আমীরুল ইসলাম : রঙের আকাশে রঙিন লেখক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলা আধুনিক শিশুসাহিত্যে কীর্তিমান লেখকদের একজন আমীরুল ইসলাম। তার লেখায় আছে জাদুকরী মজার রহস্য; আছে মনকে রাঙিয়ে দিতে দারুণ সব গল্পকথার ছন্দ। যা ছোটদের কাছে শুধুই ছড়া, তা বড়দের কাছে ভাববার বিষয়। চিরচেনা ছন্দের বাক্সে না আটকে রেখে ছড়াকে তিনি নিরীক্ষার সুতায় বেঁধে টাপুরটুপুর করে নাচিয়েছেন। গল্পে এনেছেন কল্পনায় দেখা জাদুকরী ভাবনা। শিশু-কিশোরদের ভুবনকে জ্ঞানসমৃদ্ধ করে তুলতে তিনি গল্প, ছড়া, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, জীবনী, ইতিহাস, চিত্রকলা— নানা বিষয় নিয়ে লিখেছেন।
তার লেখায় শিশুরা খুঁজে পায় আনন্দের রঙিন পৃথিবী। বড়রাও খুঁজে পান হারিয়ে যাওয়া শৈশব স্মৃতি। তার লেখায় আছে জীবনের কথা, মানুষের কথা, প্রকৃতির কথা, দেশের কথা। তিনি লিখলেন—
‘দূরের মাঠ। নদীর ঘাট।
পাখির ডাক
আকাশ নীল
ছড়ার মিল
নৌকা যায় কোথায় যায়?
এই তো আমার ধানের দেশ
গানের দেশ। প্রাণের দেশ।
বাংলাদেশ।
হিজল গাছ। শাপলা বিল।
জিওল মাছ। মেঘ-দুপুর।
পায়ে নূপুর। সূর্যবীর। ঢালছে রোদ।
স্বপ্ন বীজ উড়েেছ ঐ
এই তো আমার বাংলাদেশ।’
তিনি লেখালেখিতে নতুন আঙ্গিক, নতুন ধারা তৈরি করতে চাইতেন। ছড়া-কবিতায় তিনি আঁকতেন নানা দৃশ্যের কোলাজ—
‘আমি ভালবাসি নিমফুল জুঁই
মাছরাঙা। নীল, আকাশের নীল।
আমি ভালবাসি বসন্তের বায়ু
শিশিরের রঙ। উড়ন্ত চিল।
আমি ভালবাসি শুভ জোনাকি।
শাদা কবুতর। রোদ অবিরত।
আমি ভালবাসি মিছিলের মুখ
ভালবাসি শাদা ভাত প্রথমত।’
জন্ম ৭ এপ্রিল ১৯৬৪। ঢাকার লালবাগে তার বড় হয়ে ওঠা। আমীরুল ইসলামের সাহিত্যিক পরিচয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যমটি হচ্ছে ছড়া। বাংলার লোকজ ছড়ার ঐতিহ্যবাহী ধারাকে তিনি এগিয়ে নিয়ে গেছেন। রূপ দিয়েছেন আধুনিকতার।
বাংলা ভাষার রূপকথা ছাড়াও ফ্রান্সের রূপকথা থেকে ইংল্যান্ডের রূপকথা, হ্যান্স অ্যান্ডারসন থেকে অস্কার ওয়াইল্ড, শেখ সাদী থেকে সুকুমার রায়— বিভিন্ন সাহিত্য ভুবনের দরজা তিনি পাঠকের জন্য খুলে দিয়েছেন।
পুরান ঢাকার ওয়েস্ট এন্ড হাই স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ার সময় একদিন স্যার ক্লাসের সহপাঠীদের নামের তালিকা লিখতে বললেন। আমীরুল ইসলাম লিখে দিলেন। তার হাতের লেখা দেখে স্যার খুব প্রশংসা করলেন। সেই খুশিতে আরও নতুন নতুন লেখার শখ জাগল আমীরুল ইসলামের মনে। ১৯৭৭ সাল। একদিন হুট করে লিখে ফেললেন ছড়া। তখন সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। স্কুলের সেই স্যারের পরামর্শে ১২ লাইনের ছড়াটি পাঠিয়ে দেন দৈনিক বাংলা পত্রিকায় ‘সাত ভাই চম্পা’ বিভাগে। চার লাইন কেটে