মায়ের কাছে ফেরা

১৫ আগস্ট সকালে স্থানীয় সংবাদকর্মী কাউসার মিয়া হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে জানাল, শিবপুরের ‘পাড় অঞ্চলে’ তিনটি চিতা বাঘের ছানা ধরা পড়েছে। পাড় অঞ্চল বলতে নরসিংদীর শিবপুর ও বেলাব থানার কিছু অঞ্চলকে বোঝায়। এটি আসলে মধুপুর-ভাওয়াল গড়ের একটি অংশ। ছোট-বড় টিলা আর বন-জঙ্গলে আচ্ছাদিত একটি এলাকা। ওই এলাকায় একসময় বাঘ, চিতা বাঘ, হরিণ আর বন্য শূকরের অবাধ বিচরণ ছিল। স্থানীয় লোকজন লম্বা জাল দিয়ে জঙ্গল বিট করে বাঘ শিকার করত। কিন্তু এখন সেখানে বাঘ কিংবা চিতা বাঘের বাচ্চা পাওয়া অসম্ভব।
কাউসার মিয়া আমাকে একটি ভিডিও দেখাল। সেখানে খাঁচাবন্দি তিনটি বন্যপ্রাণীর বাচ্চা দেখা যাচ্ছে। তাদের গায়ে ফোঁটা ফোঁটা দাগ রয়েছে। সাধারণ মানুষের পক্ষে এদের চিতা বাঘের বাচ্চা মনে করা খুবই স্বাভাবিক। বললাম, তাড়াতাড়ি পেজের অ্যাডমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করো। কিছুক্ষণের মধ্যেই নানা জায়গায় কথা বলে একেবারে সঠিক লোকেশন বের করে ফেলল সে।
চরসিন্দুর বাজার থেকে একটা অটোরিকশা নিয়ে দ্রুত রওনা হয়ে গেলাম ঘটনাস্থলের উদ্দেশে। সঙ্গে বন্যপ্রাণী উদ্ধারকর্মী মাসুদ ভুঁইয়াও আছে। তখন দুপুর। পলাশ উপজেলার সীমানা পেরিয়ে শিবপুরের চক্রধা ইউনিয়ন থেকে আমাদের বহনকারী যন্ত্রযানটি প্রবেশ করল জয়নগর ইউনিয়নে। উঁচু-নিচু রাস্তা আর ঝোপজঙ্গল দেখে মনে হচ্ছে যেন সত্যি কোনো পাহাড়ি অঞ্চলে চলে এসেছি। অবশেষে একটি নির্জন লটকন বাগান পেরিয়ে কাঁচা রাস্তা ধরে একেবারে ঘটনাস্থলে গিয়ে হাজির হলাম।
এটি হচ্ছে জামগড় গ্রামের শাহীন মিয়ার বাড়ি। বাড়ির উঠানে পা রাখতেই একজন মহিলা ঘর থেকে খাঁচাবন্দি বাচ্চাগুলো বাইরে নিয়ে এলেন। কী সুন্দর তুলতুলে নরম বাচ্চা! কিছুক্ষণের মধ্যে বাড়ির অন্য সদস্যরা উঠানে হাজির হলেন। তাদের মধ্যে একজন এসে জানালেন, তিনি আজ সকালে বাড়ির পাশের হলুদ ক্ষেতে কাজ করছিলেন। তখন হঠাৎ বাচ্চাগুলো তার পায়ের কাছে চলে আসে। তিনি ওদের ধরে বাড়িতে নিয়ে আসেন। বাড়ির লোকজন জানাল, সকালে ছানাগুলো ধরার পর থেকে মা আশপাশে ডাকাডাকি শুরু করেছে। কয়েকবার বাড়ির উঠানের কাছাকাছি পর্যন্ত চলে এসেছিল।
আমি খাঁচা থেকে বাচ্চাদের বের করে দেখলাম, শরীরে কোনো জখমের চিহ্ন নেই। তবে কিছুটা নেতিয়ে পড়েছে। বন্যপ্রাণীদের একেবারে ছোট ছানার পরিচয় শনাক্ত করা বেশ কঠিন। এগুলো মেছো বিড়ালের বাচ্চা, নাকি চিতা বিড়ালের— তা নিয়ে একটু ধন্দে পড়লাম। বন্যপ্রাণী গবেষক ড. রেজা খান স্যার ও বন্ধু ড. মনিরুল খানকে ছবি পাঠালে নিশ্চিত করলেন, এগুলো চিতা বিড়ালের ছানা। এই এলাকায় এখনো চিতা বিড়াল আছে ভেবে মনটা ভালো হয়ে গেল।
বাড়িটি একটা টিলার মাথায়। চারপাশে এখনো বেশ ঝোপ জঙ্গল আর বাঁশঝাড় চোখে পড়ল। মনের মধ্যে একটা শিহরণ জেগে উঠল, ৫০ বছর আগে এই জামগড় গ্রামে সন্ধ্যা নামত চিতা বাঘের করাত চেরা ডাকে। তবে এখনো কিছু বন্যপ্রাণী প্রতিকূল অবস্থায় টিকে আছে, মেছো বিড়াল ওদেরই একজন।
খাঁচাবন্দি চিতা বিড়ালের ছানাদের নিয়ে আমরা এগিয়ে গেলাম বাড়ির পূর্বাংশের দিকে। ঠিক তখনই আচমকা মাকে দেখতে পেলাম। হলুদ ক্ষেত থেকে বেরিয়ে দ্রুত একটি ঝোপে ঢুকে পড়ল, অর্থাৎ ছানাদের ছেড়ে খুব বেশি দূরে যায়নি উদ্বিগ্ন মা। মাসুদের হাতে তখন খাঁচাবন্দি বাচ্চারা, পাশে কাউসার। বাচ্চাগুলো ঝোপের কাছে নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার পর ওরা ‘ছ্যাক-ছ্যাক’ শব্দে ডাকতে লাগল। হঠাৎ একটি বাচ্চা দৌড়ে ঝোপের ভেতর চলে গেল। অন্য দুটি বাচ্চাও একসময় ডাকতে ডাকতে ঝোপের দিকে রওনা দিল। ভেতরে প্রবেশ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক থেমে গেল। বুঝতে পারলাম, ওরা খুঁজে পেয়েছে ওদের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
ছবি: কাউসার মিয়া



