মহাসাগরের নিচেই হবে মানুষের নতুন ঠিকানা

সমুদ্রের তলদেশে ভ্যানগার্ডের বাসস্থান। ছবি: সংগৃহীত
কল্পনা করুন, আপনি সকালে ঘুম থেকে উঠেই জানালাটা খুললেন। কিন্তু বাইরে কোনো ব্যস্ত রাস্তা, স্কুলবাস বা চেনা গাছপালা নেই-তার বদলে কাঁচের ওপারে নীল পানির এক মায়াবী রাজ্য, আর দল বেঁধে সাঁতার কাটছে ঝাঁকে ঝাঁকে রঙিন মাছ!
সায়েন্স অ্যালার্টের প্রতিবেদন বলছে, এটা কোনো সায়েন্স ফিকশন সিনেমার দৃশ্য নয়, খুব শীঘ্রই বাস্তব হতে চলেছে। 'ডিইইপি' নামের একটি সমুদ্র প্রকৌশলী কোম্পানি পানির নিচে থাকার জন্য চমৎকার এক ঘর তৈরি করেছে, যা একই সাথে গবেষণাগার, থাকার জায়গা ও ডুবোজাহাজ। তারা এই অভিনব কাঠামোর নাম দিয়েছে 'ভ্যানগার্ড'।
এটি মূলত একদল ‘অ্যাকুয়ানট’ বা জলচারীর জন্য তৈরি করা হয়েছে, যা ফ্লোরিডার সমুদ্র সৈকতের পানির প্রায় ৫৬ ফুট নিচে বসানো হয়েছে। এটি আসলে তাদের একটি ছোট পরীক্ষামূলক প্রজেক্ট, যার সফলতার ওপর ভিত্তি করে ২০২৭ সালের মধ্যে তারা 'সেন্টিনেল' নামে আরও বড় একটি প্রজেক্ট চালু করবে, যেখানে মানুষ চাইলেই সাগরের তলদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারবে।
এই রোমাঞ্চকর অভিযানের অন্যতম প্রধান মুখ হলেন নাসা-প্রশিক্ষিত অ্যাকুয়ানট ডন কার্নাগিস, যিনি মানুষের শরীর কীভাবে চরম প্রতিকূল পরিবেশে খাপ খাইয়ে নেয় তা নিয়ে গবেষণা করেন।
বিজ্ঞানীদের জন্য পানির নিচে এভাবে টানা থাকাটা দারুণ এক সুযোগ। সাধারণ সময়ে সমুদ্রের তলদেশ থেকে কোনো সামুদ্রিক উদ্ভিদের নমুনা বা জীব সংগ্রহ করে যখন উপরে আনা হয়, তখন পানির চাপের দ্রুত পরিবর্তনের কারণে সেই নমুনার কোষের গঠন বদলে যায়।
ফলে বিজ্ঞানীরা সাগরের আসল রহস্যটা ধরতে পারেন না। কিন্তু ভ্যানগার্ডের ভেতরে থেকে বিজ্ঞানীরা সরাসরি সমুদ্রের গভীরেই একদম আসল অবস্থায় নমুনাগুলো পরীক্ষা করতে পারবেন।
ভ্যানগার্ডের ভেতরের জীবনটা কিন্তু বেশ অদ্ভুত, অনেকটা মহাকাশ স্টেশনের মতো। এখানকার ভেতরের বাতাসের চাপ এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় যেন তা বাইরের পানির চাপের সমান থাকে। বিজ্ঞানীরা এখানে যখন থাকেন, তখন তাদের শরীরের রক্ত এবং কোষগুলো নাইট্রোজেন গ্যাসে পুরোপুরি সম্পৃক্ত হয়ে যায়, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে 'স্যাচুরেশন'।
এই অবস্থায় পৌঁছানোর পর একজন মানুষ চাইলে কোনো ক্ষতি ছাড়াই সপ্তাহের পর সপ্তাহ পানির নিচে কাটিয়ে দিতে পারে। ভ্যানগার্ডে ঢোকা বা বের হওয়ার জন্য নিচে 'মুন পুল' নামের একটি বিশেষ দরজা আছে, যা সরাসরি সমুদ্রের তলদেশের দিকে খোলে।
এ ছাড়া সাগরের ওপরে ভেসে থাকা একটি বয়া থেকে লম্বা তার বা পাইপের মাধ্যমে নিচে থাকা বিজ্ঞানীদের জন্য বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট এবং অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়।
এর ফলে সাধারণ স্কুবা ডাইভারদের মতো পিঠে ভারী সিলিন্ডার নিয়ে মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যে ফিরে আসার তাড়া থাকে না, বিজ্ঞানীরা চাইলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানির নিচে ঘুরে বেড়াতে পারেন।
আপাতত ভ্যানগার্ডের মূল কাজ বৈজ্ঞানিক গবেষণা আর সমুদ্রের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হলেও, এর ভবিষ্যৎ কিন্তু অনেক বড়। কোম্পানিটির সাথে মহাকাশ, প্রতিরক্ষা ও জ্বালানি খাতের বড় বড় প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।
ভবিষ্যতে হয়তো সমুদ্রের নিচে মানুষ আর রোবট মিলে একসাথে কাজ করবে। ডন কার্নাগিস মনে করেন, এই সুযোগ শুধু বিজ্ঞানীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। ভবিষ্যতে এখানে শিল্পী, ইতিহাসবিদ, শিক্ষার্থী এবং দেশের নীতি-নির্ধারকদেরও আসা উচিত, যাতে তারা স্বচক্ষে দেখে অনুধাবন করতে পারেন যে আমাদের চেনা পৃথিবীর বাইরে সমুদ্রের গভীরে কত বিশাল ও গুরুত্বপূর্ণ আরেকটা জগৎ লুকিয়ে আছে।
অবিকল রূপকথার মতো শোনায়, তাই না? অথচ এই ভ্যানগার্ডের হাত ধরেই হয়তো সমুদ্রের তলদেশে মানুষের বসবাসের নতুন এক ইতিহাস লেখা শুরু হতে যাচ্ছে।






