পাঠকের ভয়
মাছটি কে নিল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আগামীকাল বাবা দিবস। আর এ দিনটি সামনে রেখে নিজের বাবার সঙ্গে মাছ ধরতে গিয়ে গা ছমছমে অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন আখতারুল আলম
এখনকার ছেলেমেয়েরা হয়তো বিশ্বাসই করবে না, একসময় গ্রামের রাত মানেই ছিল গা ছমছমে অন্ধকার। বিদ্যুৎ ছিল না, রাস্তা ছিল না, চারদিকে শুধু ঝিঁঝি পোকার ডাক আর দূরে কোথাও শিয়ালের হাঁক। রাত নামলেই গ্রামের মানুষ দ্রুত দরজা বন্ধ করে ফেলত। খাওয়া-দাওয়াও সেরে ফেলত সন্ধ্যা নামতে না নামতেই।
আমাদের বাড়ির পাশেই ছিল একটা বড় পুকুর। সেই পুকুরের দক্ষিণ-পূর্ব পাড়ে দাঁড়িয়ে ছিল বিশাল এক তেঁতুলগাছ। এত বড় গাছ আমি জীবনে খুব কমই দেখেছি। দিনের বেলায় আমরা সেই গাছে উঠে তেঁতুল পেড়ে লবণ-মরিচ দিয়ে মেখে খেতাম। কিন্তু রাত হলেই গাছটা যেন অন্য কিছুর রূপ নিত। গ্রামের সবাই বলত, ওই গাছে ভূতের আস্তানা।
তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। ফার্স্ট ইয়ার বা সেকেন্ড ইয়ারে, ঠিক মনে নেই। ছুটিতে বাড়ি এসেছি। সেদিন সন্ধ্যার পর থেকেই টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছিল। ফাল্গুন-চৈত্রের সময় এভাবে বৃষ্টি হলে পুকুরের মাছ বাইরে যাওয়ার জন্য উজান ধরে উঠতে থাকে। সেই সুযোগে আমরা একটা বিশেষ ফাঁদ পাততাম। বাঁশ দিয়ে বানানো সেই ফাঁদে মাছ ঢুকতে পারত; কিন্তু বের হতে পারত না।
বাবা বললেন, ‘চল, আজ একটু মাছ ধরা যাক।’
হাতে একটা টর্চ নিয়ে আমরা গেলাম সেই তেঁতুলগাছের নিচে। চারদিক অন্ধকার। এমন অন্ধকার যে নিজের হাতও ঠিকমতো দেখা যায় না। শুধু মাঝেমধ্যে দূরে বিদ্যুতের ঝলকানি আকাশটাকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য সাদা করে দিচ্ছিল।
আমরা ফাঁদ পেতে একটু দূরে বসে রইলাম। টর্চ জ্বালানো যাবে না, আলো দেখলে মাছ আর উঠবে না। তাই অন্ধকারেই বসে আছি। চারপাশে শুধু ব্যাঙের ডাক আর বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ।
হঠাৎ ফাঁদের কাছে ছপাৎ করে শব্দ হলো। দৌড়ে গিয়ে দেখি, বড়সড় একটা সরপুঁটি মাছ ধরা পড়েছে। মাছটা এত জোরে লাফাচ্ছিল যে বাঁশের তৈরি ডুলাটা কাঁপছিল। আমরা মাছটাকে ডুলার ভেতর রেখে আবার অপেক্ষা করতে লাগলাম।
কিছুক্ষণ পর বাবা ফিসফিস করে বললেন, ‘চলো, আজ আর না।’
আমি অবাক। এত তাড়াতাড়ি কেন? বললাম, ‘আরেকটু দেখি না?’
বাবা কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু অস্থির হয়ে উঠলেন। বারবার বলছেন, ‘চলো, চলো।’
শেষ পর্যন্ত উঠে পড়লাম। বাড়িতে ফিরে বাবা হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন, ‘মাছটা কই?’
আমি থমকে গেলাম। সত্যিই তো! ডুলার ভেতর মাছটা নেই!
আমি বললাম, ‘হয়তো লাফ দিয়ে পড়ে গেছে।’
বাবা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘তুমি বুঝো নাই... মাছটা ভূতে নিয়ে গেছে।’
কথাটা শুনে বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। অনেকক্ষণ ধরেই তো ডুলাটায় নড়াচড়া ছিল না!
বাবা পরে বলেছিলেন, তিনি তখনই বুঝেছিলেন কিছু একটা ঘাপলা হয়েছে। ডুলায় মাছের নড়াচড়ার শব্দ ছিল না। কিন্তু আমি ভয় পাব বলে কিছু বলেননি। সেই তেঁতুলগাছ নিয়ে গ্রামের মানুষের গল্পের শেষ ছিল না।
এ ছাড়া আরও কত অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটত। আমার বড় ভাই আর সেজো ভাই একরাতে বাড়ির বাইরের টয়লেটে গিয়েছিলেন। ফেরার পথে মাঠের মধ্যে তারা একটা গরু দেখতে পান। অদ্ভুত ব্যাপার, কিছুক্ষণ পর সেই গরুটাই ঘোড়ার মতো হয়ে গেল। তারপর ছাগল। তারপর কুকুর। শেষে বিড়াল!
ওরা ভয় পেয়ে দৌড়াতে শুরু করে। বহু দূর যাওয়ার পর হঠাৎ দেখল, সামনে কিছুই নেই।
আরেকটা ঘটনা বলি। আমাদের নদীর পাড়ে এক বিশাল জামগাছ ছিল। এক দুপুরে গ্রামের এক ছেলে জাম পাড়তে গাছে ওঠে। তার হাতে ছিল একটা ব্যাগ। সে এক হাতে জাম ছিঁড়ে ব্যাগে রাখছিল। কিন্তু হঠাৎ খেয়াল করল, তার সঙ্গে আরও দুটো হাত ব্যাগের ভেতর জাম ঢুকিয়ে দিচ্ছে!
প্রথমে সে বিশ্বাস করতে পারেনি। বারবার তাকিয়েছে। আর বারবারই দেখেছে, অদৃশ্য কারও হাত তার সঙ্গে কাজ করছে।
ছেলেটা ভয়ে গাছ থেকে নেমে আসে। এরপর থেকেই সে অসুস্থ হয়ে পড়ে। কয়েক দিনের মধ্যেই মারা যায়।
আঁকা: ফারজিন




