পরমহিতৈষী

অলংকরণ করেছেন রজত
তিনি ছিলেন আমাদের প্রিয়জন, বন্ধু ও আন্দোলন-সংগ্রামের সাথি। বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে বয়োজ্যেষ্ঠ বলে তাকে আমরা সারথি হিসেবে মেনে নিয়েছিলাম। গত শতাব্দীর আশি ও নব্বই দশকে আমরা শুধু লেখালেখি নিয়ে মেতেছিলাম। শিশুসাহিত্যিক সুজন বড়ুয়া আর আমি ছিলাম সবসময় আখতার হুসেনের সঙ্গে একাত্ম। কি লেখালেখি, কি আন্দোলন-সংগ্রাম; কখনো কেউ কারও কাছছাড়া হতাম না। এমনও দেখা গেছে, কোনো একটা বিষয় ধরে আমরা লেখালেখি শুরু করতাম। যার লেখাটি ভালো হতো, সেই লেখাই প্রকাশ করতে দিতাম। বাকি লেখা ঝুড়িতে ফেলে দিতাম। এই ছিল আমাদের কাজ। ১৯৯২ সালে আমরা তিনজন যৌথ উদ্যোগ নিয়ে ‘বাংলাদেশের বাছাই কিশোর কবিতা’ নামে একটি সংকলন করেছিলাম।
তিনি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। যখন জানলেন, আমার মা-ও মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তখন সিদ্ধান্ত নিলেন আমাদের বাড়িতে যাওয়ার। ১৯৯১ সালে একটা অনুষ্ঠান উপলক্ষে আমার সঙ্গে চট্টগ্রামে গেলেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অনুষ্ঠানের আগে তাকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে গেলাম। দেখামাত্রই তিনি আমার মায়ের পায়ে পড়ে গেলেন এবং ‘মা’ সম্বোধন করলেন। তার এই আবেগ দেখে আমরা খুব হকচকিত হয়ে গেলাম। তিনি আমার মায়ের সঙ্গে অনেকক্ষণ কথা বললেন। একপর্যায়ে মা তাকে বললেন, ‘তোমার এই ছোট বন্ধু ১৯৭১ সালের অগ্নিময় দিনে আমাদের একান্ত সহযোগী ছিল। তখন সে পড়ত ক্লাস সেভেনে। কিন্তু তার কাণ্ডকারখানা দেখে মনে হতো, সে দস্তুরমতো একজন সম্পন্ন মুক্তিযোদ্ধা।’ এসব শুনেই আখতার হুসেন চোখ বড় বড় করে রইলেন।
খাওয়া-দাওয়া করে বাসা থেকে বের হওয়ার পর আমার কাঁধে হাত রেখে হাঁটতে থাকলেন। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কাঁধে হাত দিয়ে রেখেছেন কেন?’
তিনি বললেন, ‘এমন একটা বীর সন্তানের কাঁধে হাত দেওয়াও তো ভাগ্যের ব্যাপার। আমি আমার ভাগ্যকে ঝালাই করে নিচ্ছি।’
এর পর থেকে আমাদের যোগাযোগ কখনোই ছিন্ন হয়নি। তিনি অসুস্থ ছিলেন জীবনের শেষ ভাগে। তবুও মনে হয়, বড় তাড়াহুড়ো করে চলে গেলেন। গত ২৪ সেপ্টেম্বর গভীর রাতে আমাদের ঘুমিয়ে রেখে দেশের শিশুসাহিত্যের অন্যতম পুরোধা ছড়াকার, কথাকার ও গীতিকার আখতার হুসেন না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
ছয় দশক ধরে মজার মজার ছড়া লিখে তিনি শিশুদের মন অনাবিল আনন্দে ভরিয়ে দিয়েছেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে তার কলম হয়ে উঠেছিল অস্ত্র। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত তার লেখায় এবং সুরকার অজিত রায়ের সুরে শিল্পী তিমির নন্দীর গাওয়া সেই কালজয়ী গান ‘স্বাধীন স্বাধীন দিকে দিকে জাগছে বাঙালিরা, আজ রুখবে তাদের কারা’ চিরকাল জাতির গৌরবের ইতিহাসের সঙ্গে অচ্ছেদ্য হয়ে থাকবে; অনুপ্রাণিত করবে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে।
আখতার হুসেনের ছড়ার ভাষা ছিল সহজ, প্রাণবন্ত ও স্বাভাবিক। তিনি প্রায় ছয় দশকের বেশি সময় ধরে শিশু-কিশোরদের জন্য লিখেছেন। তার ছড়া ও শিশুতোষ মৌলিক গ্রন্থ, জীবনী, অনুবাদ, সম্পাদিত গ্রন্থসহ প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। ব্যক্তিজীবনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত আন্তরিক, সুহৃদ, সদা হাস্যোজ্জ্বল, নির্লোভ এবং ছড়ার মতোই সহজ-সরল মানুষ।



