রিকশার পেছনে যে ঝুলে ছিল

আঁকা : ফারজিন
চাঁদপুরের পরিত্যক্ত কোল্ডস্টোরেজের ভেতর এক রিকশাচালক যা দেখেছিল, তা কি সত্যি? এখনো কি তাকে কেউ অনুসরণ করে। লিখেছেন আক্তার হোসেন
২০০৬ সালের অক্টোবরের মাঝামাঝি। তখন আমি ঢাকায়, পুরান ঢাকার ইসলামপুরে থাকি। আমার এক জেঠাতো ভাই ছিল, নাম নূর আলম। হুটহাট সিদ্ধান্ত নেওয়া তার স্বভাব ছিল। একদিন সন্ধ্যার পর সে হুট করে আমার ঘরে এসে হাজির। গম্ভীর গলায় বলল, ‘চল, গ্রামে যাব।’
আমাদের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরে। আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘এই রাতে হঠাৎ গ্রামে যাবি?’
সে নাছোড়বান্দা, ‘হ্যাঁ, এখনই যাব। চল, ঘুরে আসি।’
অগত্যা দুজন মিলে রাতেই রওনা দিয়ে সোজা চলে গেলাম সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে। কিন্তু সেখানে পৌঁছে শুনি, আমাদের কচুয়ার শেষ বাসটি অনেক আগেই ছেড়ে গেছে।
সিদ্ধান্ত নিলাম চাঁদপুর শহরের বাসে উঠব, যা হাজীগঞ্জ হয়ে যায়। হাজীগঞ্জ নেমে সেখান থেকে অন্য কোনো বাহনে গ্রামে পৌঁছানো যাবে। বাসে যখন উঠলাম, তখন বাইরে আবহাওয়া বেশ খারাপ হতে শুরু করেছে। প্রচণ্ড বাতাস আর মুষলধারে বৃষ্টির কারণে বাসচালক গাড়ি খুব বেশি জোরে চালাতে পারছিলেন না।
যখন হাজীগঞ্জ পৌঁছালাম, তখন গভীর রাত। বাস থেকে নেমে বেশ কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর এক বয়স্ক রিকশাচালককে পেলাম।
মানুষটির একটি হাত নেই, সে এক হাত দিয়েই রিকশা চালাচ্ছে। রিকশাটার গঠনও বেশ অদ্ভুত ও রহস্যময়। হ্যান্ডেল বা স্টিয়ারিংয়ের অংশটি লাল কাপড়ে শক্ত করে মোড়ানো। এর সঙ্গে একটি মোটা লাঠি বাঁধা, যাতে কিছু সাংকেতিক লেখা এবং লাল সুতার বেশ কিছু প্যাঁচ দেওয়া রয়েছে।
আমরা দুজন রিকশায় চড়ে বসলাম। হাজীগঞ্জ পার হয়ে যখন গ্রামীণ মেঠোপথে ঢুকলাম, তখন রাস্তার করুণ দশা স্পষ্ট হয়ে উঠল। একে তো সারা রাত বৃষ্টি হয়েছে, তার ওপর কিছু রাস্তা কাঁচা, কিছু ইট বিছানো আর কিছু আধা-পাকা। রিকশা টানতে চালকের প্রচণ্ড বেগ পেতে হচ্ছিল। চারপাশে নিকষ কালো অন্ধকার, ঝিরঝিরে বৃষ্টি থামার পর ঝিঁঝি পোকার ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। এক পর্যায়ে নূর আলম চালককে প্রশ্ন করে বসল, ‘আচ্ছা আঙ্কেল, একা একা এত রাতে রিকশা চালান, আপনার ভয় করে না?
চালক বললেন, ‘ভয় করলে কি আর এই পেশায় টিকতে পারতাম? ভয় আমার কেটে গেছে অনেক আগেই।’
নূর আলম আরও কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইল, ‘আপনার কি কখনো কোনো ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে?’
চালক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘আমার জীবনের একটা ঘটনা আছে। তবে আপনারা আবার শুনে ভয় পাবেন না তো? বিশ্বাস করবেন তো?’
