মৃত নক্ষত্রের চারপাশে গ্রহের ধ্বংসাবশেষের দুটি বলয়

সংগৃহীত ছবি
পৃথিবী থেকে প্রায় ১ হাজার ৬০০ আলোকবর্ষ দূরে একটি মৃত নক্ষত্রের চারপাশে গ্রহের ধ্বংসাবশেষ দিয়ে তৈরি দুটি বলয়ের সন্ধান পেয়েছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। আগে এ ধরনের নক্ষত্রের চারপাশে একটি বলয় দেখা গেলেও এবারই প্রথম দুটি স্বতন্ত্র বলয়ের অস্তিত্ব শনাক্ত করা হয়েছে। গবেষকদের ধারণা, নক্ষত্রটির মৃত্যুর সময় ধ্বংস হয়ে যাওয়া গ্রহের কিছু অংশ এখনো টিকে আছে। এই আবিষ্কার থেকে ভবিষ্যতে আমাদের সৌরজগতের পরিণতি সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
গবেষণায় পাওয়া নক্ষত্রটির নাম জে১৩২৮-১৪৫০। এটি আকাশগঙ্গা ছায়াপথের কন্যা নক্ষত্রমণ্ডলে অবস্থিত। নক্ষত্রটি মূলত শ্বেত বামন। অর্থাৎ, সূর্যের মতো একটি নক্ষত্রের জীবনচক্রের শেষ পর্যায়ে বাইরের স্তরগুলো মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ার পর যে ঘন কেন্দ্র অবশিষ্ট থাকে, সেটিই শ্বেত বামন।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে নেচার অ্যাস্ট্রোনমি সাময়িকীতে। রয়টার্সের প্রতিবেদন বলছে, গবেষকেরা ইউরোপীয় সাউদার্ন অবজারভেটরির চিলিতে অবস্থিত ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ দিয়ে নক্ষত্রটির চারপাশ পর্যবেক্ষণ করেন। এতে দুটি স্বতন্ত্র গ্যাসীয় বলয় দেখা যায়। এর আগে গ্রহের ধ্বংসাবশেষ ঘিরে থাকা ২১টি শ্বেত বামন শনাক্ত করেছিলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। তবে সেগুলোর প্রতিটির চারপাশে ছিল একটি করে বলয়।
গবেষণার অন্যতম লেখক ও চিলির ইউনিভার্সিদাদ তেকনিকা ফেদেরিকো সান্তা মারিয়ার জ্যোতির্বিজ্ঞানী ফেলিপে লাগোস-ভিলচেস বলেন, ‘এটি দেখাচ্ছে, একটি গ্রহব্যবস্থার অবশিষ্টাংশের গঠন আমাদের আগের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি জটিল হতে পারে। একই সঙ্গে এটি আরও সমর্থন দিচ্ছে যে নক্ষত্র শ্বেত বামনে পরিণত হলেও পাথুরে গ্রহীয় বস্তু টিকে থাকতে পারে।’
গবেষকেরা ধারণা করছেন, নক্ষত্রটির চারপাশে থাকা দুটি বলয়ের মধ্যে দুটি গ্রহ বা ছোট আকারের পাথুরে বস্তু রয়েছে। নক্ষত্রটির ভয়াবহ পরিবর্তনের পরও সেগুলো টিকে গেছে। শ্বেত বামনটির ভর সূর্যের প্রায় ৪৭ শতাংশ। তবে এই ভর সংকুচিত হয়ে এমন একটি নক্ষত্রে পরিণত হয়েছে, যার ব্যাস পৃথিবীর প্রায় সমান।
গবেষকদের ধারণা, টিকে থাকা বস্তু দুটি একসময় আরও বড় গ্রহের অংশ ছিল। পরে নক্ষত্রটির মহাকর্ষীয় টানে সেগুলো ভেঙে যায়। এর মধ্যে একটি বস্তুর আকার বামন গ্রহ প্লুটোর কাছাকাছি হতে পারে। অন্যটি তার চেয়ে ছোট।
