জোম্বি থেকে সাবধান!

মধ্যরাত। শহরের একটি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে হঠাৎ ছুটে এলেন এক ব্যক্তি। তার শরীরে জ্বর, চোখেমুখে অস্বাভাবিক আতঙ্ক। চিকিৎসকের প্রশ্নের কোনো উত্তর দিচ্ছেন না। কিছুক্ষণ পর শুরু হলো অদ্ভুত আচরণ। কখনো চিৎকার করছেন, কখনো আশপাশের মানুষকে আক্রমণের চেষ্টা করছেন। তাকে পানি পান করাতে গেলে শুরু হলো তীব্র অস্থিরতা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গিয়ে আক্রান্ত হলেন হাসপাতালের কয়েকজন কর্মীও। এরপর একে একে একই ধরনের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসতে শুরু করলেন আরও কয়েকজন। শহরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল আতঙ্ক। কেউ জানে না, কীভাবে থামানো যাবে এই সংক্রমণ।
এমন দৃশ্য কল্পবিজ্ঞানের চলচ্চিত্রে খুব পরিচিত। কিন্তু বাস্তবে যদি কোনো জীবাণু মানুষের মস্তিষ্কে আক্রমণ করে তার আচরণ বদলে দেয়? যদি আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের স্বাভাবিক চিন্তাশক্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন? আর সেই অবস্থায় যদি সংক্রমণ ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতাও তাঁর থাকে? তাহলে কি সত্যিই পৃথিবীতে জোম্বি মহামারি তৈরি হতে পারে?
চলচ্চিত্রে জোম্বি বলতে সাধারণত এমন মৃত মানুষকে বোঝানো হয়, যারা আবার জীবিত হয়ে ওঠে এবং মানুষের মাংস খাওয়ার জন্য অন্যদের আক্রমণ করে। বাস্তব বিজ্ঞানে এমন কোনো ভাইরাসের অস্তিত্ব নেই। মৃত মানুষকে পুনরায় জীবিত করা কিংবা মস্তিষ্কের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাকে সিনেমার জোম্বিতে পরিণত করার মতো কোনো জীবাণু এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। তবে প্রকৃতিতে এমন কিছু ভাইরাস, ছত্রাক ও পরজীবী রয়েছে, যেগুলো আক্রান্ত প্রাণীর স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলে এবং তার আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটাতে পারে। সেখান থেকেই বিজ্ঞান ও কল্পকাহিনির মধ্যে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত যোগসূত্র।
বাস্তব পৃথিবীতে জোম্বি-সদৃশ আচরণের সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ জলাতঙ্কের ভাইরাস। রেবিস নামের এই ভাইরাস মূলত স্তন্যপায়ী প্রাণীর স্নায়ুতন্ত্রে আক্রমণ করে। কুকুর, বিড়াল, বাদুড়সহ বিভিন্ন প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে এটি। সাধারণত আক্রান্ত প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের মাধ্যমে ভাইরাসটি ছড়ায়। ক্ষতস্থান থেকে স্নায়ুর মাধ্যমে ধীরে ধীরে মস্তিষ্কে পৌঁছায়। এরপর মস্তিষ্ক ও মেরুরজ্জুতে মারাত্মক প্রদাহ সৃষ্টি করে।
জলাতঙ্কের লক্ষণ প্রকাশ পেতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। প্রাথমিক অবস্থায় জ্বর, মাথাব্যথা, দুর্বলতা কিংবা কামড়ের স্থানে অস্বাভাবিক জ্বালাপোড়া দেখা দেয়। কিন্তু ভাইরাসটি মস্তিষ্কে পৌঁছালে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে অস্থিরতা, অতিরিক্ত উত্তেজনা, বিভ্রান্তি, হ্যালুসিনেশন, আচরণগত পরিবর্তন এবং কখনো আক্রমণাত্মক প্রবণতা দেখা দিতে পারে। রোগটির একটি ধরনকে বলা হয় ফিউরিয়াস রেবিস। এতে আক্রান্ত ব্যক্তি অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে পড়তে পারেন। পানি গিলতে গেলেও পেশির তীব্র সংকোচন হয়। এমনকি বাতাসের হালকা প্রবাহেও অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। এ কারণেই জলাতঙ্কের সঙ্গে জোম্বি-সদৃশ আচরণের তুলনা করা হয়।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। জলাতঙ্কে আক্রান্ত মানুষ সিনেমার জোম্বির মতো মৃত হয়ে যান না কিংবা অন্য মানুষকে কামড়ানোর জন্য সচেতনভাবে ঘুরে বেড়ান না। তাদের আচরণগত পরিবর্তন ঘটে মস্তিষ্কের প্রদাহ ও স্নায়বিক ক্ষতির কারণে। রোগের উপসর্গ প্রকাশের পর জলাতঙ্ক প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রাণঘাতী। তবে উপসর্গ শুরু হওয়ার আগেই যথাযথ চিকিৎসা নেওয়া গেলে রোগটি প্রতিরোধ করা সম্ভব। আক্রান্ত প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ের পর ক্ষতস্থান অন্তত ১৫ মিনিট সাবান ও প্রবাহমান পানি দিয়ে ধুয়ে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী জলাতঙ্কের টিকা ও ইমিউনোগ্লোবুলিন দিতে হয়।
