দূরের আলো
হঠাৎ সালাম দিয়ে বলে ‘স্যার, আমি আপনার ছাত্র’

২০১৮ সালে মাত্র ৪-৫ জন আদিবাসী ও বাঙালি শিশুকে নিয়ে পাঠশালার যাত্রা শুরু হয়।
শেরপুরে গারো পাহাড়ের বন্য হাতি নিয়ে বহুদিন ধরে কাজ করছি। হাতি কিংবা অন্য বন্যপ্রাণীর খবর নিতে সীমান্তের নানা প্রান্তে ছুটে চলি। এক বিকালে কোথাও যাচ্ছিলাম। হঠাৎ নালিতাবাড়ী উপজেলার বারোমারী মিশনের বিপরীতে পুকুরের ধারে একটি মেটে মাথা কুড়া ঈগল (গ্রে হেডেড ফিশ ঈগল) নজর কাড়ল। গাড়ি থেকে নেমে পড়ে পাখিটির কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালাম। প্রায় দুই বছর ধরে এই এলাকায় ওকে দেখতে পাই। প্রতিবার এদিকে এলে নজর রাখি, কারণ শিকার ও আবাসস্থল ধ্বংসের কারণে এরা বিলুপ্তপ্রায়। বড় গাছ আর মাছের পুকুর থাকলেও মানুষের অমানবিকতায় এদের সংখ্যা ক্রমেই কমছে।
আবার পাখিটির দেখা পেয়ে মনটা ভরে গেল। এমন সময় মৃদু একটা শব্দ শুনলাম। কানা খাড়া করলাম। কবিতার ছলে কয়েকটি শিশু উচ্চারণ করছে, ‘অ-অজগর আসছে তেড়ে; আ-আমটি আমি খাব পেড়ে।’ শৈশবে শোনা এ লাইনটি খুবই পরিচিত। শব্দের উৎস খুঁজতে এগিয়ে গেলাম।
কিছুদূর গিয়ে দেখি, এক দম্পতি একটি ঘরের ভেতরে বসে আছেন, সামনে প্রায় ২০ জনের মতো বিভিন্ন বয়সের শিশু; তাদের হাতে বই, খাতা, কলম ও ব্যাগ। কৌতূহল বেড়ে গেল। দম্পতি শিক্ষকদের কাছে অনুমতি নিয়ে পাশে বসলাম। কিছুক্ষণ নীরবে বসে ভাবছিলাম, এটা কি কোনো স্কুল?
পাঠশালাটির কাছে আগে এসেছি, কিন্তু কখনো মনে হয়নি এখানে নিয়মিত পাঠদান হয়। কোনো নামফলকও নেই। দোকান হিসেবে ভাড়া দেওয়া একটি ছোট কক্ষে চলছে পাঠদান।
শিক্ষক প্রদীপ ম্রং ও শিক্ষিকা লিপি নেংমিঞ্জা স্বামী-স্ত্রী। কথায় কথায় জানালেন, দুজনই বারোমারী মিশন পরিচালিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করছেন। নিয়মিত পাঠদান শেষে বিকালের সময়টা আগে অব্যবহৃতই কাটত। তাই এখন বেলা ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত প্রতিদিন স্বেচ্ছাশ্রমে পিছিয়ে পড়া শিশুদের বিনামূল্যে পড়ান।
অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, দোকানের জন্য ভাড়া দেওয়া জায়গায় তারা কীভাবে বিনামূল্যে পাঠদান করছেন? একটু হেসে প্রদীপ ম্রং বললেন, ‘আমরা কক্ষটি ১০ হাজার টাকার নিরাপত্তা জামানত দিয়ে ভাড়া নিয়েছি। প্রতি মাসে ৬০০ টাকা ভাড়া দিতে হয়। দিনের বেলায় ক্লাস হয় বলে বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়া হয়নি।’
শিশুদের শেখাতে হলে তাদের মতো করেই শেখাতে হয়। এ গুণটি তাদের মধ্যে স্পষ্ট। অনেক সময় শিশুরাই শিক্ষক দম্পতিকে ডেকে নিয়ে আসে
তিনি আরও জানান, ২০১৮ সালে মাত্র ৪-৫ জন আদিবাসী ও বাঙালি শিশুকে নিয়ে পাঠশালার যাত্রা শুরু হয়। এখন নিয়মিত ২০ জন আসে, কখনো ৩০ জনও হয়। তীব্র গরমে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে হয় ক্লাস চলার সময়, শীতে দরজা-জানালা বেশি খোলা যায় না। বিদ্যুৎ না থাকায় সমস্যা বাড়ে, মাঝে মাঝে পাঠশালা বন্ধও রাখতে হয়। এভাবেই কেটে যাচ্ছে প্রায় আট বছর।
