চিকিৎসা বিজ্ঞানের ম্যাজিক
সচল হলো অচল হাত
- ব্রেন কম্পিউটার ইন্টারফেস

অধ্যাপক বুটন এই মুহূর্তটিকে অত্যন্ত গৌরবময় ও অবিশ্বাস্য বলে উল্লেখ করেছেন।
ছয় বছর আগের এক অভিশপ্ত জুলাইয়ের দিন। সুইমিংপুলে ডাইভ দিতে গিয়ে ঘটেছিল এক গুরুতর দুর্ঘটনা। ঘাড়ের হাড় ভেঙে বুক থেকে নিচের পুরো অংশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত (প্যারালাইজড) হয়ে গিয়েছিল ৪২ বছর বয়সী কিথ থমাসের। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের মাসাপেকুয়ার বাসিন্দা থমাসের জীবন থমকে গিয়েছিল হুইলচেয়ারের চাকায়। নিজের হাত দুটো নাড়ানোর ক্ষমতা পর্যন্ত ছিল না তার।
অথচ আজ সেই কিথ থমাস নিজের হাতে খাবার খাচ্ছেন, কাপ হাতে নিয়ে পানি পান করছেন, এমনকি পরম মমতায় ছুঁয়ে দেখছেন নিজের বোনের হাত ও পোষা কুকুরের গায়ের নরম লোম! চিকিৎসার ইতিহাসে অবিশ্বাস্য এই মিরাকল সম্ভব হয়েছে ব্রেন ইমপ্লান্টের কল্যাণে, যা তার মেরুদণ্ডের ক্ষতিগ্রস্ত অংশকে বাইপাস করে সরাসরি মস্তিষ্কের সঙ্গে হাতকে জুড়ে দিয়েছে।
২০২১ সালে যখন থমাস এই আধুনিক প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক ট্রায়ালে অংশ নিতে রাজি হন, তখন তিনি নিজের হাত দুটো হুইলচেয়ার থেকে এক ইঞ্চি ওপরে তোলার ক্ষমতাও হারিয়েছিলেন। এরপর তার মস্তিষ্কে ইলেকট্রোড প্রতিস্থাপনের জন্য একটি জটিল অস্ত্রোপচার করা হয়। শুরু হয় মাসের পর মাস চলা কঠোর প্রশিক্ষণ। গবেষকরা থমাসের মস্তিষ্কে একটি বিশেষ ‘ব্রেন কম্পিউটার ইন্টারফেস’ (বিসিআই) যুক্ত করে দেন। এই প্রযুক্তি কেবল তার হাত নাড়াতেই সাহায্য করেনি; বরং স্পর্শের অনুভূতিকেও মস্তিষ্কে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে। আর সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, এই প্রযুক্তি থমাসের স্নায়ুতন্ত্রকে আংশিকভাবে পুনর্গঠিত করতে সাহায্য করেছে।
নিউ ইয়র্কের নর্থওয়েল হেলথের গবেষণা শাখা ‘ফাইনস্টাইন ইনস্টিটিউটস ফর মেডিকেল রিসার্চ’-এর অধ্যাপক চ্যাড বুটনের নেতৃত্বে একদল গবেষক এই অসাধ্য সাধন করেছে। অধ্যাপক বুটন এই মুহূর্তটিকে অত্যন্ত গৌরবময় ও অবিশ্বাস্য বলে উল্লেখ করেছেন।
এই প্রযুক্তির মূল কাজ হলো, থমাস যখনই হাত নাড়ানোর কথা মনে মনে ভাবেন, তার মস্তিষ্কে বসানো ইলেকট্রোডগুলো সেই সিগন্যাল বা বার্তা ধরে ফেলে। এরপর সেই সিগন্যালটিকে তারের মাধ্যমে সরাসরি হাতের পেশিতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যা হাতকে সচল করে তোলে। একই সঙ্গে তার হাতের আঙুলে বসানো প্রেশার সেন্সরগুলো কোনো বস্তু স্পর্শ করলে সেই অনুভূতির সিগন্যাল মস্তিষ্কে ফেরত পাঠায়। অর্থাৎ, মস্তিষ্ক নড়াচড়ার নির্দেশ দিচ্ছে, হাত সেই কাজ করছে এবং কাজের ফল হিসেবে স্পর্শের অনুভূতি আবার মস্তিষ্কে ফিরে আসছে— এভাবেই বৃত্তটি সম্পূর্ণ হয়।
বিজ্ঞানীদের তৈরি এই সূক্ষ্ম ব্যবস্থার কারণে থমাস এখন ডিমের খোসার মতো অতি ভঙ্গুর জিনিসও সাবধানে হাত দিয়ে ধরতে পারেন। বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার মেডিসিন’-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে গবেষকরা থমাসের ৩৫ সপ্তাহের প্রশিক্ষণের অগ্রগতির বিবরণ দিয়েছেন। সিস্টেমটি ব্যবহারের ফলে তার ডান হাতের শক্তি ৮৬ শতাংশ ও বাম হাতের শক্তি ৬২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।