দিয়ে সেই ছড়া আট লাইনে ছাপা হলো। শুধু কি তাই! লেখা ছাপা হওয়ার জন্য দৈনিক বাংলা পত্রিকা থেকে পাওয়া গেল ১০ টাকা সম্মানী। সেই আনন্দে আর লেখা থামেনি। প্রবল উৎসাহে শুরু করেন লেখালেখি। তিনি খুব নিরীক্ষাধর্মী লেখা লিখতেন। নতুন কিছু ভাবতেন। শুধু ছড়ায় নয়; গল্পতেও তিনি নিরীক্ষা করেছেন। গল্পের বর্ণনায় সংলাপে অন্ত্যমিল ব্যবহার করেছেন। তেমন একটা গল্প ‘বাঘের মাসি’। গল্পটি এমন—
‘কেউ একজন একদিন বেড়ালকে বলল, তুমি হচ্ছ বাঘের আত্মীয়। বাঘের মাসি।
তাই না শুনে বেড়ালের সে কি হাসি। মাসি আবার কাকে বলে? মাসি মানে কী? কেউ জানে কী? বেড়াল ভাবল, আমি তো সব পারি। খুলে দেখল ডিকশনারি। মাসি মানে খালা, শুনে কান ঝালাপালা। বাঘ তো অনেক বড়। সে তো অনেক ছোট। ব্যাপার অনেক খটোমটো। সে কেন হবে বাঘের খালা? বাঘ হতে পারে তার খালা।’
গল্পের শেষটা ছিল এমন যে, ‘সব জায়গায় ঘুরেফিরে যখন জানল বাঘ বাঘই। বেড়াল বেড়ালই। নিজ এলাকায় এসে বেড়াল হাঁপ ছেড়ে বাঁচে। গলা ছেড়ে দু-একবার হাঁচে। তারপর ফূর্তি করে নাচে। বাঘ বাঘের জায়গায় আছে। আমি বেড়াল আমার জায়গায় আছি।’
তার প্রথম বই ‘খামখেয়ালি’। বইটি অগ্রণী ব্যাংক-বাংলাদেশ শিশু একাডেমি শিশু সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছিল। শিশুসাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হন। এ ছাড়া অর্জন করেছেন আরও বেশ কিছু মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ও সম্মাননা।
দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন তিনি। নানা রকম জটিল রোগে ভুগতে ভুগতে হারিয়েছেন দৃষ্টিশক্তি। কিন্তু কী বিস্ময়কর ব্যাপার! অন্ধত্বকে বরণ করে হুইলচেয়ারে বসে তিনি যোগ দিয়েছেন অফিসের কাজে। উপস্থিত থেকেছেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, সাহিত্য আসরে, লেখকের আড্ডায়। ভীষণ সাহসী মন নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন শহরময়। হইহই করা মানুষ তিনি। খুব আমুদে স্বভাবের।
রান্নায় ছিল তার জাদুকরী হাত। সুস্বাদু খাবার রেধে বন্ধুদের খাওয়াতে খুব ভালোবাসতেন। দাবা ছিল তার প্রিয় খেলা। গ্র্যান্ডমাস্টারদের সঙ্গে দাবা খেলেছেন। কথা বলার ক্ষেত্রে তার ছিল নিজস্ব স্বভাবসুলভ ভঙ্গি। তার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বরে ছিল আত্মবিশ্বাস। ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শুক্রবার তিনি আমাদের ছেড়ে চিরতরে বিদায় নেন।
শিশু-কিশোরদের জন্য তিনি সাজিয়ে দিয়েছেন এক রঙিন আকাশ। সেই আকাশে আছে মেঘ, রোদ, পাখি, ঘুড়ি আরও কত কী! আছে কত বিচিত্র কথামালা, কত স্বপ্ন।
সবার
প্রিয় আমীরুল ইসলাম শুধু লেখকই নন,
তিনি ছিলেন একজন মানবিক মানুষ।