জলাতঙ্কের বাইরে জোম্বি ধারণার সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সম্পর্ক রয়েছে এক বিশেষ ধরনের ছত্রাকের। এর নাম অফিওকর্ডিসেপস। এই ছত্রাকের কয়েকটি প্রজাতি পিঁপড়াকে সংক্রমিত করে তাদের আচরণ পরিবর্তন করতে পারে। বিষয়টি এতটাই বিস্ময়কর যে আক্রান্ত পিঁপড়াকে বলা হয় জোম্বি অ্যান্ট বা জোম্বি পিঁপড়া।
স্বাভাবিক অবস্থায় পিঁপড়ারা দলবদ্ধভাবে বাস করে এবং নির্দিষ্ট নিয়মে খাবার সংগ্রহ করে। কিন্তু অফিওকর্ডিসেপস ছত্রাকে আক্রান্ত হলে কিছু পিঁপড়ার স্বাভাবিক আচরণ বদলে যায়। তারা দল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, বাসার বাইরে চলে আসে এবং গাছের ডাল কিংবা পাতায় উঠে যায়। একপর্যায়ে পাতার শিরা বা ডালে চোয়াল শক্ত করে আটকে ধরে। জীববিজ্ঞানে এই আচরণকে বলা হয় ডেথ গ্রিপ। কিছু সময় পর পিঁপড়াটি মারা যায়। এরপর মৃত দেহ থেকে ছত্রাকের প্রজনন কাঠামো বেরিয়ে আসে এবং পরিবেশে স্পোর ছড়িয়ে দেয়। কাছাকাছি থাকা অন্য পিঁপড়ার শরীরে সেই স্পোর প্রবেশ করলে নতুন সংক্রমণ শুরু হয়।
এখানে সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ছত্রাকটি শুধু পিঁপড়ার শরীরে বাসা বাঁধে না; বরং তার আচরণ পরিবর্তনের সঙ্গেও জড়িত। গবেষণায় দেখা গেছে, ছত্রাকের বিভিন্ন জৈব রাসায়নিক উপাদান এবং পিঁপড়ার স্নায়ুতন্ত্রের সঙ্গে এর মিথস্ক্রিয়া এই প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে। তবে আচরণ নিয়ন্ত্রণের প্রতিটি আণবিক প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি।
এই বিষয়টিই জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ভিডিও গেম ও টেলিভিশন সিরিজ ‘দ্য লাস্ট অব আস’-এ দেখানো হয়েছে, কর্ডিসেপস নামের ছত্রাক মানুষের শরীরে প্রবেশ করে মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। আক্রান্ত মানুষ পরিণত হয় ভয়ংকর সংক্রমণবাহকে। কাহিনিটির পেছনে প্রকৃতির একটি বাস্তব ঘটনা থাকলেও মানুষের ক্ষেত্রে এমন সংক্রমণের কোনো প্রমাণ নেই।
কারণ, পিঁপড়ার শরীরে সফলভাবে সংক্রমণ ঘটাতে পারা মানেই মানুষের শরীরেও একই কাজ করতে পারা নয়। ছত্রাকের অনেক প্রজাতি নির্দিষ্ট পোষক প্রাণীর শরীরের উপযোগী হয়ে বিবর্তিত হয়েছে। পিঁপড়ার শারীরিক গঠন, রোগপ্রতিরোধব্যবস্থা ও স্নায়ুতন্ত্র মানুষের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। মানুষের শরীরের তাপমাত্রা প্রায় ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই তাপমাত্রায় অনেক পরিবেশগত ছত্রাক সহজে বেঁচে থাকতে পারে না। মানুষের রোগপ্রতিরোধব্যবস্থাও বহিরাগত ছত্রাকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ফলে পিঁপড়ার আচরণ নিয়ন্ত্রণকারী ছত্রাক হঠাৎ মানুষের মস্তিষ্ক দখল করে নেবে, এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
তবে পরজীবীর মাধ্যমে আচরণ পরিবর্তনের আরেকটি বাস্তব উদাহরণ রয়েছে। সেটি টক্সোপ্লাজমা গন্ডি নামের এককোষী পরজীবী। সাধারণত বিড়াল এই পরজীবীর জীবনচক্রের চূড়ান্ত পোষক। ইঁদুরের শরীরে সংক্রমণ ঘটলে কিছু ক্ষেত্রে তাদের স্বাভাবিক ভয় ও আচরণে পরিবর্তন দেখা যায়। বিশেষ করে বিড়ালের গন্ধের প্রতি তাদের স্বাভাবিক সতর্কতা কমে যেতে পারে। এতে পরজীবীটির জীবনচক্র সম্পন্ন হওয়ার সুযোগ বাড়ে।
