আসিয়া আখতার থেকে আখতার হুসেন

অলংকরণ করেছেন রজত
নিজের লেখা নিজেই ছিঁড়ে ফেলেছিলেন। কিন্তু কেন? কীসের অভিমান? উত্তরে লেখক বললেন, ‘বাংলা এবং বিদেশি সাহিত্যিকদের অনেকের লেখার প্রভাব ছিল বলেই এ কাজ করেছিলাম।’
তারপরের ইতিহাস ভিন্ন। লেখা হলো জীবনের অন্যরকম গল্প। আখতার হুসেন হয়ে উঠলেন বাংলা শিশুসাহিত্যের অন্যতম প্রধান সাহিত্যিক। ষোলো বছর বয়সে তার প্রথম লেখা ছাপা হয়। ১৯৬১ সালের কথা। তখন তিনি গফরগাঁও সরকারি ইসলামিয়া হাই স্কুলে ক্লাস এইটে পড়েন। বড়দের উপযোগী ছোটগল্প লিখেই তার সাহিত্য-জীবনের সূচনা। বিদেশি ভাষার অনুবাদ পড়তেন। বিশেষ করে উর্দু, হিন্দি ও পাঞ্জাবি লেখকদের গল্পের অনুবাদ। লিখলেন বড়দের উপযোগী একটি ছোটগল্প। পরপর দুই সংখ্যায় সেই গল্প ছাপা হয় দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার নারীদের পাতায়। গল্প দুটি লিখেছিলেন তার নিজের নামের সঙ্গে মায়ের নাম মিলিয়ে ‘আসিয়া আখতার’ নামে। ক্লাস এইট থেকে ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে ফার্স্ট ইয়ারে পড়া পর্যন্ত লিখেছিলেন বড়দের উপযোগী ১১৩টি ছোটগল্প এবং চারটি উপন্যাস। সেই লেখাগুলো বছর তিনেক পর তিনি ছিঁড়ে ফেললেন। খুঁজতে থাকলেন সৃজনশীলতার নতুন আনন্দ। জেগে উঠল লেখার নতুন বাসনা। আসিয়া আখতার নামটি বদলে দিয়ে ‘আখতার হুসেন’ নামেই শুরু করলেন লেখালেখি।
লেখালেখির ইচ্ছেটা জেগেছিল ক্লাস ফোরে পড়ার সময় থেকে। বাবার দেওয়া ‘আঙ্কেল টমস কেবিন’ বইটি উপহার পেয়ে প্রবল উৎসাহ নিয়ে তিনি ডুবে যান লেখার ভুবনে। লিখতে এসে অর্জন করেছিলেন আশ্চর্য রকম অভিজ্ঞতা, যা একজন লেখকের জন্য বিশাল প্রাপ্তি এবং আনন্দের বিষয়।
তখন তিনি জার্মানি থেকে ফিরেছেন দেশে। ১৯৮৬ সালের কথা। তার হাতে কাজকর্ম নেই। একদিন পরিচিত একজন তাকে জানালেন, পাসপোর্ট ভিসা ছাড়াই ভারত যাওয়ার ব্যবস্থা করে দেবেন। জীবিকার প্রয়োজনে তিনি রাজি হলেন। তখন অবৈধভাবে ভারত থেকে শাড়ি-কাপড় আনা-নেওয়া করত একদল চোরাকারবারি। তাদের সঙ্গে তাকেও পাঠিয়ে দেওয়া হলো। সঙ্গে ছিল চোরাকারবারি দলের কয়েকজন সদস্য। গ্রামের পথ পেরিয়ে, ঝোপঝাড় ঘেরা মাঠ পেরিয়ে তারা হাঁটতে লাগলেন। চাঁপাইনবাবগঞ্জের একটা সীমান্ত এলাকায়। তখন দুপুর। একটা ঝোপঝাড়ের পাশে এসে বিশ্রাম নিতে লাগলেন। অনেক ক্ষুধার্ত। পকেটে তেমন টাকাপয়সা নেই। খাবারও নেই।
হঠাৎ শুনতে পেলেন একদল শিশু ছন্দ-সুরে বলছে, ‘হ্যারে! খবরটা কি উড়ো?’
চমকে উঠলেন তিনি। কান খাড়া করে আবারও শুনলেন। হ্যাঁ, সত্যি সত্যি শিশুরা একসুরে বলছে, ‘হ্যারে! খবরটা কি উড়ো?’
শব্দটা যেদিক থেকে আসছিল, আখতার হুসেন সেদিক হাঁটতে শুরু করলেন। হাঁটতে হাঁটতে একটু দূরে গিয়ে দেখলেন একটি স্কুল। ক্লাস টুর শিক্ষার্থীরা পড়ছে, ‘হ্যারে! খবরটা কি উড়ো?’
তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না। ঢুকে পড়লেন ক্লাসে।
টিচারকে বললেন, ‘আপনি যে ছড়া পড়াচ্ছেন, সেটি আমি লিখেছি।’
টিচার আখতার হুসেনের দিকে বিস্ময়ভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকালেন। বললেন, ‘পাগল নাকি!’