লাগোস-ভিলচেস জানান, নক্ষত্রটি লাল দানব নক্ষত্রে পরিণত হওয়ার আগে এর চারপাশে একটি গ্রহব্যবস্থা ছিল। নক্ষত্রটি আকারে অনেক বড় হয়ে ওঠার সময় ভেতরের দিকের কয়েকটি গ্রহকে গ্রাস করে। তবে দূরের কক্ষপথে থাকা কিছু গ্রহ টিকে যায়।
তিনি বলেন, ‘গ্রহব্যবস্থাটি পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়নি। টিকে থাকা কিছু পাথুরে বস্তু মহাকর্ষীয় প্রভাবে অত্যন্ত উপবৃত্তাকার কক্ষপথে চলে যায়। এর ফলে সেগুলো শ্বেত বামনটির খুব কাছে চলে আসে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যেসব বস্তু যথেষ্ট কাছে চলে এসেছিল, সেগুলো শ্বেত বামনটির প্রবল মহাকর্ষীয় টানে ভেঙে যায়। সেগুলোর উপাদান ছড়িয়ে ধুলা ও গ্যাসের একটি বলয় তৈরি করে। তবে তুলনামূলক বড় দুটি পাথুরে বস্তু সম্ভবত ওই ধ্বংসাবশেষের মধ্যেও টিকে গেছে।’
গবেষকদের মতে, টিকে থাকা এই দুটি বস্তুর উপস্থিতিই চারপাশের উপাদানগুলোকে দুটি সমকেন্দ্রিক গ্যাসীয় বলয়ে ভাগ হয়ে থাকতে সাহায্য করতে পারে। বাইরের বলয়ে ম্যাগনেশিয়ামের পরিমাণ ভেতরের বলয়ের তুলনায় অনেক কম। এ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, বলয় দুটি ভিন্ন দুটি মূল বস্তু থেকে তৈরি হয়েছে। আবার কোনো একটি পাথুরে বস্তু শ্বেত বামনের কাছে গিয়ে ভেঙে পড়ার সময় তার ভিন্ন স্তর থেকেও বলয় দুটি তৈরি হতে পারে।
গবেষকদের মতে, এই আবিষ্কার আমাদের সৌরজগতের সুদূর ভবিষ্যতের একটি সম্ভাব্য চিত্র তুলে ধরছে। তাদের ধারণা, প্রায় ৫০০ কোটি বছর পর সূর্যের জ্বালানি শেষ হয়ে যাবে। তখন এটি আকারে অনেক বড় হয়ে লাল দানব নক্ষত্রে পরিণত হবে। এরপর বাইরের স্তরগুলো মহাকাশে ছড়িয়ে দিয়ে সূর্যও একটি শ্বেত বামনে পরিণত হবে।
লাগোস-ভিলচেস বলেন, ‘সূর্য বড় হয়ে ওঠার সময় ভেতরের সৌরজগতের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটবে। বুধ ও শুক্র গ্রহ সূর্যের ভেতরে বিলীন হয়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে পৃথিবীও একই পরিণতির শিকার হবে কি না, তা নিয়ে এখনো বিজ্ঞানীদের মধ্যে স্পষ্ট ঐকমত্য নেই। বাইরের গ্রহগুলোর অবস্থা ভিন্ন হবে। বৃহস্পতি, শনি ও আরও দূরের বস্তুগুলোর টিকে থাকার সম্ভাবনা অনেক বেশি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সূর্য শ্বেত বামনে পরিণত হওয়ার পর টিকে থাকা গ্রহের অবশিষ্টাংশ, উপগ্রহ ও গ্রহাণুগুলোও এর মহাকর্ষীয় টানে কাছে চলে আসতে পারে। তখন সেগুলো ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
গবেষকের ভাষায়, ‘জে১৩২৮-১৪৫০ নক্ষত্রটির চারপাশে থাকা ধ্বংসাবশেষের বলয় আমাদের সৌরজগতের সুদূর ভবিষ্যতের সম্ভাব্য একটি পর্যায় তুলে ধরতে পারে।’
সূত্র: রয়টার্স




