প্রশ্ন ফাঁসের পোস্টমর্টেম

আঁকা : সোহানুর রহমান
এক দল অসৎ ব্যক্তির কারণে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় মেধার বদলে উতরে যাওয়ার মাধ্যম হয়ে উঠেছিল জালিয়াতি ও টাকা। লিখেছেন আখলাকুজ্জামান অনিক
ফার্মগেটের এক অন্ধকার গলির পুরনো মেসবাড়িতে টিমটিম করে লাল আলো জ্বলছিল। টেবিলের ওপর সুবিন্যস্ত ক্রেডিট কার্ড আকৃতির ১০টি ডিজিটাল ডিভাইস, যার পাশেই প্লাস্টিকের কৌটায় রাখা ছিল মানুষের শরীরের রঙের সঙ্গে মিলে যাওয়া অতিক্ষুদ্র কিছু ইয়ারপিস। বাইরে তখন গভীর রাতের নিস্তব্ধতা। সেই গোপন ঘরে বসে তৈরি হচ্ছিল দেশের সবচেয়ে সুরক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার মেধা চুরির এক ভয়ংকর চক্রান্ত।
কুড়িগ্রামের এক ধূলিধূসর গ্রাম থেকে উঠে আসা তরুণ রাফসান (ছদ্মনাম) তখন চোখের জল আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল। বাবা অবসরপ্রাপ্ত প্রাইমারি শিক্ষক, মা গৃহিণী। নিজের জমানো শেষ সম্বলটুকু আর মায়ের একমাত্র সোনার গয়নাটি বন্ধক রেখে ছেলেকে ঢাকায় পাঠিয়েছিলেন ভর্তি পরীক্ষার কোচিং করাতে। টানা সাতটা মাস রাফসান সূর্য ওঠার আগে পড়তে বসেছে, গভীর রাতে টেবিলের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ঘ’ ইউনিটের একটি আসনই ছিল তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ‘গোল্ডেন এ-প্লাস’ পাওয়া রাফসানের ভর্তি পরীক্ষা চমৎকার হয়েছিল। কিন্তু ফল প্রকাশের দিন যেন তার মাথায় বাজ পড়ল; মেধা তালিকায় রাফসানের নাম নেই, এমনকি অপেক্ষমাণ তালিকাতেও সে ঠাঁই পায়নি!
অথচ একই ইউনিটে পরীক্ষা দিয়েছিল রাফসানের কলেজ ক্লাসমেট ফাহিম (ছদ্মনাম)। ধনাঢ্য বাবার বিগড়ে যাওয়া সন্তান ফাহিম বইয়ের চেয়ে ক্লাবের আড্ডাতেই সময় কাটিয়েছে বেশি। টেস্ট পরীক্ষাতেও যার নাম কাঁচুমাচু করে পাস মার্কসের তালিকায় উঠেছে, সেই ফাহিম নাকি ঢাবির ভর্তি তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করে বসেছে! রাফসানদের মতো হাজারো পরিশ্রমী মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থীর বুকের ওপর পা দিয়ে ফাহিমরা রাতারাতি ‘মেধাবী ছাত্র’ বনে গিয়েছিল। বাইরে থেকে এই অলৌকিক সফলতা দেখে সাধারণ মানুষ হতবাক হলেও এর নেপথ্যে লুকিয়ে ছিল কোটি কোটি টাকার এক সুসংগঠিত আন্তর্জাতিক ধাঁচের ডিজিটাল ক্রাইম সিন্ডিকেট।
পরীক্ষার্থীর কানের ভেতরে বিশেষ চিমটা দিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো শিমের বিচির চেয়েও ছোট এক অদৃশ্য ইয়ারপিস
কীভাবে চলত মেধা চুরির এই জাদুকরী কারখানা? সিআইডির তদন্তে বেরিয়ে আসা তথ্য অনুযায়ী, সিন্ডিকেটের মূল অপারেশন চলত দুটি রোমাঞ্চকর ও নিখুঁত উপায়ে।
প্রথম উপায়টি ছিল অন্ধকার অপরাধের মতো পুরনো ধাঁচের— সরাসরি প্রেস থেকে প্রশ্ন চুরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্ন ছাপানো হতো রাজধানীর ইন্দিরা রোডের একটি সুরক্ষিত ছাপাখানায়। সব ধরনের নিরাপত্তাবলয় টপকে টাকার লোভে পড়ে যায় ওই প্রেসের অসাধু কয়েকজন কর্মচারী। পরীক্ষার আগের গভীর রাতে, চারপাশ যখন একদম নিস্তব্ধ, তখন প্রেসের ভেতরের অন্ধকার কুঠুরি থেকে প্রশ্নের মূল কপি পাচার হয়ে যেত চক্রের মূল হোতাদের হাতে। সেখান থেকে রাতেই গোপন আস্তানায় চুক্তিবদ্ধ পরীক্ষার্থীদের ডেকে এনে ৫ থেকে ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে পুরো প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করানো হতো। সকালে তারা যখন পরীক্ষার হলে ঢুকত, তখন তাদের মাথায় মেধা নয়, থাকত মুখস্থ করা চুরির উত্তর।
আর যাদের রাতের বেলা আগে থেকে প্রশ্ন দেওয়া সম্ভব হতো না, তাদের জন্য চক্রটি সাজিয়েছিল জেমস বন্ডের সিনেমার মতো হাইটেক ডিজিটাল ফাঁদ। তারা চীন থেকে গোপনে বিশেষ একধরনের ইলেকট্রনিক ডিভাইস দেশে আনাত, যা দেখতে অবিকল ব্যাংক কার্ড বা মাস্টারকার্ডের মতো। এই কার্ডের ভেতরেই লুকানো থাকত একটি অতিক্ষুদ্র সিমকার্ড ও স্বয়ংক্রিয় ব্যাটারি। আর পরীক্ষার্থীর কানের ভেতরে বিশেষ চিমটা দিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো শিমের বিচির চেয়েও ছোট এক অদৃশ্য ইয়ারপিস।
