হোটেল ক্যালিফর্নিয়া

বেঁচে থাকতে চাওয়া মানুষের কাছে ভীষণ এক আকাঙ্খার নাম। আরেকটু আয়ু বাড়িয়ে নেয়া, আর কয়েকটা বছর বাঁচার জন্য মানুষের ইচ্ছে মৃত্যুর সঙ্গে এক অদ্ভুত খেলায় মেতে থাকে সারাক্ষণ। চারপাশে ঘণীভূত জীবনের স্রোতে বয়ে চলেছে। তবুও জীবনানন্দ দাশ রূপসী বাংলা পর্বে ‘কোথাও চলিয়া যাব’ কবিতায় লিখেছেন, ‘‘কোথাও চলিয়া যাব একদিন...তারপর রাত্রির আকাশ অসংখ্য নক্ষত্র লয়ে ঘুরে যাবে কতকাল জানিব না আমি’’। একদিন কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে যায় মানুষ? এই প্রশ্নের উত্তর মানুষ জানতে পারেনি বলেই জীবন রয়ে গেল রহস্যময় মৃত্যু শাসিত। কিন্তু মানুষের চারপাশে তো জীবন অগাধ। সেখানে বয়ে চলে আরও আরও মানুষের স্রোতে, আরও সব অস্তিত্ব। সেখানে কি জীবনানন্দের কবিতার মতো ভাবনার অবসর আছে? রাত্রি ফুরিয়ে পৃথিবীতে সূর্যের আলো পৌঁছানোর পর থেকে জামাকাপড়ের ভিতরে শরীর গলিয়ে শুরু হয় প্রতিদিনের অদৃশ্য এক দৌড় প্রতিযোগিতা। কিন্তু সেই দৌড়ের ফিনিশিং টেপটা ঠিক কোথায়, কতদূরে বাঁধা তা-ই আমরা জানি না। দৌড়টা কারো কারো কাছে অন্তহীন বলে মনে হয়। আবার কারো কাছে এই দৌড়-ই জীবনের সারৎসার। দিনভর অফিসে মিটিং, বসের ধমক, টার্গেট, নানা ধান্দা-ফিকির, বিজনেস লাঞ্চ দামী কোনো রেস্তোরাঁয় অথবা অফিস পাড়ার কোনো গলিতে দাঁড়িয়ে আলোর চাইতেই বেশি গতিতে ভাত, সবজি আর ডাল পাকস্থলীতে পাঠিয়ে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে রাস্তায় যানজটে আটকে পড়া যানবাহনের প্লাবন দেখা, মোবাইল ফোনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চকিত দৃষ্টি ফেলা, একটা গোটা শহর উচ্ছন্নে যাচ্ছে ভেবেও নিজেকে সেখানেই আটকে ফেলা- জীবন তাহলে এরকমই, সেখানে বেঁচে থাকাও তাহলে এমন?
জীবন আমাদের বেঁধে রাখে আষ্টেপৃষ্ঠে। কী জন্য ছুটে চলায় এই স্বেদ ঝরানো, কিসের আশায় সময় তোলপাড় করে তোলা, কী জন্য প্রতিযোগিতার এই ধূলি ওড়ানো? কেউ প্রশ্ন করলে উত্তরটা ঠিকঠাক দেয়া কঠিন। হয়ত অন্নের জন্য, জীবিকার জন্য, সাফল্যের জন্য, জীবনে আরও ঔজ্জ্বল্য যোগ করার জন্য। কিন্তু হিসেব মেলাতে গেলে দেখা যাবে সেই এক রুটিনের পেছনে ধাওয়া করতে করতেই সময় উত্তীর্ণ; ফিনিশিং টেপের সামনে পৌঁছে গেছে জীবন।
মানুষের বেঁচে থাকার ভারে কখনো কি নুয়ে আসে পৃথিবীর মেরুদণ্ড, লণ্ডভন্ড হয়ে যায় সবুজ ঘাসের দেশের স্বপ্ন? জীবনকে মনে হয় এক শ্রমশিবির? ইংরেজ কবি টি.এস এলিয়ট লন্ডন ব্রিজের ওপর বয়ে চলা মানুষের ঘন স্রোত দেখে চমকে উঠে কবিতা লিখে ফেলেছিলেন। আমরা বোধ হয় আজকাল চমকে উঠতেও ভুলে গেছি। জীবন এক অভ্যাসের নাম হয়ে গেছে বলেই হয়ত চমকে উঠি না।
ম্যাকিয়াভেলির আলোচিত বই ‘দ্য প্রিন্স’। সেখানে তিনি লিখেছেন, মানুষ যত সভ্য হবে, ততই তার লোভ বাড়বে। আমাদের লোভ অথবা আকাঙ্খার আগুন নিজেদের জীবনের হাতেগোনা কয়েকটা দিনকেও যেন পুড়িয়ে দেয়, দিচ্ছে। সত্তরের দশকের মাঝামাঝি পশ্চিমের প্রখ্যাত ঈগলস ব্যান্ডের ‘হোটেল ক্যালিফর্নিয়া’ গানটি আলোড়ন তুলেছিল অন্তর্গত গভীর ভাবনার জন্য। মরুভূমিতে একটি হোটেলে চিরকালের জন্য আটকা পড়েছে কিছু মানুষ। সেখান থেকে বের হওয়ার দরজা খুঁজে পাচ্ছে না তারা। তারা খুন হয়ে গেছে জীবনের প্রাচুর্য আর বিলাসের মধ্যে। ভীষণ আকাঙ্খার বলি হয়েছে তারা। আমরাও কি সেরকম আটকে পড়িনি? জীবন কি কখনো আমাদের কাছে মরুভূমির বুকে একটা হোটেল হয়ে ওঠে না, যেখান থেকে পালাবার পথ খোলা নেই? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তো তাঁর ছোট গল্পে লিখেছেন সেই অসীম ঐশ্বর্য আর অনন্ত কারাগারের কথা।
কেউ বেকায়দা প্রশ্নটা করে ফেলতে পারেন, তাহলে আমরা এই জীবনের মধ্যে বেঁচে আছি কেন?
উত্তরটা সহজ, মানুষ সাধারণত পরিকল্পনা করে মরে যেতে চায় না বলে। পশ্চিমবঙ্গের কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত লাইন সত্য হয়ে ওঠে মানুষের জীবনে- যেতে পারি কিন্তু কেন যাব? সন্তানের মুখ ধরে একটি চুমু খাবো। জীবনে বেঁচে থাকা তাই আমাদের তীব্র এক আকাঙ্খার নাম। আমরা জড়িয়ে থাকি মায়ার মধ্যে। দিন শেষে নিজেকে প্রবোধ দিই এই বলে- আসলে জীবন এরকমই।







