পার্থর নতুন মাইলফলক

ইউটিএমবি মঁ ব্লঁ— বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ অতিদীর্ঘ দূরত্বের দৌড়ের ইভেন্ট। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে এই রেসের ১০০ মাইল সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন পার্থ সাহা। তাকে নিয়ে লিখেছেন সৈয়দ ফরহাদ
পাহাড়ের ঢালে বসে আছেন পার্থ সাহা। সামনে পথ বেশি নয়, প্রায় ২০ কিলোমিটার। কিন্তু দুই রাতের ঘুমহীনতা, প্রচণ্ড ঠান্ডা-জ্বর আর একের পর এক খাড়া পাহাড় পেরোতে পেরোতে শরীর বিদ্রোহ করেছে। রেসে আছেন, এই বোধটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছেন। এভাবে কেটে গেল প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা। হঠাৎ চোখ লেগে গেল। মাত্র ৩০ সেকেন্ড থেকে এক মিনিটের মতো। সেই সামান্য ঘুমই যেন মস্তিষ্কে আবার আলো জ্বেলে দিল। ঘুম ভাঙার পর মোবাইল হাতে নিলেন পার্থ। বাংলাদেশ থেকে আসা একের পর এক বার্তা। সবাই খবর নিচ্ছে, উৎসাহ দিচ্ছে। তখনই মনে হলো, তিনি এখানে বসে থাকার জন্য আসেননি।
আবার উঠে দাঁড়ালেন পার্থ সাহা। কিন্তু এতক্ষণে প্রায় ৫০০ প্রতিযোগী তাকে পেছনে ফেলে চলে গেছে। নিজের কাছে তখন আর কোনো হিসাব নেই— শুধু একটা জেদ, ফিনিশলাইনে যেতে হবে। শেষ ৭ কিলোমিটারের আগে আবার মেডিকেল চেকআপ করাতে হয়। পরীক্ষায় দেখা যায়, তার রক্তে শর্করার মাত্রা কমে গেছে। কিছু খেয়ে আবার শুরু করেন শেষ পথের লড়াই।
ফ্রান্সের মন্ট ব্লঁ ম্যাসিফকে ঘিরে আয়োজিত ১৭৩ দশমিক ৬ কিলোমিটারের সেই রেসে প্রায় ৯ হাজার ৭০০ মিটার এলিভেশন গেইন করতে হয়েছে পার্থকে। ফ্রান্স, ইতালি ও সুইজারল্যান্ডের দুর্গম পাহাড়ি পথ ঘুরে রেসটি শেষ হয়েছে শ্যামনিতে। খাড়া পাহাড়, পাথুরে ট্রেইল, ঠান্ডা, বৃষ্টি, রাতের অন্ধকার— সব মিলিয়ে যে রেস পৃথিবীর অন্যতম কঠিন আলট্রা ট্রেইল হিসেবে পরিচিত। পার্থ সেটিই শেষ করেছেন ৪৫ ঘণ্টা ২২ মিনিট ৩৮ সেকেন্ডে।
পার্থ সাহা একজন এন্ডুরেন্স অ্যাথলেট (দীর্ঘ সময় টানা শারীরিক পরিশ্রম বা খেলাধুলা করার জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত), একজন আলট্রা রানার এবং স্ট্রেন্থ অ্যান্ড কন্ডিশনিং ট্রেইনার। ২০১৪ সাল থেকে সাইক্লিং, দৌড় ও ওপেন ওয়াটার সুইমিং নিয়ে পথচলা শুরু। বর্তমানে ‘রান বাংলা’-এর হেড কোচ ও ট্রেইনিং ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পার্থর কাছে আন্তর্জাতিক রেসে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে দাঁড়ানো বড় প্রেরণা।
ঢাকা শহরে বসে পাহাড়ি আলট্রা রেসের প্রস্তুতি নেওয়া কতটা কঠিন, সেটি পার্থর চেয়ে ভালো আর কে জানবেন! যে পাহাড়েই যান, সেখানে কয়েক মাস ধরে থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার সুযোগ তার নেই। ঢাকায় বসেই তৈরি হতে হয়। তাই তার সবচেয়ে বড় ট্রেনিং গ্রাউন্ড মিরপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেন। সেখানে কিছু ট্রেইল আছে ঠিকই, কিন্তু আন্তর্জাতিক আলট্রা রেসের পাহাড়ি ভূপ্রকৃতির সঙ্গে তার তুলনা চলে না।
