতে দখল করে নেবে, তখন মানুষের স্বাধীন অস্তিত্ব হয়ে পড়বে পুরোপুরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অদৃশ্য মর্জির ওপর নির্ভরশীল। এই প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ করার জন্য ও এর নৈতিক সীমানা নির্ধারণ করার জন্য মানবজাতির হাতে আজ যেটুকু সময় অবশিষ্ট রয়েছে, তা অত্যন্ত সীমিত এবং এই স্বল্পসময়ের মধ্যে যদি কার্যকর ও কঠোর বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা না যায়, তবে মানবসভ্যতার এই সুনিশ্চিত পতন রোধ করা পৃথিবীর কোনো শক্তির পক্ষেই আর সম্ভব হবে না।
নাটকীয় বিকাশ হবে সভ্যতার
মুদ্রার অপর পিঠের মতো এই একই প্রযুক্তিগত বিপ্লব মানবজাতির দীর্ঘদিনের লালিত ও প্রাচীনতম দুই শত্রু অসুখ ও দারিদ্র্যকে চিরকালের মতো ইতিহাসের পাতায় তথা জাদুঘরে পাঠিয়ে দেওয়ার এক পরম ও মোক্ষম চাবিকাঠি হতে পারে।
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় এআইর যুগান্তকারী ও অভূতপূর্ব প্রয়োগের ফলে জটিল প্রোটিন ফোল্ডিংয়ের রহস্যভেদ, ক্যানসার বা জটিল জিনগত রোগের অতিনিখুঁত ও দ্রুত চিকিৎসা আবিষ্কার এবং নতুন জীবনরক্ষাকারী ওষুধ তৈরির সময়কাল বছরের পর বছর থেকে নেমে আসছে মাত্র কয়েক দিনে। ন্যানোটেকনোলজি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিখুঁত সমন্বয়ে গঠিত উন্নত ডায়াগনস্টিক সিস্টেমগুলো মানুষের শরীরে কোনো মারাত্মক রোগ বাসা বাঁধার বহু আগেই তার নির্ভুল পূর্বাভাস দিতে সক্ষম হবে, যার ফলে ভবিষ্যতে যেকোনো মহামারী বা জটিল ব্যাধির প্রাদুর্ভাব সমাজ থেকে চিরতরে মুছে যাবে।
একই সঙ্গে বৈশ্বিক উৎপাদন খাত, আধুনিক কৃষি ব্যবস্থাপনা এবং লজিস্টিকসে উন্নত রোবোটিকস ও এআইর পূর্ণাঙ্গ ব্যবহারের ফলে যেকোনো পণ্যের উৎপাদন ব্যয় নাটকীয়ভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসবে এবং সমাজে সম্পদের এক অভূতপূর্ব প্রাচুর্য নিশ্চিত হবে। মানুষের একঘেয়ে শারীরিক শ্রমের প্রয়োজনীয়তা চিরতরে কমে গিয়ে যখন বুদ্ধিবৃত্তিক ও সৃজনশীল কাজের সুযোগ বহু গুণ বেড়ে যাবে, তখন সর্বজনীন মৌলিক আয় এবং সম্পদ বণ্টনের সুষম ব্যবস্থার সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে বৈশ্বিক দারিদ্র্য মানবসমাজের এক নিছক হারানো ও রূপকথার অধ্যায়ে পরিণত হবে।




