কেন এখনো তুমুল জনপ্রিয় ক্যাসিওর সেই ঘড়ি

নব্বই দশকের কিশোর থেকে তরুণরা জানে এই ঘড়ির আবেগ। সাঁতার থেকে গোসল, নামাজ, বৃষ্টিতে ভেজা, সবসময়ই হাতে থাকে এই ঘড়ি। এই ঘড়ি বলতে ক্যাসিও F91W। শুধু কিশোর কিংবা তরুণ নন, সব বয়সীদের পছন্দের ছিল ক্যাসিও।
দামি ঘড়ির প্রতি মানুষের আকর্ষণ অস্বীকার করার উপায় নেই। চোখধাঁধানো কারুকাজ, অভিজাত উপকরণ আর জটিল সব যান্ত্রিক বৈশিষ্ট্য, সব মিলিয়ে বিলাসবহুল ঘড়িগুলো যেমন দৃষ্টিনন্দন, তেমনি ঘড়ি নির্মাণ প্রযুক্তিরও অনন্য নিদর্শন। শত শত বছর ধরে এসব ঘড়ি আমাদের মুগ্ধ ও আনন্দ দিয়ে আসছে।
তবে মাঝে মাঝে এমন কিছু সস্তা ঘড়ির দেখা মেলে, এ ক্ষেত্রে সত্যিই অত্যন্ত সস্তা, যার গল্প এতটাই অসাধারণ যে, দামি ঘড়ির মতোই সেটিও ‘ওয়াচ আইকন’ বা ঘড়ির জগতের আইকনিক মডেল হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার যোগ্য।
এর একটি দারুণ উদাহরণ Casio F91W-1। বছরের পর বছর ধরে অ্যামাজনের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ঘড়ির তালিকার শীর্ষে থাকা এই মডেলটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়। জাপানের অন্যতম বড় ঘড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান Casio ১৯৮৯ সালে F91W-1 বাজারে আনে। অর্থাৎ ২০২৬ সালে ঘড়িটি বাজারে আসার ৩৭ বছর পূর্ণ করে। এরইমধ্যে ঘড়িটি বিক্রি হয়েছে ১২০ মিলিয়ন অর্থাৎ ১২ কোটির মতো, এমনটাই জানাচ্ছে ঘড়ি বিপনন বিষয়ক সংস্থা ওয়াচেস অব এসপিয়োনেজ।
ডিজিটাল ঘড়ির জগতে কিছু মডেল সময়ের সঙ্গে পুরোনো হয়ে যায়, আবার কিছু মডেল সময়ের সঙ্গেই আরও পরিচিত হয়ে ওঠে। Casio F-91W-1 তেমনই একটি ঘড়ি। সাদামাটা নকশা, কম দাম, প্রয়োজনীয় ফিচার আর দীর্ঘস্থায়িত্ব; সব মিলিয়ে কয়েক দশক ধরে এটি বিশ্বজুড়ে ব্যবহারকারীদের কাছে আলাদা জায়গা ধরে রেখেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, কী এমন আছে এই ঘড়িতে, যা তিন দশক পরও এটিকে মানুষের কাছে এতটা জনপ্রিয় করে রেখেছে? এর পেছনে রয়েছে অন্তত সাতটি কারণ।
নস্টালজিয়া
Casio F-91W-1-এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণগুলোর একটি হলো এর রেট্রো আবেদন। প্রায় ৩০ বছর ধরে ঘড়িটির মূল নকশায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসেনি। ফলে আশির দশক ও নব্বইয়ের দশকের প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত প্রজন্মের কাছে এটি অতীতের এক টুকরো স্মৃতি।
পুরোনো দিনের সেই ডিজিটাল ডিসপ্লে, কালো প্লাস্টিকের বডি ও সরল নকশা এখনো ঘড়িটিকে আলাদা করে চেনায়। আধুনিক স্মার্টওয়াচের ভিড়েও F-91W যেন হাতে পরা একখণ্ড নস্টালজিয়া।
প্রয়োজনীয় ফিচার
দাম কম হলেও ফিচারের দিক থেকে ঘড়িটি একেবারে খালি হাতে নয়। এতে রয়েছে স্টপওয়াচ, অ্যালার্ম, ক্যালেন্ডার এবং ব্যাকলাইট। দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব মৌলিক সুবিধাই এতে পাওয়া যায়।
ঘড়িটিতে নির্দিষ্ট মাত্রার পানি প্রতিরোধক্ষমতাও রয়েছে, যা সাধারণত হাত ধোয়া বা পানির ছিটা থেকে ঘড়িটিকে সুরক্ষিত রাখতে সহায়ক। চাঁদের দশা দেখার মতো বিলাসী কোনো ফিচার নেই, তবে প্রয়োজনীয় কাজের জন্য যা দরকার, তার বেশির ভাগই আছে।