পরীক্ষা শুরু হওয়ার ঠিক ৫ থেকে ১০ মিনিটের মাথায় হল থেকে অসৎ উপায়ে স্মার্টফোনে প্রশ্নপত্রের ছবি তুলে বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। বাইরে প্রস্তুত থাকত বুয়েট ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপথগামী কিছু তুখোড় শিক্ষার্থী। তারা নিমেষে প্রশ্নের সমাধান করে সেই মাস্টারকার্ড ডিভাইসে কল দিত। অটো-রিসিভ হয়ে যাওয়া ফোনে বাইরে থেকে এক এক করে বলে দেওয়া হতো একের পর এক সঠিক উত্তর। কানের ভেতরের ইয়ারপিস দিয়ে পরীক্ষার্থী উত্তর শুনে কেবল ওএমআর শিটের বৃত্ত ভরাট করত। হলের সতর্ক পরিদর্শকরা চোখের সামনে পাহারা দিলেও টেরও পেতেন না যে, কানের ভেতর আড়ালে থাকা এক অদৃশ্য কেউ পরীক্ষার্থীকে ঢাবিতে পাসের গোপন সংকেত পাঠাচ্ছে!
কিন্তু অপরাধ যতই নিখুঁত হোক না কেন, তার পেছনে কোনো না কোনো সুতা রয়েই যায়। ২০১৭ সালের ২০ অক্টোবর, ঢাবির ‘ঘ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার ঠিক আগের রাত। সিআইডির চৌকস টিমের কাছে আসে এক গোপন ফোনকল। সময় নষ্ট না করে রাত সাড়ে ৩টায় সিআইডির বিশেষ স্কোয়াড একযোগে অভিযান চালায় রাজধানীর বিভিন্ন গোপন আস্তানা, আবাসিক হোটেল এবং ঢাবির দুটি আবাসিক হলে।
দরজা ভেঙে যখন সিআইডি অফিসাররা ঘরে ঢোকেন, তখন জালিয়াত চক্রের মাস্টারমাইন্ডদের মুখ ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে যায়। টেবিল থেকে বাজেয়াপ্ত করা হয় ডজন ডজন হাই-টেক ডিজিটাল মাস্টারকার্ড ডিভাইস, কানের ভেতর ঢোকানোর অদৃশ্য ইয়ারপিস, কয়েক লাখ নগদ টাকা, চেকের পাতা এবং ছাপাখানা থেকে পাচার হয়ে আসা আসল প্রশ্নপত্রের অবিকল কপি। হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয় জালিয়াতি চক্রের মূল কুশীলবদের। রাজধানীর শাহবাগ থানায় দায়ের হয় দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত ভর্তি জালিয়াতির মামলা।
সিআইডির প্রায় সাড়ে তিন বছরের ম্যারাথন অনুসন্ধানে থলের ভেতর থেকে বের হয়ে আসে ভয়ংকর সব তথ্য। চক্রটি শুধু বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষাই নয়; বিভিন্ন সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষাতেও একইভাবে প্রশ্ন ফাঁস করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল। সিআইডি তদন্ত শেষে আদালতে ১২৫ জনের বিরুদ্ধে একটি বিশালাকার চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিল করে। আর চার্জশিটের সবচেয়ে চোখ কপালে ওঠার মতো থমথমে তথ্যটি ছিল— অভিযুক্ত ১২৫ জনের মধ্যে ৮৭ জনই ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন শিক্ষার্থী! মামলার বিচার গড়ায় সাইবার ট্রাইব্যুনাল ও ঢাকার বিচারিক আদালতে। ১৯৮০ সালের পাবলিক পরীক্ষা (অপরাধ) আইনের আওতায় শুরু হয় ঐতিহাসিক বিচারকাজ। দীর্ঘ যুক্তিতর্ক, সিআইডির জব্দকৃত ফরেনসিক আলামত, কানের ডিজিটাল ইয়ারপিস পরীক্ষা এবং বহু সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণের পর অবশেষে উন্মোচিত হয় অপরাধের চূড়ান্ত হিসাব। ঢাকার অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এই বহুল আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করেন।
আদালত তার ঐতিহাসিক রায়ে প্রশ্ন ফাঁস ও ডিজিটাল জালিয়াতি চক্রের ১০ জন মূল অপরাধীকে বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করেন। সরাসরি প্রশ্ন ফাঁস ও জালিয়াতির মাস্টারমাইন্ড হিসেবে সাতজনকে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং জালিয়াতিতে সহায়তা করার দায়ে তিনজনকে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। রায় ঘোষণার সময় অভিযুক্ত ১০ অপরাধীই আত্মগোপনে থাকায় আদালত তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে সাজা পরোয়ানা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও গ্রহণ করে নজিরবিহীন প্রশাসনিক শুদ্ধি অভিযান। সিআইডির দেওয়া তালিকার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট জরুরি সভা ডেকে সেই ৮৭ জন ভুয়া ছাত্রকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিরতরে বা আজীবনের জন্য বহিষ্কার করে।



