এমটিএফই জালিয়াতি

পঞ্জি স্কিমের ফাঁদে সর্বস্ব হারিয়েছেন এ দেশের অনেকেই। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোড়ন তুলেছিল এমটিএফই জালিয়াতি। লিখেছেন ইমরানুর রহমান
রবিন আহমেদ (কল্পিত নাম) রাতের পর রাত ঠিকমতো ঘুমাতে পারতেন না। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান রবিন অনেক কষ্টে তিলে তিলে কিছু টাকা জমিয়েছিলেন— ভবিষ্যতের জন্য, সন্তানের পড়ালেখা আর একটা নিরাপদ আশ্রয়ের আশায়। কিন্তু মুদ্রাস্ফীতির বাজারে ব্যাংকের সামান্য সুদে সেই জমানো টাকা যেন চোখের সামনেই মূল্য হারাচ্ছিল। ঠিক সেই মুহূর্তে তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার এক মায়াবী হাতছানি নিয়ে হাজির হয় এমটিএফই বা মেটা ট্রেডিং ফিন্যান্সিয়াল এক্সপার্ট নামে একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন। ফেসবুকে স্ক্রল করতে করতে কিংবা ইউটিউবের নানা ভিডিওতে তিনি দেখলেন, কীভাবে সাধারণ মানুষ কোনো রকম বাড়তি কষ্ট বা পড়াশোনা ছাড়াই ঘরে বসে প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা মুনাফা তুলে নিচ্ছেন। এই প্রলোভনের কাছে হেরে গিয়ে রবিন তার জমানো সমস্ত সঞ্চয়, এমনকি আত্মীয়ের কাছ থেকে ধার করা কিছু টাকা মিলিয়ে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা রূপান্তর করলেন ক্রিপ্টোকারেন্সিতে। এরপর সেই ডলার জমা করে দিলেন এমটিএফই অ্যাপের ড্যাশবোর্ডে। প্রথম কয়েক দিন যেন স্বর্গের রাজ্য দেখতে পেলেন। অ্যাপের স্ক্রিনে প্রতিদিন তার অ্যাকাউন্ট ব্যালান্স ফুলেফেঁপে উঠছিল।
২০২৩ সালের আগস্ট মাসের এক ভ্যাপসা গরমের সকাল। রবিন প্রতিদিনের মতো ঘুম থেকে উঠে চোখ ডলতে ডলতে হাত বাড়ালেন স্মার্টফোনের দিকে। এমটিএফই অ্যাপে প্রবেশ করে তার অর্জিত মুনাফা দেখার কথা ছিল। কিন্তু স্ক্রিনে যা ভেসে উঠল, তা দেখে তার পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেল। অ্যাকাউন্ট লকড এবং লগইন করার কোনো উপায় নেই। মুহূর্তের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মেসেঞ্জার গ্রুপগুলোতে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল এক হাহাকার। হাজার হাজার মানুষ বুঝতে পারলেন, তাদের সারা জীবনের সঞ্চয় চোখের পলকে বাতাসে মিলিয়ে গেছে।
এমটিএফই মূলত বিশ্ব জুড়ে আলোড়ন তোলা এক সুসংগঠিত এমএলএম এবং পনজি স্কিমের ডিজিটাল সংস্করণ। এটি নিজেকে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ক্রিপ্টো ও ফরেক্স ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচয় দিত। তাদের মূল কৌশল ছিল লোভনীয় মুনাফার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করা। তারা এমন এক ধারণা তৈরি করেছিল যে, ব্যবহারকারীদের কোনো ট্রেডিংয়ের জ্ঞান না থাকলেও তাদের এআই বট স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রেড করে প্রতিদিন নিশ্চিত প্রফিট এনে দেবে। কিন্তু এখানে কোনো আসল ফরেক্স বা ক্রিপ্টো ট্রেডিং হতোই না। নতুন বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে সংগৃহীত টাকা দিয়েই পুরনো বিনিয়োগকারীদের তথাকথিত লাভের অংশ পরিশোধ করা হতো। একেই অর্থনীতি ও অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় পনজি স্কিম, যেখানে ওপরের তলার মানুষের পকেট ভরানোর জন্য নিচের তলার হাজার হাজার মানুষকে বলিদান দেওয়া হয়।
২০২৩ সালের আগস্টে এমটিএফই কেলেঙ্কারি প্রকাশ পাওয়ার পর বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন থানায় ভুক্তভোগীরা মামলা করেন। প্রধানত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং এমএলএম আইনের ধারাগুলোর অধীনে মামলাগুলো দায়ের করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তদন্তে নেমে ব্লকচেইন অ্যানালাইসিস প্রযুক্তির ব্যবহার করে। পরে আন্তর্জাতিক ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জের সহায়তায় পাচার হওয়া তহবিলের একটি অংশ বা ক্রিপ্টোকারেন্সি জব্দ করার মতো ঘটনাও ঘটে।






