পাঠকের ভয়
বাসাটা ভালো নয়

অলংকরণ: ফারজিন জামান খান
শহর থেকে প্রতিদিন যাওয়া-আসা করে ডিউটি করতে বড্ড ক্লান্ত লাগল। সারা দিন যেন চলে যায় অফিসে। ডিউটি থেকে ফেরার পর যেন আর বিন্দু শক্তি অবশিষ্ট থাকে না। সিদ্ধান্ত নিলাম, অফিসের আশপাশে কোনো সাবলেট বাসা নেব। এতে অনেক সময় বাঁচবে। বই পড়া যাবে। ইউটিউবে পছন্দমতো ভিডিও দেখা যাবে। অফিসের অনেকেই আশপাশে বাসা নিয়েছেন।
আমিও সাবলেট থাকার জন্য রুম খুঁজতে থাকলাম। প্রথমে যতটা সহজ মনে করেছিলাম, বাস্তবে ততটা হলো না। বাসা পছন্দ হয় তো ভাড়া অত্যধিক। আবার ভাড়ায় মিললে বাসা মনমতো হয় না। হাল না ছেড়ে লেগে রইলাম। অবশেষে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার রাজীব ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, ওনার রুমমেটের বিএসআরএমে জব হওয়ায় বাসা ছেড়ে দিচ্ছেন। একটা সিট খালি হয়েছে। আমি চাইলে উঠতে পারব।
রাজীব ভাই আমার সেকশনের না। চুপচাপ ধরনের লোক। আগপিছ না ভেবে উঠে গেলাম বাসায়। অনেক সময় শিফটিং মেলে না। দেখা গেল, আমার ডে শিফট ডিউটি তো তার নাইট। আমার নাইট হলে রাজীব ভাইয়ের ডে। ওঠার পর থেকে কখনোই রাতে একসঙ্গে দুজন বাসায় থাকা হয়নি। ছুটি পেলেই রাজীব ভাই বাড়ি চলে যেতেন। আর যাওয়ার আগে বলতেন, ‘দাদা, দরজা ভালো করে লক করে ঘুমাইয়েন। রাতে কেউ নক করলে বুঝেশুনে খুলিয়েন। মালিক থাকে না তো বাড়িতে। সবাই ভাড়াটিয়া।’
একদিন কিছুটা আতঙ্ক নিয়ে জিজ্ঞেস করেছি, ‘চুরি-ডাকাতির ভয় নেই তো ভাই?’ রাজীব ভাই ঠোঁটের কোণে একচিলতে রহস্যময় হাসি ধরে রেখে বললেন, ‘এ বাড়িতে কখনো চুরি হয়নি। রেকর্ড নাই।’
ঘর বলতে চারটা। চার ফ্যামিলি থাকেন। কাউকেই চিনি না।
ডে শিফট করে এক বৃষ্টির রাতে বাসায় এলাম। রাজীব ভাই সাপ্তাহিক অফ ডে থাকায় বাড়িতে। গভীর রাতে বৃষ্টির বেগ কমে এলো। টিনের চালে বৃষ্টির শব্দ বেশ ভালোই লাগল। হঠাৎ দরজায় জোরে জোরে কেউ নক করল। একবার, দুইবার। তারপর নিস্তব্ধ। জিজ্ঞেস করলাম, ‘কে?’ কোনো সাড়াশব্দ পেলাম না। উঠে গিয়ে দরজা খুললাম। জোরে বাতাসের ধাক্কা এলো ঘরের ভেতরে। বাইরে হালকা বৃষ্টি হচ্ছে।
দরজা বন্ধ করে বিছানায় এলাম। জিরো পাওয়ারের লাইট জ্বেলে দিলাম। হালকা হলুদ আলোয় ঘর ভরে গেল। চোখে ঘুম আসার আগেই দৃষ্টিবিভ্রম হলো যেন। নারী অবয়বের কেউ দাঁড়িয়ে আছে জানালার পাশে। আমি তো জানালা বন্ধই করেছিলাম। দরজাও তো বন্ধ করলাম। নারীটি ধীরে ধীরে বিছানার দিকে অগ্রসর হলো। চিৎকার করতে গিয়েও পারলাম না। মনে হলো, কেউ গলা চেপে ধরেছে। শরীরের সব শক্তি দিয়েও যেন পেরে উঠলাম না। ঘেমে গোসল হয়ে গেল। হঠাৎ দূরে কোথায় মাইকে ফজরের আজান ভেসে এলো। সঙ্গে সঙ্গে পাশে দাঁড়ানো নারী অদৃশ্য হলো।
সকালে রাতের সবকিছুই স্বপ্ন বলে মনে হলো। কিন্তু ঠিক তখনই আবিষ্কার করলাম ঘরের জানালা ও দরজা খোলা। রাজীব ভাইকে ফোন দিলাম। ভূত-পেত্নীর কথা বললে হয়তো হাসাহাসি করবেন। অন্যভাবে বললাম। বললেন, দরজা-জানালার ছিটকানিতে সমস্যা আছে। বাতাসের ঝাপটায় খুলে যায়; বেশি বেগ থাকলে।
আমি এ বাসাটায় আর বেশিদিন থাকলাম না। কারণ, বিছানায় যে বেশ কয়েকটি লম্বা চুল পেয়েছিলাম, এটার ব্যাখ্যা হয়তো কারও কাছেই পাব না!



