৯ দশকের মালেকের হোটেল

‘যিনি আগে আসবেন, তিনি আগে খাবার পাবেন।’ দেয়ালে লেখা এ বাক্যটিই যেন টঙ্গীর মালেকের হোটেলের পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। আর এর পরের নির্দেশনাতেও রয়েছে বেশ কড়াকড়ি, ‘প্রতি টেবিলে চারজন করে বসতে হবে।’ তেমনি তাড়াহুড়ো থাকলে মানে মানে কেটে পড়ার ইশারাও আছে।
গ্রাহক টানতে যেখানে এখন রেস্তোরাঁগুলো নানা ধরনের ছাড়, অফার ও বিশেষ সেবার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, সেখানে টঙ্গী বাজারের এ পুরনো হোটেলটি প্রায় ৯ দশক ধরে নিজের নিয়মেই চলছে।
হোটেলটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে টঙ্গী বাজারের বাণিজ্যিক ইতিহাস, নৌপথে আসা ব্যবসায়ীদের স্মৃতি, হ্যাজাক বাতির আলো আর কয়েক প্রজন্ম ধরে একই পরিবারের হাতে ধরে রাখা খাবারের ঐতিহ্য। ‘তাজ রেস্টুরেন্ট’ নামের এ প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয়দের কাছে আজও এক নামে ‘মালেকের হোটেল’ নামে পরিচিত।
গাজীপুরের টঙ্গী বাজারে ১৯৩৯ সালে স্বল্প পরিসরে একটি খাবারের দোকান শুরু করেন আব্দুল মালেক মিয়া। দেশভাগের পর বাড়তে থাকে এ দোকানের নামডাক। ক্রেতাদের বাড়তি চাহিদা আর ব্যবসায়ের বাড়বাড়ন্তে দোকানও বড় হয়। যোগ হয় একটি বাহারি নাম— ‘তাজ রেস্টুরেন্ট’।
ষাটের দশকে টঙ্গীতে শিল্পায়নের গতি বাড়তে শুরু করে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীদের অনেকেরই দুপুরের খাবারের ভরসা হয়ে ওঠে এ রেস্তোরাঁ।
১৯৮৬ সালে মারা যান প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল মালেক মিয়া। এরপর হাল ধরেন তার ছেলে সাদেক মিয়া ও পুত্রবধূ জায়েদা বেগম। ২০১৩ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে রয়েছেন মালেক মিয়ার নাতি এম এ জুবায়ের।
প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। সন্ধ্যার পর হ্যাজাক বাতি জ্বালিয়েই আলো করা হতো। সময় বদলেছে, এসেছে বিদ্যুৎ ও আধুনিক আলোকসজ্জা। কিন্তু পূর্বপুরুষের স্মৃতি ধরে রাখতে সেই হ্যাজাক লাইট আজও ঝুলছে রেস্তোরাঁর ভেতরে।
পুরনো কাঠের টেবিল-বেঞ্চ, টিন ও কাঠের ঘেরা পরিবেশ, মাটির মেঝে, সব মিলিয়ে এখানে খাবারের সঙ্গে পাওয়া যায় অন্যরকম একসময়ের অনুভূতি। মালেকের হোটেলের বিখ্যাত নিয়মগুলোর জন্মও প্রয়োজন থেকেই।
একসময় নৌপথে টঙ্গী বাজারে প্রচুর ব্যবসায়ী আসতেন। দুপুরের খাবারের সময় রেস্তোরাঁয় উপচে পড়ত ভিড়। কে আগে এসেছেন আর কে পরে এ নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে প্রায়ই বাগ্বিতণ্ডা বাধত। সেই বিশৃঙ্খলা এড়াতেই চালু করা হয় ‘আগে আসলে আগে খাবার’ নীতি। সময়ের সঙ্গে আধুনিক রেস্তোরাঁ গড়ে উঠলেও মালেকের হোটেলের আবেদন কমেনি।
ঢাকা, উত্তরা, দক্ষিণখান, উত্তরখান, গাজীপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন মানুষ আসেন এখানে দুপুরের খাবার খেতে।
যাত্রাবাড়ী থেকে আসা ৭০ বছর বয়সী মো. জলিল মিয়া বললেন, ‘টঙ্গী বা আশপাশে এলেই এখানে খাই। একদম ঘরের খাবারের মতো।’
রেস্তোরাঁটির তত্ত্বাবধায়ক মো. রবিন মিয়া জানালেন, প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এখানে শুধু দুপুরের খাবার পরিবেশন করা হয়। এখানে চোখধাঁধানো দীর্ঘ মেন্যু নেই। প্রতিদিন সীমিত কয়েকটি পদই রান্না হয়— দেশি মুরগি, খাসির মাংস, নদীর বড় মাছ, ছোট মাছ, ঘন ডাল, সবজি বা ভাজি এবং গরম ভাত। সীমিত মেন্যুর পেছনে রয়েছে খাবারের তাজা মান বজায় রাখার চিন্তা। কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, আইটেম যত বেশি হবে, খাবার অবিক্রীত থেকে যাওয়ার ঝুঁকিও তত বাড়বে। সীমিত পদে রান্না করলে প্রতিদিনের খাবার প্রতিদিনই শেষ করা সহজ হয়।
শুধু ব্যবসার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখেনি হোটেল কর্তৃপক্ষ। সম্প্রতি প্রতি বৃহস্পতিবার সুবিধাবঞ্চিত ও অসহায় মানুষের জন্য বিনামূল্যে দুপুরের খাবার বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঐতিহ্য ধরে রাখার পাশাপাশি এ সামাজিক উদ্যোগও প্রতিষ্ঠানটির প্রতি মানুষের ভালোবাসা বাড়িয়েছে।