আমরা বললাম, ‘না আঙ্কেল, ভয় পাব কেন? ঘটনা সত্যি হলে অবশ্যই বিশ্বাস করব।’
চালক রিকশা চালাতে চালাতে অতীতের গল্প বলতে শুরু করলেন।
“তখন আমার বয়স কম, তাগড়া যুবক ছিলাম। অনেক রাত অবধি রিকশা চালাতাম। সেদিনও এই রাস্তা দিয়েই যাত্রীকে গন্তব্যে নামিয়ে একা ফিরছিলাম। রাস্তার পাশেই একটা পরিত্যক্ত কোল্ডস্টোরেজ আছে— অনেক বড় এবং বহু বছর ধরে বন্ধ পড়ে থাকা এক ভুতুড়ে স্থাপনা। যখন আমি ওই কোল্ডস্টোরেজের কাছাকাছি পৌঁছালাম, তখনই আকাশ ভেঙে প্রবল ঝড়-বৃষ্টি শুরু হলো। বাধ্য হয়ে আমি রিকশাটি টেনে ওই কোল্ডস্টোরেজের বারান্দায় নিয়ে গেলাম। সারা দিন প্যাসেঞ্জার টেনে শরীর তখন ক্লান্তিতে ভেঙে আসছিল। ভাবলাম, ভেতরে তো কেউ নেই, একটু জিরিয়ে নিই। কোল্ডস্টোরেজের ভেতরে খড়ের কিছু বিছি ও ইটের স্তূপ পড়ে ছিল। আমি রিকশার সিটটা খুলে খড়ের ওপর রেখে একটা ইটের সঙ্গে হেলান দিয়ে কখন যে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছি, নিজেই জানি না। বাইরে তখনো তাণ্ডব চলছে, তীব্র শব্দে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।
হঠাৎ করেই একটা অদ্ভুত গোঙানি শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গেল। মনে হলো, কেউ গলায় তীব্র চাপ দিয়ে শ্বাসরুদ্ধ করার চেষ্টা করছে। আমি চোখ মেলে তাকালাম। ঝড়ের তাণ্ডব ততক্ষণে থেমে গেছে, ঠিক তখনই আবার গোঙানির শব্দটা কানে এলো।
চোখ অন্ধকারে সয়ে আসার পর কোল্ডস্টোরেজের ওপরের লোহার পাটাতনের দিকে তাকাতেই রক্ত হিম হয়ে গেল! লুঙ্গি পরা একটা লোক গলায় ফাঁস দিয়ে ঝুলছে। সে প্রচণ্ড ছটফট করছে, তার হাত-পা ছুড়ছে। আমি আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে পড়লাম। এত ওপরে সে কীভাবে উঠল? কীভাবে তাকে বাঁচাব? মাথা একদম কাজ করছিল না। প্রাণপণে চিৎকার করে বাইরে গেলাম, কিন্তু আশপাশে কোনো জনমানস বা ঘরবাড়ি ছিল না। ভয় পেয়ে আমি যখন আবার কোল্ডস্টোরেজের ভেতরে গেলাম, ততক্ষণে সব শেষ। লোকটির হাত-পা ঝুলে পড়েছে, চোখ দুটো ঠিকরে বাইরে বেরিয়ে আসছে আর জিভ ঝুলছে দীর্ঘ হয়ে। ভাবলাম, এখানে লাশসহ কেউ দেখলে পুলিশ আমাকেই ফাঁসাবে। ভয়ে ভয়ে রিকশার সিটটা তুলে নিয়ে হারিকেন জ্বেলে কোনোমতে রিকশা নিয়ে সেখান থেকে পালিয়ে আসার জন্য ছুটলাম। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পরেই মনে হলো, আমার রিকশাটা হঠাৎ অস্বাভাবিক ভারী হয়ে গেছে।
কী মনে করে যেন পেছনে ফিরে তাকালাম। দেখলাম, মাত্রই যে লোকটা কোল্ডস্টোরেজে ফাঁস দিয়ে মারা গেল, সে হুবহু আমার রিকশার পেছনে ঝুলে আছে! রিকশার হুডের মাঝখানের ফাঁকা প্লাস্টিকের ভেতর দিয়ে মাথাটা গলিয়ে আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার মুখ দিয়ে তাজা রক্ত গড়াচ্ছে আর তার পা দুটি এত লম্বা হয়ে গেছে যে, তা মাটির সঙ্গে ঘষে ঘষে আটকে যাচ্ছিল!
সে বিকট গলায় চিৎকার করে উঠল, ‘আমাকে বাঁচালি না কেন? আমাকে ফেলে কেন চলে আসলি?’
ভয়ে আমার মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো। রিকশার নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পেরে সজোরে রাস্তার পাশের গভীর খাদে গিয়ে পড়লাম। খাদে পড়ার সময় রাস্তার ধারের একটা বড় তালগাছের কাঁটার মতো ধারালো ডালে আমার ডান হাত সজোরে আঘাত হানে। যখন জ্ঞান ফিরল, তখন আমি চাঁদপুর সদর হাসপাতালে। পচন ধরে যাওয়ার কারণে ডাক্তার শেষ পর্যন্ত আমার এই হাতটাই কেটে বাদ দিতে বাধ্য হন।”
গল্প শেষ করে রিকশাচালক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আমরা দুজন তখন কোল্ডস্টোরেজটির একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। ঠিক সেই মুহূর্তেই এক অদ্ভুত কাকতালীয় ব্যাপার ঘটল। আমাদের রিকশার চেইন হুট করে পড়ে গেল!
চালক রিকশা থামিয়ে নিচে নামলেন চেইন ঠিক করতে। আমরা ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে অশুভ সেই কোল্ডস্টোরেজটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। চালকও কেমন যেন শূন্যদৃষ্টিতে বড় বড় চোখে কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর বিচিত্র ভঙ্গিতে হেসে আবার রিকশায় এসে বসলেন।
আমি ভয়ে ভয়ে তাকে প্রশ্ন করলাম, ‘আঙ্কেল, এখনো এই রাস্তা দিয়ে একা একা যাতায়াত করেন? আপনার কি আর ভয় করে না?’
চালক সামনে তাকিয়ে রিকশার প্যাডেল ঘোরাতে ঘোরাতে শান্ত গলায় বললেন, ‘এখনো অনুভব করি বাবা। যখনই এদিক দিয়ে যাই, আমার মনে হয় কেউ একজন আমার রিকশার পেছনে ঝুলে আছে, আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু আমি সেদিনের মতো আর ভুল করিনি। আমি আর কখনো পেছনের দিকে তাকাইনি। রিকশা ভারী হলেও সোজা সামনে তাকিয়ে চালাই। আর কখনো ওই কোল্ডস্টোরেজের ছায়াও মাড়াইনি। রিকশায় আপনারা যে লাল কাপড় আর সুরক্ষার চিহ্ন দেখছেন, এগুলো এই অশুভ শক্তিগুলোকে দূরে রাখার জন্যই।’