পার্থর ভাষায়, নিজেকে তিনি ‘ডে বাই ডে’ তৈরি করেছেন। শারীরিক শক্তির চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মানসিক শক্তি। কারণ, আলট্রা রানিংয়ে শরীর একসময় থেমে যেতে চায়; তখন ফিনিশলাইনে পৌঁছে দেয় মন।
লাদাখ থেকে সিল্ক রোড, খারদুংলা চ্যালেঞ্জ, নেপালের ফিশটেইল, থাইল্যান্ডের হোকা চিয়াং দাও ১০০ মাইল, মঞ্জুশ্রী ট্রেইল, জাপানের কাগা স্পা— একটি একটি করে কঠিন রেস বেছে নিয়েছেন। প্রতিটি রেস ছিল পরেরটির প্রস্তুতি।
ফ্রান্সের মন্ট ব্লঁর সেই রেসে যাওয়ার আগেই পার্থকে বড় লড়াই করতে হয়েছে ভিসার জন্য। ইউটিএমবি ফাইনালে অংশ নেওয়ার সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন লটারির মাধ্যমে। দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় ভিসা পেলেও তখন হাতে সময় খুব কম। রেসের রেজিস্ট্রেশন করতে হয়েছে প্রায় আট মাস আগে। সঙ্গে হোটেল, ফ্লাইট, অভ্যন্তরীণ টিকিট— সব আগেই নিশ্চিত করতে হয়। কেউ যেতে না পারলে সেই খরচ ফেরত পাওয়ার সুযোগও থাকে না।
শেষ পর্যন্ত যখন ফ্রান্সে পৌঁছালেন, তখন রেসের মাত্র দুদিন বাকি। অথচ এমন রেসের আগে অন্তত এক সপ্তাহ পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া দরকার ছিল। সেটিও হয়নি। তার ওপর পৌঁছেই ঠান্ডা ও জ্বর। রেসের দিন সকাল থেকে বৃষ্টি। ঝড়ের কারণে রেস পিছিয়ে গেল প্রায় দুই ঘণ্টা। দিনের আলো কমে গেল। রাত নামতেই তাপমাত্রা আরও কমলো। প্রথম রাতেই জ্বরের তীব্রতা বাড়ল। দ্বিতীয় রাতে সামনে শুধু পাথর, বোল্ডার, বরফগলা পানির ঝিরি আর অবিরাম ওঠানামা। এমন জায়গা, যেখানে অনেক সময় দৌড়ানো তো দূরের কথা, হাঁটাও কঠিন। তারপরই সেই সাড়ে তিন ঘণ্টার অধ্যায়।
পার্থ সাহার দৌড়ের সঙ্গে বাংলাদেশের পতাকা কেন এত গভীরভাবে জড়িয়ে গেল, তারও একটি গল্প আছে। ২০২২ সালের লাদাখ ম্যারাথন ছিল তার প্রথম আন্তর্জাতিক রেস। প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ ফুট উচ্চতায় ম্যারাথনটি শেষ করেছিলেন ৪ ঘণ্টা ১৮ মিনিটের মতো সময় নিয়ে। ৪৫টি দেশের প্রতিযোগীদের মধ্যে ছিলেন ৩৬তম। কিন্তু ফিনিশলাইনে দাঁড়ানোর সময় তার হাতে বাংলাদেশের পতাকা ছিল না। অন্য দেশের দৌড়বিদদের হাতে পতাকা দেখে তখনই প্রথম বুঝতে পারন, একজন অ্যাথলেটের সঙ্গে একটি দেশের পতাকা থাকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
এরপর খারদুংলা চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে ফিনিশলাইন পার হন। পার্থ বুঝতে পারেন, খেলাধুলায় বাংলাদেশকে দৃশ্যমান করাও একধরনের কাজ। নেপালের ফিশটেইল ১০০ কিলোমিটারের রেসেও একই অনুভূতি। পুরো রেস মাত্র পাঁচজন শেষ করতে পেরেছিলেন। তাদের একজন পার্থ। অনেক ভারতীয় দৌড়বিদও ছিলেন, তারাও পারেননি। বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে ফিনিশলাইনে পৌঁছানোর অনুভূতি তাই তার কাছে আলাদা।
