পুলিশের ডায়েরি
বশিকপুরের রক্তস্নাত সন্ধ্যা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
এক দশক আগে ফেনীতে ঘটা জোড়া খুনের রহস্যভেদের গল্প বলেছেন পুলিশ কর্মকর্তা আদনান মনজু
২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর। শীতের এক কনকনে গোধূলি। ফেনীর ফুলগাজী থানার ওয়্যারলেসে ভেসে এলো এক লোমহর্ষক সংবাদ— ফুলগাজীর বশিকপুর গ্রামের এক জনমানবহীন নিভৃত পল্লীর বাড়িতে মা ও শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে।
বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে ফোর্স নিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটলাম ঘটনাস্থলের দিকে। ততক্ষণে খবর পৌঁছে গেছে পুলিশ সুপারসহ ঊর্ধ্বতন মহলে। ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখলাম, অজপাড়াগাঁয়ের ছোট্ট সেই বাড়িটির চারপাশে শত শত কৌতূহলী ও আতঙ্কিত মানুষের ভিড় জমে গেছে। বাড়ির ভেতরে ঢুকে মর্মান্তিক সেই দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে রক্ত হিম হয়ে এলো। টিনের ঘেরা ঘরটার ভেতরে খাটের ওপর তোশকে মোড়ানো দুটি মরদেহ। শুধু মায়ের দুটি পা বাইরে ঝুলে আছে। বাচ্চাটার বয়স একেবারেই কম।
নিহতরা নারী হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে নারী পুলিশ এনে শুরু হলো সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির কাজ। এটি যে এক নিখুঁত ‘ক্লুলেস ডাবল মার্ডার’, তা বুঝতে বিন্দুমাত্র দেরি হলো না। শুরু হলো গোয়েন্দা নজরদারি। কে বা কারা ঘটাতে পারে এমন পৈশাচিক কাণ্ড? এই এলাকা এবং আশপাশের যেসব মানুষের অতীত বিভিন্ন ধরনের খারাপ কাজের রেকর্ড আছে, তালিকা করে অনুসন্ধান শুরু হলো। এর মধ্যেই ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছালেন পুলিশ সুপার ও জেলা প্রশাসক।
শুরু হলো ম্যারাথন অপারেশন। কয়েকজন সন্দেহভাজনকে তুলে আনা হলো থানায়। এদিকে, নিথর দেহ দুটি ময়নাতদন্তের জন্য জেলা সদর হাসপাতালে পাঠানো হলো। রিমান্ডে এনে সন্দেহভাজনদের জেরা করা হলো ঘণ্টার পর ঘণ্টা; কিন্তু কোনো কূলকিনারা মিলল না। ভিকটিমের শোকার্ত আত্মীয়স্বজনও কোনো ক্লু দিতে পারলেন না। বশিকপুরের ওই বাড়িটি ছিল অনেকটা আলাদা— ডানে-বাঁয়ে শ খানেক গজ দূরত্বে কোনো বসতি নেই, একেবারে নির্জন দ্বীপের মতো। হতাশায় আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেল।
বশিকপুরের ওই বাড়িটি ছিল অনেকটা আলাদা— ডানে-বাঁয়ে শ খানিকটা গজ দূরত্বে কোনো বসতি নেই
হঠাৎ আঁধারে আলোর রেখা নিয়ে এলো এক গোপন গোয়েন্দা সূত্র। গ্রামেরই এক ভবঘুরে যুবককে মাঝেমধ্যে এই বাড়ির আশপাশে দেখা গেছে। এমনকি ভেতরেও ঢুকতে দেখেছে কেউ কেউ। তরুণ বেকার। তবে পরিবারটি বেশ সম্ভ্রান্ত, শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত। নেশাগ্রস্ত হয়ে সে দিন-রাত গ্রামের অলিগলিতে উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়াত। খতিয়ে দেখা গেল তার অতীত। একসময় ঢাকা কলেজের মেধাবী ছাত্র ছিল সে, কিন্তু সর্বনাশা মাদকের ছোবলে সব হারিয়ে এখন গ্রামের বাড়িতে একা পড়ে থাকে।
তাকে পাকড়াও করতে জাল পাতা হলো। পার্শ্ববর্তী থানায় তার শ্বশুরবাড়িতে পর্যন্ত আকস্মিক রেড দিলাম, কিন্তু চতুর সেই যুবককে ধরা গেল না। বাতাসে বাতাসে সেও টের পেয়ে গেল যে পুলিশ তাকে খুঁজছে। তবুও নাছোড়বান্দা হয়ে দিন-রাত চিরুনি অভিযান চালিয়ে অবশেষে তাকে জালে তুলতে সক্ষম হলাম।
আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে এনে শুরু হলো মনস্তাত্ত্বিক চাপ ও জিজ্ঞাসাবাদ। সে পাথরের মতো ঠোঁট টিপে রইল, মুখের টুঁ শব্দটিও বের করা গেল না। মনে হচ্ছিল, রহস্যের ঘূর্ণাবর্তে হারিয়ে যাচ্ছি আমরা। রিমান্ডের অন্ধকার সেল। গভীর রাত। হঠাৎ প্রহরারত সেন্ট্রির চিৎকার— ‘স্যার, আসামি কথা বলতে চায়! সে আপনার সঙ্গে সরাসরি কথা বলতে চায়। বলছে, ওসি স্যারকে ডাকুন!’
