ধুমকলা

সংগৃহীত ছবি
রাজধানীর ব্যস্ততা, রমনার সবুজ আর বাংলা একাডেমির কর্মচাঞ্চল্যের সঙ্গে আমার দীর্ঘ ১৭ বছরের সম্পর্ক। ২০২৩ সালের অমর একুশে বইমেলার পর নতুন দায়িত্ব নিয়ে চলে এলাম রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দ ইউনিয়নের খোর্দ্দমুরাদপুর গ্রামে— সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বাংলা একাডেমি পরিচালিত বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রে। নতুন কর্মস্থলে প্রথম দিনই যেন অন্য এক জগতে প্রবেশ করলাম।
চারপাশে সবুজে মোড়া নান্দনিক ক্যাম্পাস, নিরিবিলি পরিবেশ আর ইতিহাসের আবেশ মুহূর্তেই মন ছুঁয়ে গেল। তবে প্রকৃত বিস্ময় তখনো অপেক্ষায় ছিল— এক অদ্ভুত কলাগাছের গল্প, যার নাম ধুমকলা।
একদিন আড্ডার ফাঁকে বেগম রোকেয়া স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক ও পাঠাগারের পরিচালক, রোকেয়া গবেষক রফিকুল ইসলাম দুলাল ধুমকলার গল্প শোনাতে শুরু করলেন। তার কথায় যেন ইতিহাসের দরজা খুলে গেল।
প্রায় ১৮০ বছর আগে নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের বাবা, পায়রাবন্দের জমিদার জহির উদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী হায়দার সাবের, জার্মানি থেকে শৌখিন সাজসজ্জার জন্য এই বিরল কলাগাছটি নিয়ে আসেন। সেই বিদেশি অতিথিই আজও পায়রাবন্দের মাটিতে বেঁচে আছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে।
ইংরেজিতে যার নাম Snow Banana বা তুষার কলা। উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Ensete glaucum। এটি মুসেসি (Musaceae) পরিবারের এবং জিংগিবারেলেস (Zingiberales) বর্গের একটি উদ্ভিদ। এই পরিবারের প্রধান দুটি গণের মধ্যে রয়েছে মুসা ((Musa) (যার মধ্যে মিষ্টি ও রান্নার উপযোগী সাধারণ কলা অন্তর্ভুক্ত) এবং এনসেট (Ensete)। সাধারণ কলাগাছের সঙ্গে এর আত্মীয়তা থাকলেও স্বভাব-চরিত্রে এটি অনেকটাই আলাদা।
বেগম রোকেয়া পরিবারের বাড়ির দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ থেকে পাওয়া একটি চারা ১৯৯৭ সালে স্মৃতিকেন্দ্রে রোপণ করা হয়। তার আগে দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকলেও প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে গাছটি নিজের বংশবিস্তার চালিয়ে গেছে।
ধুমকলার সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য এর বংশবিস্তার পদ্ধতি। সাধারণ কলাগাছের মতো গোড়া থেকে চারা (Sucker) গজিয়ে নয়, বরং বীজ থেকেই এর নতুন চারা জন্মায়। পৃথিবীর আর কোনো কলাগাছে এমন বৈশিষ্ট্য আছে কি না, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। এ কারণে ধুমকলা উদ্ভিদপ্রেমী ও গবেষকদের কাছে বিশেষ আগ্রহের বিষয়।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক মো. মোস্তাফিজুর রহমান পায়রাবন্দ থেকে সংগ্রহ করা বীজ নিয়ে সফলভাবে চারা উৎপাদন করেছিলেন। একই বিভাগের অধ্যাপক মো. আশরাফুজ্জামান জানিয়েছেন, ধুমকলা এখনো নিয়মিত বিরতিতে ফল দিয়ে চলেছে।
স্মৃতিকেন্দ্রের অডিটরিয়ামের লবির নিচেই রয়েছে এমন একটি গাছ। সম্প্রতি সেখানে নতুন কাঁদি এসেছে। ধুমকলার কাঁদি প্রায় পাঁচ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। গাছের গোড়া অনেকটা পামগাছের মতো মোটা ও গোলাকার, দেখতে যেন পুরনো দিনের কাঁসা বা পিতলের কলস। একটি কাঁদিতে হাজার হাজার ছোট ছোট কলা ধরে। প্রতিটি কলা মাত্র এক থেকে দেড় ইঞ্চি লম্বা— আকৃতিতে মানুষের বুড়ো আঙুলের মতো।
পাকা ফলের ভেতর হলুদাভ শাঁসের সঙ্গে থাকে অসংখ্য শক্ত বীজ, যেগুলো মটরকলাইয়ের চেয়েও কিছুটা বড়। স্বাদে মিষ্টি হলেও বীজের আধিক্যের কারণে খেতে খানিকটা অস্বস্তি লাগে। তবু এই বিরল ফলের স্বাদ নেওয়ার আগ্রহ দর্শনার্থীদের কম নয়।
প্রতি বছর ৯ থেকে ১১ ডিসেম্বর রোকেয়া দিবস উপলক্ষে পায়রাবন্দে লাখো মানুষের সমাগম ঘটে। স্মৃতিকেন্দ্র তখন যেন প্রাণের মেলায় পরিণত হয়। এখনো মনে আছে, ২০২৪ সালের রোকেয়া মেলার সময় ধুমকলা ফলে ভরে উঠেছিল। অসংখ্য দর্শনার্থী বিস্ময়ভরা চোখে সেই বিরল কলা দেখেছিলেন, অনেকে স্বাদও নিয়েছিলেন। এ বছরও নতুন কাঁদি এসেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী রোকেয়া মেলার আগেই হয়তো আবারও পেকে উঠবে সেই ঐতিহ্যের ফল।
ধুমকলা ঘিরে স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে ঘোরে আরও কিছু মজার লোককথা। বলা হয়, কেউ যদি এর পাতার ডাঁটা খাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে, তবে একদিন আগে গাছের কাছে গিয়ে সে কথা জানালে পরদিন নাকি পাতাটি নিজে থেকেই নিচু হয়ে আসে। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সেই গল্প আজও গ্রামের মানুষ আগ্রহ নিয়ে বলে।
শুধু লোককথাই নয়, ধুমকলার ডাউগনা— অর্থাৎ ভেতরের কোমল ডাঁটার অংশ সবজি হিসেবেও খাওয়া হয়। স্থানীয়দের মতে, রান্না করলে এর স্বাদও বেশ ভালো।
পায়রাবন্দের ধুমকলা তাই শুধু একটি বিরল উদ্ভিদ নয়; এটি ইতিহাস, ঐতিহ্য, লোকবিশ্বাস এবং প্রকৃতির এক অপূর্ব মিলনকাব্য। বেগম রোকেয়ার স্মৃতিবিজড়িত এই জনপদে দাঁড়িয়ে ধুমকলার দিকে তাকালে মনে হয়, সময় বদলেছে, মানুষ বদলেছে, কিন্তু ইতিহাসের কিছু জীবন্ত সাক্ষী আজও নীরবে অতীতের গল্প বলে চলেছে।
লেখা: আবিদ করিম মুন্না, কৃষিবিদ, লেখক ও গবেষক




