পেগিজ কোভের বিখ্যাত বাতিঘর

পেগিজ কোভের বিখ্যাত বাতিঘরের সামনে স্বামীসহ লেখক
আটলান্টিকের তীরে এক গ্রাম পেগিজ কোভ। জেলেপাড়া, বিখ্যাত এক বাতিঘর আর প্রাচীন সব পাথরের জন্য তার আলাদা নাম। লিখেছেন এলিজা বিনতে এলাহী
সকালে বন্ধু সেলিনা খুদেবার্তায় জানাল, আজ বিকালে আমাদের গন্তব্য পেগিজ কোভ। তার কথায় হ্যালিফ্যাক্স শহরে এসে যদি পেগিজ কোভ না দেখা হয়, তবে নাকি হ্যালিফ্যাক্স ভ্রমণ পূর্ণাঙ্গ হয় না। কিন্তু পেগিজ কোভ আবার কেমন নাম?
তার আগে সেলিনার পরিচয়টা দেওয়া দরকার। আমার ছেলেবেলার বন্ধু। পরিবার নিয়ে বাস করে হ্যালিফ্যাক্স শহরে।
কানাডার পূর্ব উপকূলে, আটলান্টিক মহাসাগরের গা ঘেঁষে অবস্থিত ছোট্ট এক প্রদেশ নোভা স্কশিয়া। এর তিন দিক থেকে ঘেরা সমুদ্রের জলে। এই প্রদেশেরই রাজধানী হ্যালিফ্যাক্স। একসময়কার গুরুত্বপূর্ণ ব্রিটিশ নৌঘাঁটি আজ নোভা স্কশিয়ার প্রধান শহর এবং সবচেয়ে বড় সমুদ্রবন্দর। টরন্টো বা মন্ট্রিয়লের মতো কানাডার পরিচিত শহরগুলো থেকে হ্যালিফ্যাক্স বেশ খানিকটা দূরে, প্রায় হাজার দেড়েক কিলোমিটার পূর্বে, একেবারে আটলান্টিকের কোলে।
সেলিনা ও তার জীবনসঙ্গী ফরিদ ভাই আমাকে ও আমার স্বামী ফাইয়াজকে তুলে নিলেন হ্যালিফ্যাক্সের ডাউনটাউন থেকে। নোভা স্কশিয়ার আকাশ সেদিন ছিল অদ্ভুত রকমের নীল, আর মেঘগুলো যেন ধীরে ধীরে ভেসে যাচ্ছিল আটলান্টিক মহাসাগরের দিকে। কিন্তু বেলা বাড়তেই আকাশে কিছুটা মেঘ জমেছে। পেগিজ কোভ— কানাডার সবচেয়ে বিখ্যাত মৎস্যজীবী গ্রামগুলোর একটি।
হ্যালিফ্যাক্স থেকে পেগিজ কোভ ঘণ্টাখানেকের পথ। রাস্তার দুপাশে ছড়িয়ে আছে ছোট ছোট হ্রদ, পাইন গাছের সারি; আর মাঝেমধ্যে দেখা যায় সমুদ্রের নীল রেখা দিগন্তে মিশে যাচ্ছে। গাড়ির জানালা খুলে দিতেই ভেসে এলো নোনা বাতাসের গন্ধ।
পথের মাঝেমধ্যে ছোট ছোট গ্রাম পড়ে— কাঠের গির্জা, পুরনো কবরস্থান আর দু-একটা মুদির দোকান, যেখানে সময় যেন থমকে আছে বহু বছর আগে থেকে। এই গ্রামগুলোর প্রতিটির নিজস্ব একটা ছন্দ আছে, এক ধরনের ধীরস্থির জীবনযাত্রা, যা শহরের কোলাহল থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আকাশে মাঝেমধ্যে উড়ে যাচ্ছিল বড় বড় সিগাল।
লাইটহাউজের গায়ে হেলান দিয়ে দূরে তাকালে দেখা যায় ছোট্ট জেলেগ্রামটি। কাঠের তৈরি রঙিন বাড়িঘর সেখানে
এখানে একটি কথা বলে রাখা ভালো— ইংরেজি ‘কোভ’ শব্দটির অর্থ হলো ছোট্ট, অর্ধবৃত্তাকার উপসাগর বা খাঁড়ি, যা সাধারণত পাহাড় বা পাথুরে তীরে ঘেরা থাকে এবং যেখানে সমুদ্রের প্রবল ঢেউ সরাসরি আছড়ে পড়ে না। এ ধরনের প্রাকৃতিক আশ্রয়স্থল বহু শতাব্দী ধরে জেলে নৌকা নোঙর করার জন্য আদর্শ জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। তাই আটলান্টিক কানাডার উপকূল জুড়ে অসংখ্য গ্রামের নামের শেষে ‘কোভ’ শব্দটি জুড়ে থাকতে দেখা যায়।
আর পেগিজ কোভ নামটির পেছনে লুকিয়ে আছে দুটি ভিন্ন গল্প। প্রথম আর সবচেয়ে প্রচলিত মতে, এই জায়গাটি যে উপসাগরের মুখে অবস্থিত, তার নাম সেন্ট মার্গারেটস বে। নামকরণ করেছিলেন ফরাসি অভিযাত্রী স্যামুয়েল দ্য শঁপ্লাঁ, তার নিজের মায়ের নামে। ইংরেজিতে ‘মার্গারেট’ নামের আদুরে সংক্ষিপ্ত রূপ হলো ‘পেগি’। ধীরে ধীরে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বে-এর প্রবেশমুখে অবস্থিত এই ছোট্ট জেলেবসতিটির নাম হয়ে ওঠে পেগিজ কোভ। অন্য একটি জনপ্রিয় লোককথা বলে ভিন্ন গল্প— উনিশ শতকে কোনো এক জাহাজডুবির পর এক শিশুকন্যাকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল এই উপকূলে, যে নিজের আসল নাম মনে করতে পারেনি। স্থানীয় এক পরিবার তাকে দত্তক নেয় এবং নাম রাখে পেগি। সে পরিচিত হয়ে ওঠে পেগি অব দ্য কোভ নামে। গ্রামের প্রবেশপথেই আছে একটি ছোট্ট জাদুঘর, যেখানে এই কিংবদন্তি নিয়ে নানা চিত্রকর্ম আর গল্প সংরক্ষিত আছে।