দৌড়ে গেলাম লকআপের সামনে। তাকে সোজা নিয়ে আসা হলো আমার অফিসকাজে বসার চেয়ারটিতে। শান্ত স্বরে বললাম, ‘কী বলতে চাও বলো?’
ঝড়ের বেগে বাঁধভাঙা নদীর মতো সে গড়গড় করে নিজের অপরাধের বয়ান দিতে শুরু করল। স্বীকার করল, এই জোড়া খুন সে-ই করেছে। তবে এর পেছনে কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছিল না। এটি ছিল এক আকস্মিক দানবীয় উন্মাদনা!
সে প্রায়ই ওই বাড়ির সীমানায়, কখনো ঘরের ভেতরেও ঢুকেছে। ঘটনার দিন দুপুরবেলা ভবঘুরে সেই যুবক সুযোগ বুঝে বাড়িতে ঢোকে। দেখে, তরুণী গৃহবধূ রান্নায় ব্যস্ত; পাশে তার ছোট্ট শিশুটি খেলা করছে। পৈশাচিক খামখেয়ালে সে শিশুটিকে একটি চকলেটও দেয়। এরপর লালসা গ্রাস করে তাকে। নারীটিকে সে কুপ্রস্তাব দিয়ে বসে।
নারীটি রাজি তো হলোই না, উল্টো রান্নাঘরের একপাশে রাখা কাঠের লাঠি দিয়ে ওই যুবককে সজোরে আঘাত করে বসে। আত্মরক্ষার সেই আঘাতে মুহূর্তেই হিংস্র হয়ে ওঠে সে। ঘরের কোণে পড়ে থাকা শিলপাটার ভারী শিলটি তুলে সোজা নিশানা করে ছুড়ে মারে নারীর দিকে। কিন্তু তিনি সরে যাওয়ায় সেই প্রাণঘাতী শিল গিয়ে সজোরে আঘাত করে পাশে থাকা অবুঝ শিশুটির মাথায়! মুহূর্তের মধ্যে মাথা ফেটে নিস্তেজ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে শিশুটি। চিরতরে থেমে যায় ছোট্ট প্রাণটা।
মায়ের চোখের সামনেই সন্তানের এই মর্মান্তিক মৃত্যু! ক্ষোভে, কান্নায় ও আতঙ্কে পাগলপ্রায় মা যখন উন্মত্তের মতো চিৎকার শুরু করেন, তখন ধরা পড়ার ভয়ে জান্তব হয়ে ওঠে সেই যুবক। সে শিলপাটা দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করতে থাকে গৃহবধূকে। মুহূর্তের মধ্যে থেঁতলে যায় মাথা; নিভে যায় দুটি তাজা প্রাণ। এরপর ঠান্ডা মাথায় তাদের নিথর দেহগুলো শয়নকক্ষের খাটের ওপর তোশকে পেঁচিয়ে রেখে নির্বিকারভাবে পালিয়ে যায়।
নরপিশাচের এই স্বীকারোক্তির পর সে কথা দিল, আদালতের বিচারকের সামনেও সে স্বেচ্ছায় এই জবানবন্দি প্রদান করবে। এভাবে নিখুঁত গোয়েন্দাগিরি আর ক্লান্তিহীন ধৈর্যের জোরে সেদিন উন্মোচিত হয়েছিল এক অবর্ণনীয় ডাবল মার্ডারের পৈশাচিক রহস্য।
(লেখক ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন)





