রোগব্যাধিকে জাদুঘরে পাঠাবে ডিপমাইন্ড

প্যান্ডোরার বাক্সে ফিরবে রোগব্যাধি। ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি
অসুখ-বিসুখের সমাধান লুকিয়ে আছে প্রোটিনে। আর গুগলের ডিপমাইন্ড একের পর এক প্রোটিনের গঠন উন্মোচন করেই যাচ্ছে। লিখেছেন ইমরানুর রহমান
গ্রিক পুরাণে প্যান্ডোরা নামে এক নারীর রহস্যময় বাক্সে লুকিয়ে ছিল পৃথিবীর তাবৎ দুঃখ, কষ্ট আর মারণব্যাধি, যা একবার বাক্স খুলে ছড়িয়ে পড়ার পর মানবজাতিকে আজীবন অভিশাপের মতো তাড়া করে বেড়াচ্ছে। কোটি কোটি মানুষের জীবনে নেমে আসা সেই রোগব্যাধি আর কষ্টের চিরতরে অবসান ঘটাতে আজ বাস্তবের ল্যাবরেটরিতে নেমে এসেছে অন্য এক জাদুকর; গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান ‘ডিপমাইন্ড’। তাদের হাত ধরে চিকিৎসাবিজ্ঞানের এমন এক অবিশ্বাস্য বিপ্লব ঘটতে চলেছে, যা ভবিষ্যতে রোগব্যাধিকে মানুষের শরীর থেকে চিরতরে বিতাড়িত করে আবার প্যান্ডোরা বক্সেই আটকে দিতে পারে।
মানবদেহের প্রতিটি কোষের প্রাণ হলো প্রোটিন। আমাদের পেশি গঠন, রক্তে অক্সিজেন সরবরাহ থেকে শুরু করে রোগ প্রতিরোধ— সবকিছুর পেছনে রয়েছে এই প্রোটিনের অবদান। কিন্তু সমস্যা হলো, এই প্রোটিনগুলো শুধু লম্বা সুতার মতো থাকে না; বরং অদ্ভুত এক জটিলাকার ধারণ করে কুঁকড়ে বা ভাঁজ হয়ে থাকে। প্রোটিন কীভাবে ভাঁজ হচ্ছে, তা না জানলে তার কাজ বা কোনো নির্দিষ্ট রোগের ক্ষেত্রে সে কীভাবে আচরণ করছে, তা বের করা অসম্ভব। অতীতে বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরিতে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও কষ্টসাধ্য পরীক্ষার মাধ্যমে একটিমাত্র প্রোটিনের গঠন জানতে বছরের পর বছর কাটিয়ে দিতেন।
এই অচলাবস্থার অবসান ঘটাতে ডিপমাইন্ড তৈরি করেছে তাদের বিখ্যাত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রোগ্রাম ‘আলফাফোল্ড’। এটি বিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সাফল্যগুলোর একটি। আলফাফোল্ড নিমেষে পৃথিবীর পরিচিত কোটি কোটি প্রোটিনের ত্রিমাত্রিক গঠন বা থ্রি-ডি রূপ বের করে বিজ্ঞানীদের সামনে উন্মুক্ত করে দিয়েছে। এর ফলে ক্যানসার, আলঝেইমার্স, পারকিনসন্স কিংবা এইডসের মতো জটিল ও রহস্যময় রোগের কারণ এবং তার বিরুদ্ধে লড়াই করার ওষুধ আবিষ্কারের পথ এখন পানির মতো সহজ হয়ে গেছে। আগে যেখানে একটি ওষুধ বানাতে বা প্রোটিন বুঝতে যুগের পর যুগ লাগত, এখন এআইর কল্যাণে তা মাত্র কয়েক দিনে বা ঘণ্টায় সম্ভব হচ্ছে।
শুধু প্রোটিনের রহস্যভেদ নয়; রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসকদের দৈনন্দিন দাপ্তরিক কাজেও এক পরম বন্ধু হয়ে উঠেছে ডিপমাইন্ড। ব্রিটিশ গবেষকদের সঙ্গে মিলে ডিপমাইন্ড এমন সব যুগান্তকারী এআই প্রযুক্তি তৈরি করেছে, যা মানুষের চোখের রেটিনার স্ক্যান দেখে চোখের গুরুতর সব রোগ অতি অল্প সময়ে নির্ভুলভাবে ধরে ফেলতে পারে। অনেক সময় অভিজ্ঞ চিকিৎসকও যা খালি চোখে প্রাথমিক অবস্থায় ধরতে পারেন না, ডিপমাইন্ডের উন্নত অ্যালগরিদম তা সেকেন্ডের মধ্যে শনাক্ত করে ফেলে। ডায়াবেটিস রেটিনোপ্যাথি বা ম্যাককুলার ডিেনারেশনের মতো সমস্যা সময়মতো শনাক্ত করে লাখ লাখ মানুষের অন্ধত্ব বা চোখের গুরুতর ক্ষতি খুব সহজে ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে।