মানুষের শরীরেও এই পরজীবী সংক্রমণ ঘটাতে পারে। দূষিত খাবার, অপর্যাপ্তভাবে রান্না করা মাংস কিংবা সংক্রমিত বিড়ালের মলের মাধ্যমে ছড়ানো পরজীবীর সংস্পর্শে এলে টক্সোপ্লাজমোসিস হতে পারে। মানুষের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে আচরণগত পরিবর্তন, ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা এবং কিছু মানসিক সমস্যার সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা হয়েছে। তবে এসব সম্পর্কের কারণ-ফলাফল এখনো নিশ্চিত নয়। অর্থাৎ, টক্সোপ্লাজমা মানুষের মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাকে অন্য মানুষকে আক্রমণ করতে বাধ্য করে—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
এবার আসা যাক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে। কী কী শর্ত পূরণ হলে কোনো জীবাণু মানুষকে জোম্বি-সদৃশ অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে?
প্রথমত, জীবাণুটিকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করার এবং সেখানে টিকে থাকার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। শুধু শরীরে প্রবেশ করলেই হবে না, মানুষের রোগপ্রতিরোধব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে সংক্রমণ চালিয়ে যেতে হবে। প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটাতে পারা এবং মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয় নয়।
দ্বিতীয়ত, জীবাণুটিকে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে পৌঁছাতে হবে। মানুষের মস্তিষ্ক অত্যন্ত জটিল একটি অঙ্গ। চিন্তা, স্মৃতি, আবেগ, ভয়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও শারীরিক নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণের জন্য এর বিভিন্ন অংশ একসঙ্গে কাজ করে। কোনো জীবাণু মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি করলে মানুষের আচরণে পরিবর্তন ঘটতে পারে। কিন্তু নির্দিষ্টভাবে কাউকে আক্রমণ করতে বাধ্য করা কিংবা তার ব্যক্তিত্ব সম্পূর্ণ বদলে দেওয়ার মতো নিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা অর্জন করা অনেক বেশি জটিল বিষয়।
তৃতীয়ত, সংক্রমণটির এমন কোনো পথ থাকতে হবে, যার মাধ্যমে জীবাণুটি দ্রুত অন্য মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। জলাতঙ্কের ভাইরাস এই জায়গায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। আক্রান্ত প্রাণীর লালায় ভাইরাস থাকে এবং কামড়ের মাধ্যমে অন্য প্রাণীর শরীরে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে কামড়ের মাধ্যমে মানুষ থেকে মানুষে জলাতঙ্ক ছড়ানোর কোনো নিশ্চিত ঘটনা নেই। ফলে জলাতঙ্কের আচরণগত বৈশিষ্ট্য থাকলেও এটি জোম্বি মহামারির মতো পরিস্থিতি তৈরি করে না।
চতুর্থত, জীবাণুটিকে সংক্রমণ ঘটানোর পাশাপাশি নিজের বিস্তার বজায় রাখতে হবে। কোনো রোগী খুব দ্রুত মারা গেলে কিংবা অসুস্থতার কারণে চলাফেরা করতে অক্ষম হয়ে পড়লে সংক্রমণের বিস্তার সীমিত হতে পারে। অন্যদিকে, সংক্রমিত ব্যক্তি যদি দীর্ঘ সময় চলাফেরা করতে পারেন এবং সেই সময়েই অন্যদের মধ্যে জীবাণু ছড়াতে পারেন, তাহলে জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ে। তবে আচরণগত পরিবর্তন এবং সংক্রমণ ছড়ানোর সক্ষমতা একই জীবাণুর মধ্যে একসঙ্গে থাকা বাধ্যতামূলক নয়।
এই প্রসঙ্গে ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। দেশটির রোগনিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ সংস্থা একটি কিডনি প্রতিস্থাপন-সংক্রান্ত জলাতঙ্ক সংক্রমণের ঘটনা তদন্ত করে। একজন দাতার শরীরে শনাক্ত না হওয়া জলাতঙ্কের সংক্রমণ ছিল। তাঁর কাছ থেকে কিডনি প্রতিস্থাপন নেওয়া ব্যক্তির শরীরেও পরে জলাতঙ্ক শনাক্ত হয়। ঘটনাটি প্রমাণ করে, বিশেষ পরিস্থিতিতে মানবদেহ থেকে অন্য মানুষের শরীরে জলাতঙ্কের ভাইরাস পৌঁছাতে পারে। তবে এটি অঙ্গ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে ঘটেছিল, সাধারণ সামাজিক যোগাযোগ কিংবা কামড়ের মাধ্যমে নয়। তাই ঘটনাটিকে সাধারণ মানুষে-মানুষে জলাতঙ্ক ছড়ানোর প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
