হাম বাড়ছে পাহাড়ে, টিকায় চ্যালেঞ্জ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বসতি ও সীমিত যোগাযোগব্যবস্থার কারণে অনেক জনগোষ্ঠীর কাছে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ। দেশে হামের সংক্রমণ প্রকোপের মধ্যে পরিণতি পেয়েছে সেই সংকট। শুধু এক জেলায়ই শনাক্ত ছাড়িয়েছে দেড় হাজার। এর মধ্যে আটজনের মৃত্যুর তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। যদিও সেই সংখ্যা ১৯ বলে দাবি স্থানীয়দের। পাহাড়ের এমন কিছু এলাকায় হাম ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে টিকাকরণ অত্যন্ত কঠিন। ওইসব জায়গায় উদ্বেগ বাড়াচ্ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা।
দেশে হামের প্রাদুর্ভাবের শুরুতেই এটি ছড়িয়ে পড়ে বান্দরবানের দুর্গম এলাকা আলীকদমে। চলতি বছরের মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত এই জেলায় হাসপাতালে গেছে ১ হাজার ৫২০ জন। সরকারি হিসাবে মারা গেছে আটজন। স্থানীয়দের দাবি, মৃত্যু আরও বেশি, কমপক্ষে ১৯ জন। তারা সবাই খুমী ও ম্রো জনগোষ্ঠীর। বর্তমানে রুমা উপজেলার দুর্গম এলাকা থেকে এখন হামের রোগী বেশি আসছে। তবে হামের রোগী তুলনামূলক কম রাঙামাটি ও খাগড়াছড়িতে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ইকবাল বলছেন, দুর্গম এলাকায় টিকা পৌঁছানো স্বাভাবিকভাবেই কঠিন, অনেক জায়গায় পৌঁছানো সম্ভবই নয়। আবার, পাহাড়ের মানুষদের টিকা এবং চিকিৎসায় আস্থাও কিছুটা কম থাকে। এতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু টিকার বাইরেই থেকে যায়। আবার অনেক সময় দুর্গম এলাকা থেকে রোগীর তথ্য দ্রুত স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছায় না। তখন সংক্রমণ শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে বিলম্ব হয় এবং একটি আক্রান্ত শিশুর মাধ্যমে পুরো এলাকায় রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
মৃত্যুর হিসাবে গরমিল: বান্দরবানের সিভিল সার্জনের তথ্যমতে, চলতি বছর হামে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে গেছে ১ হাজার ৫২০ জন। জেলার সাত উপজেলার মধ্যে আলীকদমে ৭০০ রোগী, লামায় ১৫০ এবং রুমায় ১৫১ জন। গতকাল শনিবার এই জেলায় ৬০ রোগী হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছে। এর মধ্যে সদর হাসপাতালে ২৫, রুমা হাসপাতালে ১৭ জন। অন্যদিকে মার্চ থেকে রাঙামাটিতে ১৫ এবং খাগড়াছড়িতে ২৮ জন হামের রোগী পাওয়া গেছে। তবে এ দুই জেলায় মৃত্যুর খবর নেই।
তিন দিন আগে বান্দরবানে গঠন করা হয়েছে ম্রো পাড়া হাম ক্রাইসিস রেসপন্স সেল। এই সেলের কার্যনির্বাহী সদস্য এস ই তনয়া ম্রো রাজ বলছেন, মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হামে ১৯ জন মারা গেছে। তাদের তালিকায় ১৫ জন হামে মৃতের পরিচয় ও বয়স উল্লেখ আছে। এখানে তিন মাসের শিশু থেকে সর্বোচ্চ ২৮ বছরের যুবক রয়েছেন। দুজন বাদে বাকি সবাই শিশু।
মৃত্যুর হিসাবে গরমিল নিয়ে বান্দরবানের সিভিল সার্জন মোহাম্মদ শাহীন হোসেন চৌধুরী বলছেন, কমিউনিটিতে হামে মারা যাওয়ার তথ্য পাওয়ার পর লোক পাঠিয়ে দেখা গেছে, তাদের মৃত্যু হামের কারণে হয়নি। অন্য কোনো রোগে মারা গেছে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন বলছেন, ‘রোগতত্ত্ববিদরা সবসময়ই বলেন, সরকারিভাবে যা রেকর্ড হয় তার থেকে প্রকৃত আক্রান্ত ও মৃত্যু সবসময়ই বেশি থাকে। হামের ক্ষেত্রেও তাই। স্বাস্থ্যকর্মীদের দায়িত্ব দিলে প্রকৃত সংখ্যা বের করে আনা সম্ভব, যাতে রোগ নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়।’
হাম থামাতে নানা চ্যালেঞ্জ: স্থানীয় বাসিন্দা, চিকিৎসক এবং উন্নয়নকর্মীরা বলছেন, এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম অঞ্চলগুলো। বান্দরবানের সিভিল সার্জন মোহাম্মদ শাহীন হোসেন চৌধুরী বলছেন, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির দলকে অনেক সময় কয়েক ঘণ্টা হেঁটে পাহাড়ি গ্রামে পৌঁছাতে হয়। এরপরও সব জায়গায় পৌঁছানো সম্ভব নয়। নির্ধারিত তাপমাত্রায় টিকা সংরক্ষণ (কোল্ড চেইন) বজায় রাখা, প্রতিটি শিশুকে খুঁজে বের করে টিকা দেওয়াও চ্যালেঞ্জ। কিছু পরিবার স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে এতটাই দূরে বাস করে যে, অসুস্থ শিশুকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়াও সম্ভব হয় না।
রাঙামাটিতেও এমন জায়গা রয়েছে, যেখানে স্বাস্থ্যকর্মীরা পৌঁছাতে পারেননি বলে জানালেন এ জেলার সিভিল সার্জন নূয়েন খীসা। এসব দুর্গম এলাকায় কর্মসূচি চালাতে খরচও অনেক বেশি দরকার পড়ে। এটাকেও একটা বাধা হিসেবে দেখছেন তিনি। দুর্গম এলাকায় অপুষ্টিও একটি বড় উদ্বেগ।
পাশাপাশি আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় বিশ্বাস করে না এই জনগোষ্ঠী। চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি আস্থাশীলও না। ফলে টিকা নিতে চায় না। রোগে আক্রান্ত হলেও সহজে চিকিৎসা নিতে চায় না। আসতেও অনেক বাধা।
বাংলাদেশ ম্রো স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি এস ই তনয়া ম্রো রাজ বলছেন, রোগাক্রান্ত হলে পাহাড়ের মানুষ সাধারণত কবিরাজি এবং ধর্মীয় গুরুদের কাছ থেকে চিকিৎসা নেন। খুব খারাপ অবস্থা না হলে হাসপাতালে আসেন না। তবে টিকা নেওয়ার ক্ষেত্রে আগের তুলনায় স্থানীয়রা আগ্রহী হয়েছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ইকবাল বলছেন, আক্রান্ত ব্যক্তি টিকা না নিলে ১২-১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারেন। তাই সংক্রমণ ঠেকাতে কমপক্ষে ৯৫ শতাংশ শিশুকে দুই ডোজ টিকার আওতায় আনতেই হবে। এ কারণে চ্যালেঞ্জ থাকার পরও পুলিশ, প্রশাসন এবং সেনাবাহিনীর সহায়তায় টিকার ব্যবস্থা করতে হবে। দরকার হলে প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ব্যবস্থা বজায় রাখা।