তিনি বললেন, ‘আমি পাগল না, আমি লেখক। এই ছড়া আমি লিখেছি।’
ছাত্ররা হো হো করে হেসে উঠল।
টিচার বললেন, ‘ঠিক আছে, এটা যে আপনার ছড়া, তার প্রমাণ দিতে হবে। পুরো ছড়াটা বলেন, কী লিখেছিলেন?’
তিনি গড়গড় করে ছড়াটি মুখস্থ বললেন—
‘হ্যাঁ রে খবরটা কি উড়ো?
শুনতে পেলাম নিখিলপুরে চার-চারটে বুড়ো
কাঁদেন কেবল লাগিয়ে চোখে শুকনো মরিচ গুঁড়ো।
আরে, কি বললি দূরো
খাবার সময় খায় কি জানিস? বিশটা রুইয়ের মুড়ো
বয়স ওদের জানিস কত? আটশ নাকি পুরো।
হ্যাঁ রে খবরটা কি উড়ো?’
বলা শেষ হলে সবাই হাততালি দিয়ে উঠল। টিচার আখতার হুসেনকে নিয়ে গেলেন হেডমাস্টারের রুমে। হেডমাস্টার তার পরিচয় জানতে পেরে লেখক হিসেবে তাকে সম্মান করলেন। বললেন, ‘চলেন আমার বাড়িতে। দুপুরে খাবেন।’
আখতার হুসেন বললেন, ‘আমার সঙ্গে আরও অনেকে আছে।’
হেডমাস্টার বললেন, ‘নিয়ে আসেন।’
তারপর যা ঘটল— চোরাকারবারির ওই দলের সদস্যদের নিয়ে হেডমাস্টারের বাসায় দুপুরের খাবার খেলেন তারা। লেখক জীবনের এই স্মৃতি আখতার হুসেনের সব বেদনা ভুলিয়ে দিয়েছিল। তখন শুধু অনুভব করেছিলেন লেখক জীবনের অপার আনন্দ।
আখতার হুসেনের প্রথম ছড়া ছাপা হয় আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী সম্পাদিত অর্ধসাপ্তাহিক ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকায়। বাবার চাকরির সূত্রে তখন তিনি থাকতেন কুলাউড়ায়। ১৯৬৫ সালের কথা। সোনার বাংলার ছোটদের পাতা সম্পাদনা করতেন শিশুসাহিত্যিক রফিকুল হক, পরবর্তীকালে যিনি দাদুভাই নামে খ্যাত হন ছোটদের পত্রিকা ‘কিশোর বাংলা’ সম্পাদনা করতে গিয়ে।
১৯৭০ সালে প্রকাশিত হয় আখতার হুসেনের প্রথম বই। ছোটদের উপযোগী বইটির নাম ‘সমুদ্র অনেক বড়’। দ্বিতীয় বইটি ছিল ছড়ার। নাম ‘হালচাল’। তার অন্যান্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে— গল্পের বই ‘সমুদ্র অনেক বড়’, ‘রামধনুকের সাঁকো’, ‘দি টাইগার ও অন্যান্য গল্প’, ‘যেতে যেতে যেতে’, ‘হইটি টেইটি টই’, ‘পাজি বেড়ালের শাস্তি’; অনুবাদ গল্পের বই ‘সাত সাগরের পার ও নির্বাচিত কিশোর গল্প’; ছড়ার বই ‘উল্টাপাল্টা’, ‘হালচাল’, ‘সোনায় মোড়া ছড়া’, ‘এক ছড়া ছড়া’; কিশোর কবিতার বই ‘হৈ হৈ রে রে’, ‘প্রজাপতি ও প্রজাপতি’, ‘আমার দুটো ডানা’, ‘ও হাওয়া ও হাওয়া’, ‘সেই যে আমার প্রাণের মিতে নদী’, ‘কেমন আছ আমার বাংলাদেশ’, ‘সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি’, ‘কাজে হব বড়’, ‘কুট কুট কুট্টুস ফুট ফুট ফুট্টুস’; উপন্যাস ‘ফ্রিডম ফাইটার’, ‘নায়ের ছোট্ট মাঝি’, ‘ঝর্ণকুসুম ও কালোপাখার প্রজাপতি’; নাটিকা ‘খেলাঘরের পুতুলগুলো’; জীবনী ‘ছোটদের চারণ কবি মুকুন্দদাস’, ‘ছোটদের জাতির জনক’, ‘ছোটদের জোয়ান অব আর্ক’, ‘ছোটদের মণি সিংহ’ প্রভৃতি।
তার জন্ম ১৯৪৫ সালের ১ নভেম্বর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার আমনুরায়। রেলকর্মচারী বাবার কর্মস্থল সে সময় ছিল সেখানে। তাই শৈশব-কৈশোরকাল কেটেছে রেল কলোনিতে। তার দাদার বাড়ি নাটোর জেলার লালপুর উপজেলাধীন নুরুাল্লাপুর গ্রামে। তিনি শিক্ষাজীবন পার করেন খুলনা, পাকশী, আমনুরা, গফরগাঁও ও ময়মনসিংহে।
তিনি কবি। কীর্তিমান শিশুসাহিত্যিক। ছড়াকার। তার কবিত্ব শক্তি দিয়ে লিখেছেন মানুষের জন্য, দেশের জন্য।