পার্থর সবচেয়ে আবেগের স্মৃতিগুলোর একটি জাপানের কাগা স্পা ট্রেইল। সেখানে রাস্তার পাশে জাপানি শিশুরা বিভিন্ন দেশের পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে ছিল। অংশ নেওয়া প্রতিটি দেশের পতাকা তারা এঁকে রেখেছিল। সেই সারিতে ছিল বাংলাদেশের পতাকাও। জাপানি দৌড়বিদরা যখন শুনেছেন তিনি বাংলাদেশ থেকে এত দূরে শুধু দৌড়ানোর জন্য এসেছেন, তখন তাদের বিস্ময়ের শেষ ছিল না। এই বিস্ময়ের মধ্যেই পার্থ খুঁজে পান অন্যরকম আনন্দ।
ফ্রান্সেও ঘটেছে একই ঘটনা। কিট সংগ্রহের সময় প্রায় ৮০ বছরের এক স্বেচ্ছাসেবী তার দেশের নাম জানতে চেয়েছিলেন। ‘বাংলাদেশ’ বলার পর তিনি ভীষণ অবাক হন। যুক্তরাষ্ট্র ও বেলজিয়ামের দৌড়বিদরাও পার্থের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসার কথা শুনে বিস্মিত হয়েছেন। আর যখন ফিনিশলাইন পার হলেন, মাইকে ঘোষণা এলো— বাংলাদেশের প্রথম অ্যাথলেট এই রেস শেষ করছেন। চারপাশ থেকে অভিনন্দন। মানুষ তার দিকে এগিয়ে আসছে, বাংলাদেশের কথা বলছে।
আলট্রা রানিংকে পার্থ বলেন ‘নেশা’। এই নেশার মধ্যে আছে পাহাড়ে ওঠা, পাহাড় থেকে নামা, বরফ দেখা, বৃষ্টি-ঝড়ের মধ্যে দৌড়ানো, অপরিচিত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ, নতুন সংস্কৃতি দেখাসহ কত কী! আর আছে নিজের সীমা বারবার পরীক্ষা করার রোমাঞ্চ।
নেপালের মঞ্জুশ্রী ট্রেইল রেসের মতো রেসে কখনো ৮ থেকে ১০ কিলোমিটার একটানা ক্লাইম্ব করতে হয়েছে, যার বড় অংশই পাথুরে সিঁড়ি। রাতের জঙ্গলে একা দৌড়াতে হয়েছে। কোথাও লেপার্ডের আশঙ্কা, কোথাও ঝুলন্ত সেতু, কোথাও পাহাড়ি নদী। জাপানের রেসে আবার ভালুকের উপস্থিতির আশঙ্কার জন্য বিশেষ বেল বহন করতে হয়েছে। কিন্তু ভয় এখন আর তাকে খুব একটা থামায় না। কারণ, অভ্যাস হয়ে গেছে। তিনি জানেন, শুধু শক্তি দিয়ে এসব রেস শেষ করা যায় না। একসময় শরীর তার সীমায় পৌঁছে যাবে। পা চলবে না, শক্তি থাকবে না, মাথাও কাজ করবে না। তখন দরকার হবে মানসিক শক্তির। মন্ট ব্লঁর পাহাড়ের ঢালে সাড়ে তিন ঘণ্টা বসে থাকার পরও যে মানুষটি উঠে দাঁড়ায়, তার সবচেয়ে বড় অর্জন নিঃসন্দেহে মানসিক শক্তি।
পার্থ সাহার সামনে এখন আরও বড় স্বপ্ন। ৩০০ থেকে ৫০০ কিলোমিটারের আলট্রা রেসে অংশ নিতে চান। সুইজারল্যান্ডের একটি ক্রস-আলট্রায় প্রায় ৪৮ হাজার মিটার এলিভেশন অতিক্রম করতে হয়। সেখানেও একদিন দৌড়াতে চান তিনি।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সহযোগিতা তার আন্তর্জাতিক দৌড়ের পথ কিছুটা সহজ করেছে। পার্থর কাছে আলট্রা রানিং কোনো শো-অফ নয়। মানুষের বাহবা পাওয়াও তার উদ্দেশ্য নয়। মন্ট ব্লঁর পাহাড়ের ঢালে সাড়ে তিন ঘণ্টা হারিয়ে যাওয়ার পরও পার্থ যখন আবার উঠে দাঁড়ান, তখন তার সামনে শুধু একটি ফিনিশলাইন ছিল না; ছিল একটি দেশের নাম— বাংলাদেশ।