ডিপমাইন্ডের এআই মডেলগুলো নিখুঁতভাবে প্রেডিক্ট করতে পারে, কোন অণু বা কেমিক্যালের সঙ্গে শরীরের কোষ কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে
শুধু চোখ বা প্রোটিন নয়; নতুন নতুন জীবন রক্ষাকারী ওষুধ আবিষ্কারের পেছনে যে বিশাল সময় ও অর্থের অপচয় হতো, ডিপমাইন্ড সেই গবেষণার কাজকে কয়েক গুণ দ্রুত ও সাশ্রয়ী করে তুলেছে। অতীতে যেকোনো নতুন ড্রাগ বা ওষুধ বাজারে আসার আগে ল্যাবরেটরিতে হাজারবার পরীক্ষা করতে হতো, যার সিংহভাগই ব্যর্থ হতো। কিন্তু ডিপমাইন্ডের এআই মডেলগুলো নিখুঁতভাবে প্রেডিক্ট করতে পারে, কোন অণু বা কেমিক্যালের সঙ্গে শরীরের কোষ কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে। ফলে ক্ষতিকর বা অকার্যকর ওষুধগুলো বাদ দিয়ে শুধু সঠিক ফর্মুলা নিয়ে কাজ শুরু করা যায়। এ ছাড়া শরীরের বিভিন্ন জিনগত ত্রুটি বা বিরল রোগ শনাক্তকরণেও ডিপমাইন্ডের বিভিন্ন প্রজেক্ট আজ চিকিৎসকদের আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে।
অবশ্য এই অগ্রগতির পথে কিছু চ্যালেঞ্জ ও নৈতিক প্রশ্নও জড়িয়ে রয়েছে। রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা, স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর অতিরিক্ত অন্ধ নির্ভরতা এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার ডেটা সুরক্ষার বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। তবে আশা করা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিকিৎসকদের প্রতিস্থাপন করবে না; বরং তাদের ক্ষমতা বহু গুণ বাড়িয়ে দেবে। এই মানসিকতা নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। প্রযুক্তির এই বিশাল ভাণ্ডার যেন পৃথিবীর সব প্রান্তের মানুষ সমানভাবে উপভোগ করতে পারে, সেদিকেও বিজ্ঞানীদের নজর রাখতে হবে।
ভবিষ্যতের দিনগুলোতে এই প্রযুক্তির হাত ধরে চিকিৎসাবিজ্ঞানের চিত্রটাই পুরোপুরি পাল্টে যাবে। প্যান্ডোরা বক্সের অভিশাপের মতো যেসব রোগ আজ আমাদের কাছে অবাধ্য ও ভয়ংকর বলে মনে হয়, চিকিৎসাবিজ্ঞান আর ডিপমাইন্ডের যৌথ শক্তির সামনে টিকতে না পেরে সেগুলোর অস্তিত্ব একদিন পৃথিবী থেকে চিরতরে মুছে যাবে। তখন হয়তো বর্তমানের এই মারণব্যাধিগুলোর নাম মানুষ আর আধুনিক হাসপাতালে খুঁজবে না; বরং ইতিহাসের বই বা কোনো জাদুঘরের কাচের বাক্সে বন্দি দেখতে পাবে। বিজ্ঞান যখন এভাবেই মানুষের কল্যাণে ও জীবন বাঁচাতে নিরলস কাজ করে, তখন প্যান্ডোরা বক্সের শেষ কোনায় লুকিয়ে থাকা সেই পবিত্র ‘আশা’ আজ বাস্তবে রূপ নেওয়ার পথে আরও এক বিশাল ধাপ এগিয়ে যায়।
ডিপমাইন্ডের পেছনের মানুষটি
