কথা বলা লাল-নীল সাইকেল

অলংকরণ করেছেন রজত
এক সাইকেলের দুই চাকা, আরেকটির
চারটি। ওরা আবার কথা
বলতেও জানে। সেই গল্প লিখেছেন
ফারহানা মান্নান
বিকেলবেলা। পাশাপাশি দুই বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে আছে দুটি সাইকেল।
একটি ছোট্ট লাল সাইকেল। তার চারটি চাকা। সামনে দুটি নয়, পেছনের বড় চাকার দুই পাশে ছোট্ট দুটি সাপোর্ট চাকা।
অন্যটি নীল সাইকেল। একটু বড়সড়। তার মাত্র দুটি চাকা।
লাল সাইকেলটি অনেকক্ষণ ধরে নীল সাইকেলের দিকে তাকিয়ে ছিল। হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, ‘এই যে নীল ভাই, তোমার বাকি দুই চাকা কোথায়?’
নীল সাইকেল একটু অবাক হয়ে বলল, ‘বাকি দুই চাকা মানে?’
‘ওই যে! আমার তো চারটি চাকা। তোমার মাত্র দুটি! বাকি দুটি হারিয়ে ফেলেছ নাকি?’
নীল সাইকেল হো হো করে হেসে উঠল। ‘আরে বোকা, ওগুলো সাপোর্ট চাকা। আমারও আগে ছিল। এখন আর লাগে না।’
লাল সাইকেল অবাক। ‘লাগে না মানে? যদি পড়ে যাও!’
নীল সাইকেল আবার হো হো করে হেসে উঠল। ‘না না, পড়ে যাব কেন? আমি ভারসাম্য বজায় রেখে চলি।’
‘ভারসাম্য? এটি আবার কী?’
‘ভারসাম্য হলো এমন একটি ব্যাপার, যার জন্য চলার সময় আমি একদিকে হেলে পড়ে যাই না।’
লাল সাইকেল কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর নিজের সাপোর্ট চাকা দুটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তাহলে আমার এই ছোট্ট চাকা দুটির কী হবে?’
কথাটা শেষ হতে না হতেই পেছন থেকে কে যেন চেঁচিয়ে উঠল, ‘কী হবে মানে? আমাদের কী হবে?’
লাল সাইকেল চমকে উঠল। ‘কে? কে কথা বলছে?’
‘আমরা! তোমার দুই পাশের দুই চাকা!’
লাল সাইকেল অবাক হয়ে বলল, ‘ওমা, তোমরাও কথা বলতে পারো?’
ডান পাশের চাকাটা একটু গম্ভীর হয়ে বলল, ‘কেন পারব না? সারা দিন তোমাকে সামলে রাখি আর আমাদের কথাই জানো না!’
বাঁ পাশের চাকাটা বলল, ‘এই তো সেদিন তোমার ছোট্ট মালিক বাঁদিকে হেলে পড়ছিল। কে সামলেছিল, শুনি?’
‘তুমি’— বলল লাল সাইকেল।
‘আর গতকাল ডানদিকে হেলে পড়ছিল যখন? তখন কে ধরেছিল?’— ডান পাশের চাকা জিজ্ঞেস করল।
‘তুমিই তো!’
দুই সাপোর্ট চাকা একসঙ্গে বলে উঠল, ‘তাহলে আমাদের কাজ নেই কে বলল?’
নীল সাইকেল এতক্ষণ চুপচাপ সব শুনছিল। এবার সে বলল, ‘আরে, তোমরা রাগ করছ কেন? তোমাদের কাজ তো খুবই গুরুত্বপূর্ণ!’
‘তাহলে তোমার সঙ্গে আমাদের মতো দুটি চাকা নেই কেন?’— বাঁ পাশের চাকা জানতে চাইল।
নীল সাইকেল বলল, ‘কারণ আমার মালিক এখন সাইকেল চালানো শিখে গেছে। আগে তোমাদের মতো দুটি চাকা আমারও ছিল। তারপর একদিন ওগুলো খুলে দেওয়া হলো।’
লাল সাইকেল একটু চিন্তিত হয়ে বলল, ‘তার মানে একদিন আমারও সাপোর্ট চাকা দুটি খুলে ফেলা হবে?’
‘হ্যাঁ, হতে পারে।’
‘তাহলে ওরা কোথায় যাবে?’
এবার দুই সাপোর্ট চাকা একেবারে চুপ। কেউ কোনো কথা বলছে না। একটু পর ডান পাশের চাকাটা মন খারাপ করে বলল, ‘তাহলে কি আমাদের আর ঘোরা হবে না?’
নীল সাইকেল বলল, ‘কে বলেছে? তোমরা তো অন্য কোনো ছোট্ট সাইকেলকে সাহায্য করতে পারো।’
‘সত্যি?’— দুই চাকা একসঙ্গে বলে উঠল।
‘অবশ্যই।’
ওরা গল্প করছে, ঠিক তখনই বাড়ির ভেতর থেকে নীল সাইকেলের মালিক বেরিয়ে এলো। ‘এই যে, আমার নীল সাইকেল। চলো, আজ একটু ঘুরে আসি।’
নীল সাইকেল লাল সাইকেলকে বলল, ‘আচ্ছা, আজ তাহলে চলি।’
কিন্তু লাল সাইকেল হঠাৎ বলে উঠল, ‘দাঁড়াও! দাঁড়াও! আমার আরেকটি প্রশ্ন আছে।’
‘আবার কী?’
‘তুমি যদি ভারসাম্য রাখতে পারো, তাহলে দাঁড়িয়ে আছো কীভাবে? তোমাকে তো দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে রাখা হয়েছে।’
নীল সাইকেল একেবারে চুপ। ডান পাশের চাকা খিলখিল করে হেসে উঠল। বাঁ পাশের চাকাটাও হাসতে হাসতে বলল, ‘কী হলো নীল ভাই? এবার তোমার ভারসাম্য কোথায় গেল?’
নীল সাইকেল একটু লজ্জা পেয়ে বলল, ‘আরে, চলার সময় ভারসাম্য রাখা আর দাঁড়িয়ে থাকা কি এক কথা নাকি?’
লাল সাইকেল অবাক হয়ে বলল, ‘ওমা, এত নিয়ম!’
নীল সাইকেল বলল, ‘হ্যাঁ! কথা হবে।’
বলেই নীল সাইকেল তার মালিককে নিয়ে গড়িয়ে চলল— ঘররর... ঘররর... ঘররর...। লাল সাইকেল তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের সাপোর্ট চাকা দুটিকে বলল, ‘শোনো, তোমরা কিন্তু এখনই কোথাও যাবে না। আমার এখনো তোমাদের দরকার।’
দুই সাপোর্ট চাকা একসঙ্গে বলে উঠল, ‘আমরাও তো সেটাই বলছি।’ তারপর তিনজন একসঙ্গে হেসে উঠল— খিলখিল! খিলখিল!