অবাক করা স্থায়িত্ব
ওজনে মাত্র ২১ গ্রাম হওয়ায় F-91W-1 অত্যন্ত হালকা। কিন্তু হালকা বলেই যে এটি দুর্বল, তা নয়। দৈনন্দিন ব্যবহারের ধকল সামলানোর ক্ষেত্রে ঘড়িটির সুনাম দীর্ঘদিনের।
অবিশ্বাস্য কম দাম
F-91W-1-এর আরেকটি বড় শক্তি এর দাম। বিভিন্ন বাজারে দাম ওঠানামা করলেও এটি সাধারণত অত্যন্ত সাশ্রয়ী একটি ঘড়ি হিসেবে পরিচিত। প্রস্তুতকারকের তথ্য অনুযায়ী, এর ব্যাটারি সাধারণ ব্যবহারে প্রায় সাত বছর পর্যন্ত চলতে পারে। ফলে ব্যাটারি শেষ হয়ে গেলে সেটি বদলানোর পাশাপাশি কেউ কেউ পুরো ঘড়িটিই নতুন করে কিনে নেন, এতটাই কম এর দাম। অর্থাৎ, এমন একটি ঘড়ি পাওয়া যায় যার দাম অনেক সময় একবেলার সাধারণ খাবারের খরচের কাছাকাছি।
লুকানো ‘ইস্টার এগ’
ঘড়িটির মধ্যে রয়েছে ছোট্ট একটি মজার বিষয়, যাকে প্রযুক্তির ভাষায় বলা যায় ইস্টার এগ। ঘড়ির নিচের ডানদিকের বোতাম কয়েক সেকেন্ড চেপে ধরলে ডিসপ্লেতে ‘CASIO’ লেখা দেখা যায়। ব্যবহারকারীদের কাছে এটি যেমন মজার একটি ফিচার, তেমনি ঘড়িটি আসল কি না যাচাই করার একটি প্রচলিত উপায় হিসেবেও এটি পরিচিত। এমনকি এত জনপ্রিয় ও সস্তা ঘড়িটিরও নকল বাজারে পাওয়া যায়, যা এর জনপ্রিয়তার আরেকটি প্রমাণ।
অস্বাভাবিক এক ‘দ্বিতীয় জীবন’
F-91W-1-এর ইতিহাসের সবচেয়ে অস্বস্তিকর অধ্যায়টি এর কিছু নেতিবাচক পরিচিতিকে ঘিরে। কম দাম, সহজলভ্যতা ও টাইমার সুবিধার কারণে ঘড়িটি একসময় সন্ত্রাসী সংগঠন আল-কায়েদার সদস্যদের সঙ্গে যুক্ত বলে বিভিন্ন নিরাপত্তা নথি ও প্রতিবেদনে আলোচিত হয়। এ কারণেই পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে ঘড়িটি ‘terrorist watch’ নামে একটি বিতর্কিত পরিচিতি পায়। তবে এই পরিচিতি ঘড়িটির প্রকৃত ব্যবহারকারী; বিশ্বজুড়ে অসংখ্য সাধারণ মানুষ সম্পর্কে কোনো ধারণা দেয় না। সাধারণ ব্যবহারকারীদের কাছে এটি মূলত কম দামি, নির্ভরযোগ্য একটি ডিজিটাল ঘড়ি।
প্রতিটি সংগ্রহেই দরকার একটি ‘বিটার’ ঘড়ি
ঘড়ির জগতে ‘বিটার’ বলতে সাধারণত এমন ঘড়িকে বোঝানো হয়, যেটি দামি বা বিশেষ কোনো মডেল নয়; বরং প্রতিদিন নিশ্চিন্তে ব্যবহার করা যায়। এই জায়গায় F-91W-1 প্রায় আদর্শ। দাম কম হওয়ায় এটি পরে কোথাও ধাক্কা লাগল কি না, একটু আঁচড় পড়ল কি না, এসব নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করতে হয় না।
বিয়ের অনুষ্ঠান বা আনুষ্ঠানিক কোনো আয়োজনে হয়তো এটি সবার পছন্দের ঘড়ি হবে না। কিন্তু দৈনন্দিন জীবন, কাজকর্ম কিংবা এমন পরিস্থিতিতে যেখানে দামি ঘড়ি পরার প্রয়োজন নেই, সেখানে F-91W-1 অসাধারণ কার্যকর।
ছোট ঘড়ি, বড় পরিচিতি
এতে নেই বড় টাচস্ক্রিন, ইন্টারনেট সংযোগ কিংবা অসংখ্য স্মার্ট ফিচার। আছে সময় দেখার মূল কাজ, সঙ্গে কয়েকটি প্রয়োজনীয় সুবিধা। দীর্ঘদিনের নকশা, কম দাম, হালকা ওজন, নির্ভরযোগ্যতা এবং রেট্রো আবেদন—সব মিলিয়ে F-91W-1 কেবল একটি ডিজিটাল ঘড়ি নয়; এটি হয়ে উঠেছে ঘড়ির ইতিহাসে একটি পরিচিত সাংস্কৃতিক আইকন। আধুনিক স্মার্টওয়াচ যখন প্রতিদিন নতুন নতুন ফিচার যোগ করছে, তখন Casio F-91W-1 যেন উল্টো পথে হাঁটছে। তার বার্তা খুব সহজ, সময় দেখার জন্য সবসময় জটিল প্রযুক্তির প্রয়োজন হয় না।