এখন প্রশ্ন, ভবিষ্যতে কি কোনো ভাইরাস বিবর্তিত হয়ে মানুষের মস্তিষ্ককে প্রভাবিত করার ক্ষমতা অর্জন করতে পারে? জীবাণুর বিবর্তন একটি চলমান প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। সময়ের সঙ্গে ভাইরাস ও অন্যান্য জীবাণুর জিনগত পরিবর্তন ঘটে। কিছু পরিবর্তন তাদের নতুন পোষক প্রাণীতে সংক্রমিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। আবার কোনো কোনো পরিবর্তন সংক্রমণের ক্ষমতা বাড়াতে বা কমাতে পারে। তবে বিবর্তন মানেই কোনো জীবাণু ক্রমাগত আরও শক্তিশালী বা ভয়ংকর হয়ে উঠবে, এমন নয়।
প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে জীবাণুর সংক্রমণকে বলা হয় জুনোটিক স্পিলওভার। বন্য প্রাণীর আবাসস্থলে মানুষের অনুপ্রবেশ, বন উজাড়, বন্য প্রাণীর বাণিজ্য, নিবিড় পশুপালন, পরিবেশের পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক ভ্রমণ নতুন সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ বাড়াতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, মানুষের মধ্যে শনাক্ত হওয়া উদীয়মান সংক্রামক রোগের বড় একটি অংশ প্রাণী থেকে এসেছে। তবে প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করা প্রতিটি জীবাণু যে পরবর্তী সময়ে মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারবে, তা নয়।
এখানে আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। মস্তিষ্কে সংক্রমণ ঘটানো মানেই জোম্বি তৈরি করা নয়। নিপাহ ভাইরাসের মতো কিছু জীবাণু মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে। এতে আক্রান্ত ব্যক্তির মাথাব্যথা, বিভ্রান্তি, চেতনার পরিবর্তন, খিঁচুনি কিংবা কোমা হতে পারে। কিন্তু এসব উপসর্গকে জোম্বি আচরণ বলা যায় না। এগুলো গুরুতর স্নায়বিক রোগের লক্ষণ।
সবচেয়ে বড় বাধা হলো মানুষের মস্তিষ্কের জটিলতা। একটি পিঁপড়ার নির্দিষ্ট আচরণ পরিবর্তন করা আর মানুষের চিন্তা, আবেগ, স্মৃতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয় নয়। মানুষের মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট আচরণ তৈরি করতে অসংখ্য স্নায়ুকোষ ও রাসায়নিক সংকেত একসঙ্গে কাজ করে। কোনো জীবাণু কীভাবে এই পুরো ব্যবস্থাকে নির্দিষ্টভাবে নিয়ন্ত্রণ করবে, তার কোনো বাস্তব উদাহরণ এখন পর্যন্ত নেই।
আর মৃত মানুষকে পুনরায় জীবিত করার বিষয়টি আরও অসম্ভব। মৃত্যুর পর মস্তিষ্কের কোষগুলোতে অপরিবর্তনীয় ক্ষতি শুরু হয়। মস্তিষ্কের কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেলে কোনো ভাইরাস বা ছত্রাক সেই ব্যক্তিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারে না। ফলে সিনেমার জোম্বি এবং বাস্তব জীবাণুজনিত স্নায়ুরোগের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।
সব মিলিয়ে, জোম্বি ভাইরাসের মহামারি এখনো কল্পবিজ্ঞানের বিষয়। তবে প্রকৃতিতে এমন জীবাণু রয়েছে, যেগুলো পোষক প্রাণীর আচরণ পরিবর্তন করতে পারে। জলাতঙ্কের মতো ভাইরাস মানুষের মস্তিষ্কে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। আর নতুন জীবাণুর আবির্ভাব ও প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকিও বাস্তব। তাই ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় বিপদ হয়তো সিনেমার মতো মৃত মানুষের দল নয়; বরং এমন কোনো অজানা সংক্রামক রোগ, যার প্রকৃতি বুঝে ওঠার আগেই তা জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় সংকট তৈরি করতে পারে।



