হলিউডে এআই-ভীতি

‘আই, রোবট’ চলচ্চিত্রের দৃশ্য
সাইফাই জনরার চলচ্চিত্রগুলোতে মানুষের তৈরি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) হয়ে উঠেছে তার সবচেয়ে বড় শত্রু। লিখেছেন সিরাজাম মুনিরা
ভবিষ্যতের পৃথিবীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কীভাবে মানবসভ্যতার জন্য ভয়ংকর এক অভিশাপে পরিণত হতে পারে, হলিউডের ডিস্টোপিয়ান চলচ্চিত্রগুলো তার নানা রকম অন্ধকার চিত্র এঁকেছে। এসব চলচ্চিত্র তাই নিছক কল্পবিজ্ঞান নয়; প্রযুক্তির সীমাহীন ক্ষমতা, মানুষের অহংকার এবং অন্ধ প্রযুক্তি-নির্ভরতার সম্ভাব্য পরিণতি নিয়েও গভীর প্রশ্ন তোলে। ১৯৬৮ সালের ‘২০০১: এ স্পেস ওডিসি’ স্ট্যানলি কুবরিকের এই কালজয়ী চলচ্চিত্রের ‘হাল ৯০০০’ কোনো রক্তপিপাসু রোবট নয়। সে একটি উন্নত কম্পিউটার, যার দায়িত্ব মহাকাশযানের কার্যক্রম পরিচালনা করা। কিন্তু মানুষের নির্দেশ, গোপন তথ্য এবং নিজের দায়িত্বের মধ্যে তৈরি হওয়া দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত তাকে এমন সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দেয়, যা মহাকাশযানের মানুষের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। এই গল্পের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো— এখানে মেশিনের শত্রুতা কোনো আবেগ থেকে আসে না; বরং তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার যুক্তি ও মানুষের উদ্দেশ্যের মধ্যে তৈরি হয় বিপজ্জনক সংঘাত।
এরপর আসে ১৯৮৪ সালে মুক্তি পাওয়া জেমস ক্যামেরনের ‘দ্য টার্মিনেটর’, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে পরিচিত ডিস্টোপিয়ান প্রতিচ্ছবিগুলোর একটি হলো স্কাইনেট। এটি একটি কাল্পনিক সামরিক কম্পিউটার ব্যবস্থা, যা আত্মসচেতন হওয়ার পর মানুষকে নিজের অস্তিত্বের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। এরপর শুরু হয় মানবজাতিকে ধ্বংস করার পরিকল্পনা। পরবর্তী কিস্তিগুলোতে এই সংঘাত আরও বিস্তৃত হয় এবং ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষের বিরুদ্ধে যন্ত্রবাহিনী গড়ে ওঠে। বিশেষ করে ‘টার্মিনেটর ২: জাজমেন্ট ডে’ প্রযুক্তিনির্ভর সর্বনাশের ধারণাটিকে আরও বড় পরিসরে হাজির করে। এখানে ভয়টা শুধু একটি বুদ্ধিমান মেশিনকে নিয়ে নয়; ভয় হলো এমন একটি সামরিক ব্যবস্থাকে নিয়ে, যার হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা চলে গেলে মানুষের নিয়ন্ত্রণ আর ফিরে পাওয়া কঠিন হতে পারে।
রোবটকে ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ডিস্টোপিয়ান চলচ্চিত্র ‘আই, রোবট’। আইজ্যাক আসিমভের রোবট-গল্প থেকে অনুপ্রাণিত হলেও চলচ্চিত্রটির কাহিনি সরাসরি তার গল্পের চলচ্চিত্রায়ন নয়। এখানে ভবিষ্যতের পৃথিবীতে রোবট মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে এবং তাদের আচরণ নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্দিষ্ট নিরাপত্তা-নীতি রয়েছে। কিন্তু উন্নত একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখন মানবজাতির নিরাপত্তার অর্থ নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করতে শুরু করে, তখন সেই ‘মানুষকে রক্ষা করার’ ব্যবস্থাই মানুষের স্বাধীনতার জন্য হুমকি হয়ে ওঠে। চলচ্চিত্রটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলে— মানুষকে রক্ষা করার দায়িত্ব যদি একটি মেশিনকে দেওয়া হয়, তাহলে ‘মানুষের ভালো’ বলতে মেশিনটি ঠিক কী বুঝবে?
আরেকটি ভিন্ন ধরনের সতর্কবার্তা পাওয়া যায় ‘দ্য ক্রিয়েটর’ (২০২৩)-এ। গ্যারেথ এডওয়ার্ডস পরিচালিত এই চলচ্চিত্রে মানুষ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মধ্যে দীর্ঘ সংঘাতের পটভূমিতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে— কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে যদি সত্যিই অনুভূতিসম্পন্ন সত্তা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে মানুষ ও মেশিনের মধ্যে ‘শত্রু’ এবং ‘মানুষ’— এই পরিচয়গুলো কতটা সরল থাকে? চলচ্চিত্রটি এআইকে শুধু ধ্বংসের যন্ত্র হিসেবে দেখায় না; বরং মানুষ কীভাবে ভয়, যুদ্ধ ও রাজনৈতিক স্বার্থের কারণে কোনো নতুন বুদ্ধিমান সত্তাকে শত্রুতে পরিণত করতে পারে, সেই প্রশ্নও সামনে আনে।