এই এলাকায় জনবসতি গড়ে ওঠে ১৮১১ সালে, যখন নোভা স্কশিয়া প্রদেশ সরকার ছয়টি জার্মান বংশোদ্ভূত পরিবারকে প্রায় ৮০০ একর জমি বরাদ্দ দেয়। এই পরিবারগুলোই এ অঞ্চলে প্রথম স্থায়ী বসতি স্থাপন করে। মূলত মাছ ধরাকে জীবিকা করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে আর যেখানে সামান্য উর্বর জমি পাওয়া যেত, সেখানে সামান্য চাষাবাদও করত। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামে গড়ে ওঠে একটি গির্জা, একটি স্কুল, লবস্টার প্রক্রিয়াজাত করার একটি কারখানা আর ছোট ছোট মুদি দোকান।
উনিশ শতকের শেষভাগে প্রথম একটি বাতিঘর তৈরি হয় এই বিপজ্জনক পাথুরে উপকূলে জাহাজ চলাচলকে নিরাপদ করার জন্য। আর বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বর্তমান কাঠামোর লাইটহাউজটি নির্মিত হয়। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে চিত্রশিল্পী আর আলোকচিত্রীরা এই গ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে এখানে আসতে শুরু করেন। রাস্তাঘাটের উন্নতির সঙ্গে গ্রামটি ধীরে ধীরে পরিণত হয় বিশ্বখ্যাত এক পর্যটনকেন্দ্রে, যদিও আজও এখানে স্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা দেড় শর আশপাশে।
গাড়ি থেকে নেমে পাশেই বড় বড় গ্রানাইট পাথর দেখে মনে হলো, যেন পৃথিবীর একেবারে প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি। স্থানীয়রা বলেন, প্রায় ১০ হাজার বছর আগে শেষ বরফযুগে হিমবাহ এগুলোকে ভাসিয়ে নিয়ে এসেছিল।
পেগিজ কোভে পৌঁছানোর ঠিক আগে আগেই দূর থেকে চোখে পড়ল সেই বিখ্যাত লাইটহাউজ— সাদা আর লাল রঙের এক নিঃসঙ্গ প্রহরী, যে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল বিশাল গ্রানাইট পাথরের ওপর। এই লাইটহাউস ১৯১৫ সালে নির্মিত। আজও এটি কানাডার সবচেয়ে বেশি ছবি তোলা স্থাপনাগুলোর একটি।
কোথাও কোথাও পাথরের ফাটলের মধ্যে জমে থাকা ছোট ছোট জলাশয়ে দেখা গেল ছোট কাঁকড়া আর শামুক, যারা জোয়ার-ভাটার ছন্দে বেঁচে থাকতে শিখে নিয়েছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম একটা উঁচু পাথরের ওপর, চোখ বন্ধ করে শুধু শুনলাম— ঢেউয়ের গর্জন, বাতাসের শিসধ্বনি আর দূরে কোথাও একটা বয়া-ঘণ্টার টুংটাং শব্দ, যা জাহাজগুলোকে সতর্ক করে দেয় বিপজ্জনক পাথরের ব্যাপারে।
লাইটহাউজের গায়ে হেলান দিয়ে দূরে তাকালে দেখা যায় ছোট্ট জেলেগ্রামটি। কাঠের তৈরি রঙিন বাড়িঘর— কোনোটা লাল, কোনোটা হলুদ, কোনোটা সবুজ— সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের ঢালে, ঠিক যেন কোনো চিত্রকরের ক্যানভাস থেকে উঠে এসেছে। ছোট্ট একটি হারবারে বাঁধা আছে জেলে নৌকা, যেগুলো এখনো প্রতিদিন সকালে সমুদ্রে যায় গলদা চিংড়ি (লবস্টার) ধরতে। প্রতি বছর লাখ লাখ পর্যটক আসেন এই ছোট্ট জায়গাটি দেখতে। মাত্র কয়েকশ মানুষের বাস এখানে।
গাড়ি পার্কিং থেকে খানিক হেঁটে গেলে সামনেই বাতিঘর। সাগরের ধার ঘেঁষে হাওয়া খাওয়ার জন্য একটি বসার জায়গা তৈরি করা হয়েছে। স্থানীয় বয়স্ক এক ভদ্রলোক, গল্প করলেন কীভাবে তার পূর্বপুরুষ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই গ্রামে মাছ ধরার পেশায় যুক্ত। তিনি বললেন, শীতকালে যখন পর্যটকের ভিড় কমে যায়, তখন এই গ্রাম ফিরে পায় তার প্রকৃত নীরবতা; শুধু ঢেউয়ের শব্দ আর বাতাসের হু হু আওয়াজ।
বিকাল গড়িয়ে সূর্য যখন হেলে পড়তে শুরু করল দিগন্তের দিকে, তখন আবার ফিরে গেলাম লাইটহাউসের কাছে। আকাশ ধীরে ধীরে রঙ বদলাতে লাগল— সোনালি থেকে কমলা, তার পর গোলাপি আর বেগুনি। যেন প্রকৃতি নিজেই তার সবচেয়ে সুন্দর শিল্পকর্মটি প্রদর্শন করছে।