কথায় কথায় আরও অনেক কিছু জানলাম। প্রদীপ ম্রং ও লিপি নেংমিঞ্জা দম্পতি গারো; তাদের বাড়ি নালিতাবাড়ী উপজেলার ঢালুকোনা গ্রামে। প্রদীপ ম্রং ১৯৮৬ সাল থেকে এবং লিপি নেংমিঞ্জা ১৯৯১ সাল থেকে শিক্ষকতা করছেন। তাদের একমাত্র ছেলে পড়াশোনা শেষ করে ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন এবং পরিবারসহ সেখানেই থাকেন।
সারা দিনের কর্মব্যস্ততার পর বিকালের অবসর সময় শিশুদের সঙ্গে কাটানোর ভাবনা থেকেই এ উদ্যোগ।
কক্ষ ভাড়া ও সংসারের খরচ নিয়ে প্রশ্ন করলে প্রদীপ হেসে বললেন, ‘কিছু অভিভাবক মাঝেমধ্যে সামান্য সহায়তা করেন, বেশিরভাগই পারেন না। আমরা খরচের কথা ভেবে এখানে আসি না। অবসর সময়টা কাজে লাগাচ্ছি মাত্র। খরচের কথা তুললে হয়তো বাচ্চাদের আর পাঠাবে না।’
যতক্ষণ ছিলাম, নির্বাক দর্শকের মতো মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। শিশুসুলভ এ দম্পতির প্রতি শ্রদ্ধা বাড়ছিল। তাদের দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে অনেক শিক্ষার্থীই এখন প্রতিষ্ঠিত। দেশের বিভিন্ন নামি প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করছে, অনেকে ভালো পদেও কর্মরত। সাবেক ছাত্রদের প্রসঙ্গে প্রদীপ ম্রং হেসে বললেন, ‘আমি নিজেই জানি না, এত বছরে কতজনের শিক্ষক হয়েছি। কে কোথায় আছে, তাও জানি না। হঠাৎ কেউ এসে সালাম দিয়ে বলে, “‘স্যার, আমি আপনার ছাত্র’ তখন বুকটা গর্বে ভরে যায়।”
এ সময় বাইরে একজন অভিভাবককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখি। জানতে পারলাম, তিনি গীতি হাগিদক। একজন স্কুলশিক্ষিকা। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনি নিজে শিক্ষিকা হয়েও এখানে সন্তানকে ভর্তি করালেন কেন?’ জবাবে বললেন, ‘প্রতিদিন যাতায়াতের সময় এ স্কুলের সামনে দিয়ে যাই। একদিন আমার সন্তান নিজেই এখানে ভর্তি হতে চাইল; কারণ এখানে নাকি খেলাধুলা, গান-নাচ সবই হয়। তারপর ভর্তি করাই।’
কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করে বুঝলাম, শিশুদের শেখাতে হলে শিশুদের মতো করেই শেখাতে হয়। এ গুণটি তাদের মধ্যে স্পষ্ট। তাই শিশুরা নিয়মিত আসে; বরং অনেক সময় শিশুরাই শিক্ষক দম্পতিকে ডেকে নিয়ে আসে। এখানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কটা যেন বন্ধুর মতো। শাসন নয়, স্নেহ, মমতা আর ভালোবাসায় ভরপুর পরিবেশ। খেলাচ্ছলে পড়ানো হলেও পড়ার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নেই।
দুই শিক্ষক ও শিশুদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ধীরে ধীরে বাইরে এলাম। সন্ধ্যা নেমে আসছে। দূরে সেই মেটে মাথা কুড়া ঈগল ডানা মেলে বাসার উদ্দেশে উড়ছে। পাঠশালার বাইরে দাঁড়িয়ে মনে হলো; এই পাহাড়, এই মানুষ, এই ছোট্ট পাঠশালা সবই যেন এক অদ্ভুত বন্ধনে জড়ানো। একদিকে বিলুপ্তপ্রায় প্রাণ-প্রকৃতি রক্ষার লড়াই, অন্যদিকে পথহারা শিশুদের আলোর পথে ফেরানোর চেষ্টা; দুটোই একই গল্পের অংশ।
গারো পাহাড়ে সূর্য প্রতিদিনই অস্ত যায়। কিন্তু এ ছোট্ট কক্ষে প্রতিদিনই জ্বলে ওঠে নতুন আলো; যে আলো কখনোই নিভতে দেওয়া যাবে না।




