জ্যাক-ও-ল্যান্টার্ন

অক্টোবরের শেষ সন্ধ্যা। আয়ারল্যান্ডের কোনো এক গ্রামে কুয়াশা নামছে ধীরে। একটা জানালার ধারে ছোট একটা আলো জ্বলছে। একটা শালগমের ভেতরে, খোদাই করা এক বিকৃত মুখের ভেতরে, লালচে কয়লার আভা কাঁপছে। ঘরের মানুষরা জানে, এই রাতে পর্দার ওপারের জগৎটা একটু কাছে সরে আসে। তাই আলোটা রাখা হয়েছে, যাতে কেউ ভুল করে ভেতরে ঢুকে না পড়ে। কিন্তু সে কে? সবাই তাকে ডাকত ‘স্টিঞ্জি জ্যাক’, মানে কৃপণ জ্যাক। একদিন সে শয়তানকে নিয়ে গেল পানশালায়, একসঙ্গে মদ খাবে বলে। কিন্তু দাম মেটানোর সময় জ্যাকের পকেট থেকে কিছুই বেরোল না। সে হেসে বলল, ‘তুমি একটা রুপোর মুদ্রা হয়ে যাও না, তোমাকে দিয়েই দাম মিটিয়ে দেব।’ শয়তান রাজি হলো।
মুদ্রা হয়ে যাওয়া শয়তানকে জ্যাক টুক করে ফেলে দিল নিজের পকেটে, যেখানে আগে থেকেই একটা রুপোর ক্রুশ পড়ে ছিল। সেটার গায়ে লেগে শয়তান আর নড়তে পারে না। অনেক অনুনয়ের পর জ্যাক তাকে ছাড়ল, তবে শর্ত চাপিয়ে। এক বছর শয়তান তার ধারেকাছে ঘেঁষবে না। আর জ্যাক মরে গেলে তার আত্মাও ছোঁবে না। পরের বছর শয়তান ফিরল। জ্যাক গাছের একটা উঁচু ডাল দেখিয়ে বলল, ওই ফলটা পেড়ে দাও তো। শয়তান গাছে চড়ল। নিচে দাঁড়িয়ে জ্যাক ছুরি দিয়ে গুঁড়িতে একটা ক্রুশ কেটে দিল। শয়তান আটকা পড়ল ডালের ওপর, নামার উপায় নেই। এবার ১০ বছরের প্রতিশ্রুতি আদায় করল জ্যাক।
কিছুদিনের মধ্যেই জ্যাক মারা গেল। স্বর্গে জায়গা হলো না। সে নেমে এলো নরকের ফটকে। শয়তান মনে করিয়ে দিল, প্রতিশ্রুতিটা জ্যাকেরই চাওয়া, আত্মা সে ছুঁতে পারে না। নরকেও ঠাঁই হলো না জ্যাকের। শয়তান শুধু একটা জ্বলন্ত কয়লা ছুড়ে দিল তার দিকে। বলল, এটাই তোমার পথ দেখাক। চারদিকে তখন নিকষ অন্ধকার। জ্যাক কয়লাটা কুড়িয়ে নিল। হাতের কাছে একটা শালগম পড়ে ছিল। তার ভেতরটা খুঁড়ে ফাঁপা করে কয়লাটা ঢুকিয়ে দিল সেখানে। সেই আলো হাতে সে হাঁটতে শুরু করল। আর থামেনি। মানুষ তার নাম দিল ‘জ্যাক অব দ্য ল্যান্টার্ন’। মুখে মুখে ঘষা খেয়ে নামটা ছোট হয়ে দাঁড়াল ‘জ্যাক-ও-ল্যান্টার্ন’। জ্যাক হয়ে ওঠে দুই জগতের মাঝখানে আটকে থাকা এক ছায়া।
উনিশ শতকে গল্পটা কাগজে ছাপা হলো। তারপর আয়ারল্যান্ড আর স্কটল্যান্ডের মানুষ শালগম খোদাই করতে লাগল। ভয়ংকর মুখ কেটে ভেতরে আলো রাখত তারা, সেটা বসিয়ে দিত জানালা কিংবা দরজার পাশে। উদ্দেশ্য একটাই, জ্যাক যেন এই দরজায় এসে না দাঁড়ায়, তার সঙ্গের অশরীরীরাও যেন ফিরে যায়। আমেরিকার মাটিতে কুমড়ো ছিল আরও বড়, আরও নরম, ছুরির নিচে আরও বাধ্য। এভাবেই শালগমের জায়গা নিল কুমড়ো। আজ হ্যালোইনের রাতে সেই আলো জ্বলে। শিশুরা হাসে, কুমড়োর গায়ে উদ্ভট মুখ আঁকে। ভেতরে এখন কয়লা নয়, বৈদ্যুতিক বাতি কিংবা মোম।



