অরিজিনাল সুড়ঙ্গ

আঁকা : সোহানুর রহমান
মাটির নিচে স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারের ভেতরে টুংটাং শব্দে কাটা হচ্ছিল এক সুড়ঙ্গ। লক্ষ্য একটাই— ব্যাংকের ভল্টে রাখা কোটি কোটি টাকা! হলিউড বা বলিউডের কোনো অপরাধধর্মী রোমাঞ্চকর সিনেমার কাহিনি মনে হলেও এটি বাংলাদেশের অপরাধ ইতিহাসের এক অবিশ্বাস্য সত্য ঘটনা। লিখেছেন ইমরানুর রহমান
কিশোরগঞ্জ শহরের রথখোলা এলাকা। সেখানকার সোনালী ব্যাংক প্রধান শাখার দেয়াল ঘেঁষে একটি পুরনো দোতলা বাড়ি। বাড়িটির একটি ছোট ঘর ভাড়া নিয়েছিলেন ইউসুফ মুন্সী ওরফে হাবীব ওরফে সোহেল রানা নামের এক ব্যক্তি। পাড়া-পড়শি জানত, তিনি একজন সাধারণ ব্যবসায়ী। কিন্তু সেই সাধারণ চেহারার পেছনে লুকিয়ে ছিল এক অসামান্য মাস্টারমাইন্ড। দিনের পর দিন পরম ধৈর্য ও নিখুঁত পরিকল্পনায় নিজের ভাড়া ঘরের মেঝে থেকে সোনালী ব্যাংকের ভল্ট পর্যন্ত মাটির নিচ দিয়ে কেটে চলছিলেন দীর্ঘ এক সুড়ঙ্গ। সাধারণ কোদাল, শাবল আর জ্যাকিং সরঞ্জাম দিয়ে তৈরি সেই অন্ধকারের পথ ধরে তিনি পৌঁছে যান সোজা সোনালী ব্যাংকের কোটি টাকার ভাণ্ডারে।
২০১৪ সালের ২৬ জানুয়ারি, রবিবার। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শেষে সকাল থেকেই ব্যাংকে মানুষের আনাগোনা। বেলা যত গড়াচ্ছিল, কাজও তত জমে উঠছিল। হঠাৎ দুপুর আড়াইটার দিকে ব্যাংকের ভল্টরুমে যান দায়িত্বে থাকা দুই ব্যাংক কর্মকর্তা। নিয়ম অনুযায়ী ভল্টের ভেতরের কক্ষের দরজা খুলতেই তাদের চোখ চড়কগাছ! টেবিলের ওপর থরে থরে সাজিয়ে রাখা টাকার পাহাড় উধাও।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আবিষ্কার করলেন মেঝেতে একটি বিশাল গর্ত। চারপাশ শূন্য, অদৃশ্য ১৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা! মুহূর্তে ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কপালে জমল দুশ্চিন্তার ঘাম; ছড়িয়ে পড়ল চরম আতঙ্ক। খবর দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল সারা দেশে। ওই দিন রাতেই ব্যাংকের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) শেখ আমানুল্লাহ বাদী হয়ে কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা অপরাধীদের আসামি করে মামলা করলেন।
কিন্তু সেই সাধারণ চেহারার পেছনে লুকিয়ে ছিল এক অসামান্য মাস্টারমাইন্ড
মামলা দায়েরের পরই শুরু হয় নজিরবিহীন তদন্ত। পুলিশের তৎকালীন ওসি মো. আবদুল মালেকের পাশাপাশি ছায়া তদন্ত শুরু করে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। যে ঘরে সুড়ঙ্গ শেষ হয়েছিল, অর্থাৎ সেই ভবনের ভাড়া ঘর থেকে সূত্র ধরে শুরু হয় পিছু ধাওয়া। একের পর এক ডট মেলাতে শুরু করেন গোয়েন্দারা। তারা জানতে পারেন, লুট করা টাকা ট্রাকে করে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। অপরাধের ধরন আর সুড়ঙ্গ কাটার নিপুণতা দেখে তারা ধারণা করেন, এটি দীর্ঘদিনের পূর্বপরিকল্পিত কোনো দুর্ধর্ষ চক্রের কাজ।
ঘটনার ঠিক ৪৮ ঘণ্টার মাথায়, ২৮ জানুয়ারি দুপুরে আসে বড় সাফল্য। রাজধানীর শ্যামপুরের ‘তন্ময় ভিলা’ নামে একটি ছয়তলা বাড়িতে অভিযান চালায় র্যাব। বাড়ির একটি কক্ষের দরজা ভাঙতেই চোখ ছানাবড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। সেখানে পাঁচটি চালের বস্তায় ঠাসা ছিল সোনালী ব্যাংক থেকে লুট হওয়া টাকার বান্ডিল!
গ্রেপ্তার করা হয় সুড়ঙ্গ কাটার আসল কারিগর সোহেল রানা ও তার ছোট ভাই ইদ্রিছ মুন্সীকে। বস্তাগুলো গুনে উদ্ধার করা হয় ১৬ কোটি ১৯ লাখ ৫৬ হাজার ৬৪ টাকা! অর্থাৎ লুটের সিংহভাগ টাকাই উদ্ধার করে আনে র্যাব।
তদন্ত যত এগোচ্ছিল, এই চুরির ভেতরের চিত্রগুলো ততটাই পরিষ্কার হয়ে উঠছিল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার কদমতলীর মদিনা মসজিদসংলগ্ন সোহেলের অন্য একটি ভাড়া বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় আরও আড়াই লাখ টাকা। একই দিন পুলিশের হাতে ধরা পড়েন সোহেলের কিশোরগঞ্জের বান্ধবী মাহিলা আক্তার হিমা।
শুধু টাকা লুকানোই নয়, তা পরিবহনের ধরনও ছিল রোমাঞ্চকর। কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকায় টাকা আনার জন্য সোহেল ব্যবহার করেছিলেন চালবোঝাই একটি ট্রাক। পরে ধরা পড়ার ভয়ে চালের বস্তা ও টাকা ঢাকার শ্যামপুর থেকে আটরশির দরবার শরিফে পাঠানোর জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল একটি কাভার্ড ভ্যান। পুলিশ পরে সেই ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান দুটিও জব্দ করে।
হাইকোর্টের নির্দেশে মামলাটি পরবর্তী সময়ে হস্তান্তর করা হয় র্যাব-১৪-এর অধীনে। তৎকালীন সহকারী পরিচালক এএসপি রাজীব কুমার দেব গভীর তদন্ত শেষে প্রধান আসামি সোহেল রানা, তার ভাই ইদ্রিছ মুন্সী, কিশোরগঞ্জের স্ত্রী মাহিলা আক্তার হিমাসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট বা অভিযোগপত্র দাখিল করেন।
আদালতে নিজের অপরাধ স্বীকার করায় সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সোহেল রানাকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও পাঁচ মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেন।
কিশোরগঞ্জের এই ব্যাংক লুটের ঘটনা এতটাই নাটকীয় ছিল যে তা ঢালিউড সিনেমা নির্মাতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এ ঘটনাকে ভিত্তি করে রায়হান রাফীর পরিচালনায় নির্মিত হয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘সুড়ঙ্গ’।