বিজ্ঞানের দুনিয়ায় এমন কিছু দূরদর্শী মানুষ জন্ম নেন, যারা নিজেদের বুদ্ধিমত্তা ও অদম্য জেদের জোরে পুরো পৃথিবীর ভবিষ্যৎ বদলে দেন। গুগলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রতিষ্ঠান ‘ডিপমাইন্ড’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান নির্বাহী ডেমিস হাসাবিস ঠিক তেমনি একজন প্রতিভাবান জাদুকর। শৈশবের চেস প্রডিজি বা দাবায় বিস্ময়বালক থেকে শুরু করে আজকের বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় এআই বিজ্ঞানী; তার এই পথচলা মানবসভ্যতার প্রযুক্তিগত ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়।
১৯৭৬ সালে লন্ডনে জন্মগ্রহণ করা ডেমিস হাসাবিস ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তিনি আন্তর্জাতিক দাবা মাস্টার খেতাব অর্জন করেন, যা সেসময় বিশ্বের সমবয়সী খেলোয়াড়দের মধ্যে অন্যতম সেরা একটি অর্জন ছিল। তবে দাবা বোর্ডের গণ্ডি পেরিয়ে তার মন টানে কম্পিউটারের কোডিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে। মাত্র ১৭ বছর বয়সে তিনি বিখ্যাত ভিডিও গেম ‘থিম পার্ক’-এর সহডিজাইনার হিসেবে কাজ করেন। এরপর কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞানে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক সম্পন্ন করে তিনি দীর্ঘকাল গেম ডেভেলপমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিতে সুনামের সঙ্গে কাজ করেন এবং নিজের কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন।
কিন্তু হাসাবিসের আসল লক্ষ্য ছিল ভিন্ন। মানব মস্তিষ্কের কাজ করার পদ্ধতি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মেলবন্ধন ঘটিয়ে এমন কিছু তৈরি করা, যা মানুষের বড় বড় সমস্যার সমাধান করতে পারে। ২০১০ সালে তিনি অপর দুই সহকর্মীকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ডিপমাইন্ড টেকনোলজিস’। ২০১৪ সালে গুগল এই প্রতিষ্ঠানটি কিনে নেওয়ার পর হাসাবিসের নেতৃত্বে ডিপমাইন্ড বিশ্ব জুড়ে তাক লাগিয়ে দেওয়া সব সাফল্য অর্জন করে। তারই মস্তিষ্কপ্রসূত ‘আলফাগো’ (AlphaGo) এআই প্রোগ্রামটি গো খেলায় বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে পরাজিত করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইতিহাসে এক যুগান্তকারী মাইলফলক স্পর্শ করে।
এরও বড় সাফল্য আসে চিকিৎসাবিজ্ঞানে, যখন তার দল তৈরি করে ‘আলফাফোল্ড’। প্রোটিনের জটিল ত্রিমাত্রিক গঠনের রহস্যভেদ করে তিনি চিকিৎসাবিজ্ঞানের অর্ধশতাব্দী পুরনো ধাঁধার সমাধান করেন, যার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০২৪ সালে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। ডেমিস হাসাবিস শুধু একজন সফল প্রযুক্তি উদ্যোক্তাই নন; তিনি এমন এক স্বপ্নদ্রষ্টা, যিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে মানবকল্যাণের সর্বশ্রেষ্ঠ হাতিয়ারে রূপ দিয়েছেন।





